উম্মতের প্রতি নবীজির দরদ

হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন দয়া ও রহমতের নবী। প্রচণ্ড দরদি ছিলেন তিনি। উম্মতকে ভালোবাসার যে দৃষ্টান্ত পৃথিবীবাসীর সামনে তিনি রেখে গেছেন দুনিয়ার শুরু লগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত সেটার উপমা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। তিনি সবসময় উম্মতের দুনিয়া ও আখেরাতের সফলতার চিন্তায় বিভোর থাকতেন। উম্মত যেন পথহারা না হয়ে যায়, হেদায়েতের জ্যোতির্ময় নুর থেকে বঞ্চিত না হয়ে যায়, দ্বীনের সুশীতল ছায়া থেকে দিকভ্রান্ত না হয়ে যায়, সেই চিন্তায় থাকতেন সর্বদা। উম্মত পথভ্রষ্ট হয়ে জাহান্নামের দিকে ছুটে যাবে, রাসুল (সা.) সেটা বরদাশত করতে পারতেন না। সবসময় তিনি ছিলেন উম্মতের জন্য কল্যাণকামী। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘(হে মানুষ) তোমাদের নিজেদের মধ্য থেকেই তোমাদের কাছে একজন রাসুল এসেছেন। তোমাদের যেকোনো কষ্ট তার জন্য অতি পীড়াদায়ক। সে সর্বদা তোমাদের কল্যাণকামী, মুমিনদের প্রতি অত্যন্ত সদয়, পরম দয়ালু।’ (সুরা তওবা ১২৮) কোরআনে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘হে নবী, আপনাকে কষ্ট দেওয়ার জন্য আমি আপনার ওপর কোরআন নাজিল করিনি।’ (সুরা তাহা ২)

উম্মতের হেদায়েত লাভের জন্য তার দরদ ও আত্মত্যাগের মাত্রা বুঝতে কোরআনে কারিমের এই আয়াতই যথেষ্ট। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘সম্ভবত আপনি তাদের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে স্বীয় প্রাণনাশ করে ফেলবেন, যদি তারা এই বাণীর প্রতি ইমান না আনে।’ (সুরা কাহাফ ৬) কোরআনের এই আয়াতগুলোতে উম্মতকে অতুলনীয় ভালোবাসার দৃষ্টান্ত ফুটে উঠেছে। বুকভরা আর্তনাদ, চোখভরা কান্না আর কান্নাভেজা কণ্ঠে দরদি নবী নবুওয়াত লাভের পর থেকে মৃত্যু অবধি ‘উম্মাতি উম্মাতি’ বলে দীর্ঘশ্বাস ছেড়েছেন। এ জাতীয় অনেক দৃষ্টান্ত হাদিস, ইতিহাস ও সিরাতের বিভিন্ন কিতাবের পাতায় পাতায় লিপিবদ্ধ আছে। সেসব ঘটনাবলি থেকে কিছু উল্লেখ করা হলো।

তায়েফের ঐতিহাসিক ঘটনা : যখন মক্কার কাফেররা ইসলামের সত্য বাণী থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল তখন রাসুল (সা.) তায়েফবাসীর কাছে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি দরদভরে তাদের সফলতার পথে ডাকলেন। ওই অকৃতজ্ঞ হতভাগারা রাসুল (সা.)-এর ওপর চড়াও হয়ে পাথরের আঘাতে রক্তে জর্জরিত করল। আল্লাহর আরশে কাঁপন শুরু হলো। আল্লাহ ফেরেশতা পাঠালেন। ফেরেশতারা রাসুল (সা.)-কে সালাম দিয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার কওম আপনাকে যা করেছে, তার সবই মহান আল্লাহ দেখেছেন। আমি হচ্ছি পর্বতমালার ফেরেশতা। আমার প্রভু আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছেন, যেন আপনি আমাকে তাদের ব্যাপারে কোনো নির্দেশ দেন। সুতরাং আপনি কী চান? আপনি চাইলে, আমি মক্কার বড় বড় পাহাড় দুটিকে তাদের ওপর চাপিয়ে দেব। এ কথা শুনে রাসুল (সা.) বললেন, (এমন কাজ করবেন না), আমি আশা করছি, মহান আল্লাহ তাদের থেকে এমন লোকের আবির্ভাব ঘটাবেন, যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তার সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না। (সহিহ বুখারি)

উম্মতের প্রতি মায়া-মমতা : উম্মতের প্রতি প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর এর চূড়ান্ত কল্যাণকামিতা ও নিখাদ ভালোবাসা বেশ কিছু হাদিসে প্রকাশ পায়। এমনি একটি হাদিসে তিনি বলেছেন, আমার ও লোকদের উদাহরণ এমন যে, আগুন জ্বালানো হলো, যখন সেটার চারদিক আলোকিত হয়ে গেল, তখন পতঙ্গ ও ওই সব প্রাণী যেগুলো আগুনে পুড়ে, সেগুলো তাতে পুড়তে লাগল। তখন একজন সেগুলোকে আগুন থেকে ফেরানোর চেষ্টা করল। কিন্তু সেগুলোকে আগুন পরাজিত করল এবং আগুনে পতিত হলো। তেমনি আমিও তোমাদের কোমর ধরে আগুন থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু তোমরা তাতেই পতিত হচ্ছ। (সহিহ বুখারি)

প্রতি নামাজে দোয়া : রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি নামাজে উম্মতের পাপমুক্তির দোয়া করতেন। তিনি বলতেন, হে আল্লাহ! আপনি আমার উম্মতের আগে ও পরের এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব গুনাহ ক্ষমা করে দিন।’ (সহিহ ইবনে হিব্বান)

