আওয়ামী সিন্ডিকেটে ‘অস্বস্তি’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সব সিদ্ধান্তের অনুমোদন দিয়ে থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম সিন্ডিকেট। কিন্তু ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে সরকার পতনের প্রায় তিন মাস পূর্ণ হলেও এখনো পর্যন্ত নিয়মিত সিন্ডিকেট সভা অনুষ্ঠিত হয়নি। দুটি সভা হলেও তা ছিল জরুরি। যার ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। এই সিন্ডিকেটের সদস্যদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগপন্থি হওয়ায় বর্তমান প্রশাসনও রয়েছে ‘অস্বস্তিতে’।

এদিকে বর্তমান সিন্ডিকেটকে ‘আওয়ামী ফ্যাসিবাদী নিপীড়ক সিন্ডিকেট’ আখ্যা দিয়ে তা ভেঙে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। তারা বলছেন, ‘জুলাই বিপ্লবের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমানে বহাল সিন্ডিকেট শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমান ‘আওয়ামী’ সিন্ডিকেট ভেঙে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই নীতিনির্ধারণী ফোরামকে শিক্ষার্থীবান্ধব ও গণতান্ত্রিক করে গড়ে তুলতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটে ১৮টি পদ রয়েছে। সিন্ডিকেটে ছয়টি ক্যাটাগরিতে (ডিন, প্রাধ্যক্ষ, অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক, সহকারী অধ্যাপক ও প্রভাষক) শিক্ষকরা সরাসরি ভোট দিয়ে প্রতিনিধি নির্বাচন করেন। সর্বশেষ ২০২২ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ওই ছয়টি ক্যাটাগরিতে জিতেছেন আওয়ামীপন্থিরা। উপাচার্য এবং দুই উপ-উপাচার্য পদাধিকারবলে সদস্য মনোনীত হন। এ ছাড়া বাকি পদগুলোয় রেজিস্ট্রার্ড গ্র্যাজুয়েট, অ্যাকাডেমিক পরিষদ, চ্যান্সেলর, সরকার কর্তৃক মনোনীত হয়ে থাকেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সূত্র বলছে, বর্তমান সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে চাপ রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় সব সদস্য পতিত আওয়ামী সরকারের সমর্থক হওয়ায় নিয়মিত সিন্ডিকেট সভাও ডাকা যাচ্ছে না। ফলে শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতিসহ গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আটকে আছে। নিয়মিত সভা না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত রূপ পাচ্ছে না। এর মধ্যে বর্তমান সিন্ডিকেটের জরুরি সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি বন্ধের বিষয়ে এক সিদ্ধান্ত নিয়েও সমালোচনা দেখা দেয়। যত দ্রুত সম্ভব এই সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার পক্ষেই এই প্রশাসন, তবে নিয়মনীতির মধ্য দিয়েই যেতে চান তারা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বলছে, যারা শিক্ষকদের ভোটে সরাসরি নির্বাচিত, তাদের নির্ধারিত মেয়াদ দুই বছর ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে। তবে পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত তারা সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে থাকবেন। অন্যদিকে যারা মনোনীত হয়েছেন, তাদের চাইলে যেকোনো সময় পরিবর্তন করতে পারেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন এক সিন্ডিকেট সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, সরকার মনোনীত যারা আছেন তাদের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চাইলেই সরাতে পারেন। যেহেতু আওয়ামী সরকার নেই, তাদের মনোনীত সদস্য রাখারও কোনো যৌক্তিকতা নেই। নির্বাচিত সদস্যরা পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে

থাকতে পারেন। তবে ডিন এবং প্রভোস্ট ক্যাটাগরিতে যারা নির্বাচিত হয়েছেন, তারা ছাত্র-জনতার তোপের মুখে তাদের প্রশাসনিক পদ থেকে পদত্যাগ করায় সিন্ডিকেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় থাকার অধিকার হারিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে আইনি পরামর্শ নিয়ে তাদের বাদ দেওয়া যায়। এ ছাড়া শিক্ষক সমিতির সভাপতি যিনি ছাত্রদের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছেন, তাকে সিন্ডিকেটে রাখা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশই এই সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। এ দাবিতে একাধিকবার মানববন্ধনও করেছেন শিক্ষার্থীরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থী মোসাদ্দিক আলী বলেন, বিগত প্রশাসনের সময় গঠিত সিন্ডিকেট শিক্ষাবিরোধী সিদ্ধান্ত পাস করিয়ে শিক্ষার্থীদের দায়িত্ব ছাত্রলীগের হাতে তুলে দিয়েছিল। এই সিন্ডিকেট শেখ হাসিনার দুঃশাসন টিকিয়ে রাখতে শিক্ষার্থীদের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। নিয়ম না মেনে গঠিত এই সিন্ডিকেটের অনেক সদস্য বিনা ভোটে নির্বাচিত। তাই এই সিন্ডিকেট ভেঙে দিয়ে নতুন করে সিন্ডিকেট কমিটি তৈরি করতে হবে। অবিলম্বে সিন্ডিকেট ভেঙে না দিলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী মো. ইমরান বলেন, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনে দলীয়করণ করা হয়েছে। এই সিন্ডিকেটের তত্ত্বাবধানে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ নন। দলকানা নয়, মেধার প্রতিনিধিত্ব করে, এমন ব্যক্তিদের দিয়ে সিন্ডিকেট গঠন করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সিন্ডিকেটের ওপর নির্ভর করে। সরকার পতনের পর আর কোনো নিয়মিত সিন্ডিকেট সভা হয়নি। যার ফলে অনেক সিদ্ধান্ত আটকে আছে। বর্তমান সিন্ডিকেটের অনেকেই স্বৈরাচার সরকারের দোসর ছিল, অনেক অপকর্মের সঙ্গে তারা যুক্ত ছিল। তাদের রেখে সিন্ডিকেট পরিচালনা করার কোনো যুক্তি নেই। আমরা মনে করি দ্রুত সময়ের মধ্যে আচার্য বা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের মাধ্যমে এই সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া দরকার।

ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি ও বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আসার পরপরই উচিত ছিল বর্তমান সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার। এই সিন্ডিকেটে দলীয় সিদ্ধান্ত ছাড়া কোনো নিরপেক্ষ সিদ্ধান্ত হয়নি। সে সিন্ডিকেট এখনো দলকানায় রয়েছে বলে আমরা মনে করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের যত অনিয়ম, সব কিছুর অনুমোদন দিয়েছে তারা। আমি নিজেই উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে আসার পর আগে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম পরিবর্তনের অনুমোদন চেয়েছি। তাদের সঙ্গে নিয়ে আমি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করতে পারব না।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমদ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ছাত্রদের পক্ষ থেকে এই সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ার বিষয়ে চাপ আছে। কিছু সদস্য আছেন নির্বাচিত, তারা পরবর্তী নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত থাকবেন। আর কিছু চ্যান্সেলর কর্তৃক মনোনীত। তাদের বিষয়ে আমরা রিভিশনের প্রক্রিয়া শুরু করেছি। যতদ্রুত সম্ভব আমরা নির্বাচনও দিয়ে দেব। তবে সিন্ডিকেট দ্রুত কার্যকর করা খুবই জরুরি। আমরা অনেক কাজ করতে পারছি না।