আখেরাতে কঠিন মুহূর্তে সুপারিশ : আখেরাতের কঠিন মুহূর্তেও এ উম্মতের মুক্তির সুপারিশ করবেন রাসুল (সা.)। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেছেন, প্রত্যেক নবীকে এমন একটি বিশেষ দোয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছে, যা কবুল করা হবে। তারা (দুনিয়াতে) সে দোয়া করেছেন এবং তা কবুলও করা হয়েছে। আর আমি আমার দোয়া কেয়ামতের দিন আমার উম্মতের শাফায়াতের উদ্দেশে মুলতবি রেখেছি। (সহিহ মুসলিম)

ইমাম নববী (রহ.)-এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, এই হাদিসে উম্মতের প্রতি রাসুল (সা.)-এর পূর্ণ মায়া-মমতা ও দরদের কথা এবং তাদের কল্যাণসাধনে তার প্রচেষ্টার কথা ফুটে উঠেছে। তাই তো তিনি এই উম্মতের জন্য তার বিশেষ দোয়া তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় সময়ের জন্য তুলে রেখেছেন।

উম্মতের প্রতি নবীজির দরদ : আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা.) বলেছেন, রাসুল (সা.) একটি আয়াত পাঠ করলেন, যাতে ইব্রাহিম (আ.)-এর কথা উল্লেখ আছে, (তা হলো) ‘হে আমার রব! এসব প্রতিমা বহু মানুষকে বিভ্রান্ত করেছে। সুতরাং যে আমার অনুসরণ করবে সে আমার দলভুক্ত হবে।’ আর সেই আয়াতও পড়লেন যেখানে ইসা (আ.)-এর কথা আছে, (তা হলো), ‘যদি আপনি তাদের শাস্তি দেন তবে তারা তো আপনারই বান্দা। আর যদি তাদের ক্ষমা করেন তবে নিশ্চয়ই আপনার ক্ষমতাও পরিপূর্ণ এবং হেকমতও পরিপূর্ণ।’ অতঃপর রাসুল (সা.) দুই হাত তুলে কেঁদে কেঁদে বললেন, ‘হে আল্লাহ, আমার উম্মত! আমার উম্মত!’ তখন আল্লাহতায়ালা বললেন, হে জিবরাইল! মুহাম্মদ (সা.)-কে গিয়ে জিজ্ঞাসা করো সে কেন কাঁদছে? যদিও তোমার রবই ভালো জানেন। অতঃপর জিবরাইল (আ.) রাসুল (সা.)-এর কাছে এসে তা জিজ্ঞাসা করলেন। রাসুল (সা.) সব খুলে বললেন। যদিও আল্লাহতায়ালা সব জানেন। অতঃপর আল্লাহতায়ালা বললেন, হে জিবরাইল! মুহাম্মদ (সা.)-কে গিয়ে বলো, আমি অচিরেই তোমার উম্মতের ব্যাপারে তোমাকে সন্তুষ্ট করব, ব্যথিত করব না। (সহিহ মুসলিম)

উম্মতের পক্ষ থেকে কোরবানি : রাসুল (সা.) নিজ পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি তার উম্মতের পক্ষ থেকে কোরবানি করতেন। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরবানির ইচ্ছা করলে দুটি মোটাতাজা, মাংসল, শিংযুক্ত, ধূসর বর্ণের ও খাসি করা মেষ ক্রয় করতেন। অতঃপর এর একটি নিজ উম্মতের যারা আল্লাহর একত্মের সাক্ষ্য দেয় এবং তার নবুওতের সাক্ষ্য দেয় তাদের পক্ষ থেকে এবং অন্যটি মুহাম্মদ (সা.) ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে কোরবানি করতেন। (ইবনে মাজাহ)

পরবর্তী উম্মতকে দেখার আকাক্সক্ষা : আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমার ইচ্ছা হয় আমি আমার ভাইদের দেখব। সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা কি আপনার ভাই নই? তিনি বললেন, তোমরা আমার সাহাবি। আমার ভাই তারাই, যারা আমাকে না দেখে আমার প্রতি ইমান আনবে। (মুসনাদে আহমাদ)

উম্মতের কষ্ট লাঘব : উবাই বিন কাব (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) বনু গিফারের কুয়ার কাছে ছিলেন। এমন সময় তার কাছে জিবরাইল (আ.) আগমন করলেন এবং বললেন, আল্লাহ আপনাকে আদেশ করেছেন, আপনি যেন আপনার উম্মতকে এক উপভাষায় কোরআন পড়ান। তিনি বললেন, আমি আল্লাহর কাছে তার ক্ষমা কামনা করি, আমার উম্মত এটার ক্ষমতা রাখবে না। তিনি দ্বিতীয়বার এসে বললেন, আল্লাহতায়ালা আপনাকে আদেশ করেছেন, আপনি যেন আপনার উম্মতকে দুই উপভাষায় কোরআন পড়ান। তিনি বললেন, আমি আল্লাহর কাছে তার ক্ষমা কামনা করি, আমার উম্মত এটার ক্ষমতা রাখবে না। এভাবে তিনি একাধিকবার অক্ষমতা প্রকাশ করতে থাকেন, যতক্ষণ না আল্লাহর পক্ষ থেকে সাত উপভাষায় কোরআন তেলাওয়াতের অনুমতি দেওয়া হয়। (ইবনে মাজাহ)

এসব বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, উম্মতের জন্য রাসুল (সা.)-এর কেমন ভালোবাসা ছিল।