পাবনার বেড়া উপজেলার সদ্য অপসারিত চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা রেজাউল হক বাবু এক সময় ছিলেন অন্যের দোকানের কর্মচারী। তবে রাজনীতিতে নামার পর বদলে যায় তার অবস্থা আর আচরণ। ক্ষমতার দাপটে হয়ে ওঠেন উপজেলার ত্রাস। হাট, ঘাট, জমি দখল, চাঁদাবাজি, লুটপাট, সালিশ বাণিজ্য, অবৈধ বালু উত্তোলনসহ নানা অনিয়ম করে হয়েছেন বিপুল সম্পদের মালিক। জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। তাই এখনো তিনি গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে, ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর রেজাউল হক বাবু প্রথমে জাতসাখিনী ইউপি চেয়ারম্যান ও পরে বেড়া উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। স্থানীয়দের অভিযোগ, এরপর ক্ষমতার দাপটে উপজেলার কাশীনাথপুর, আমিনপুর বাজার, নগরবাড়ী ও কাজীরহাট ঘাটে একক নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন বাবু এবং তার ভাই মোকলেছুর রহমান (মুকু)।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সর্বশেষ উপজেলা নির্বাচনের সময় রেজাউল হক বাবু বিআইডব্লিউটিএর নগরবাড়ী-কাজীরহাট-নরাদহ নদীবন্দর এলাকার ঠিকাদার, ইজারাদার ও সরবরাহকারী হিসেবে সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ছিলেন। সরকারি বিধি অনুযায়ী জনপ্রতিনিধিদের ঘাট ইজারা নেওয়ার সুযোগ না থাকলেও তার তোয়াক্কা করেননি বাবু। কেন্দ্রীয় একাধিক প্রভাবশালী মন্ত্রী ও নেতাকে ম্যানেজ করে তিনি নিজ নামে ঘাট রেখেছেন। মামলা করে ইজারা বন্ধ রেখে সরকারকে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত করেছেন তিনি। এসব কারণে, উপজেলা নির্বাচনে জেলা নির্বাচন অফিস মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই করে রেজাউল হক বাবুর মনোনয়নপত্র বাতিল করে দেয়। পরে অবশ্য মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে মনোনয়ন ফেরত আনেন তিনি। সাবেক ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুর অনুসারী ক্যাডার বাহিনী দিয়ে ভোট ডাকাতি করে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
নগরবাড়ী ঘাটের ব্যবসায়ী আরশেদ আলী জানান, রেজাউল হক বাবুর দাপট ও ভয়ে এই ঘাটে কেউ ভিড়তে পারেনি। ব্যবসা করতে গেলে অতিরিক্ত চাঁদা দিয়ে তাকে ও তার লোকজনদের খুশি রাখতে হয়েছে। তাছাড়া এখানে ব্যবসা পরিচালনা অসম্ভব। তৎকালীন নৌমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের প্রভাব খাটিয়ে ঘাট দখলে নিয়ে জোরপূর্বক অতিরিক্ত চাঁদা নেওয়া শুরু করেন বাবু।
স্থানীয়রা জানান, কেবল চাঁদাবাজিই নয়, এলাকায় কোনো জমি পছন্দ হলেই তা মুকুকে দিয়ে দখল করে নিতেন বাবু। এলাকার নদী ও মুক্ত জলাভূমি দখল করে তৈরি করেছিলেন মাছের খামার। সামাজিক সমস্যায় সালিশ-বাণিজ্য করে নিজেদের খেয়ালখুশি মতো রায় দিতেন তারা। এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় সৈয়দপুর গ্রামের অসংখ্য বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে গ্রামবাসীকে মামলা দিয়ে এলাকাছাড়া করে বাবুর সন্ত্রাসী বাহিনী। নির্মম নির্যাতন চালানো হতো নারী ও বৃদ্ধদের ওপর।
সৈয়দপুর গ্রামের বৃদ্ধ আবদুল হক বলেন, শ^শুরবাড়ির অবহেলায় বিনাচিকিৎসায় আমার মেয়ে মারা যায়। বিষয়টি নিয়ে সালিশ করেন বাবু ও মুকু। সালিশে মেয়ের শ^শুরবাড়ির লোকদের জরিমানা করা হয় এবং গয়না ফেরত দেওয়ার রায় হয়। তারা সেগুলো দিলেও বাবু ও মুকু সেগুলো মেরে খেয়েছেন, বারবার চেয়েও আমি সেগুলো পাইনি।
আরেক বৃদ্ধ আবদুল আজিজ বলেন, বাবু, মুকু, ফিরোজ ও কবিররা আত্রাই নদী দখল করে খেয়েছেন। কাউকে নদীর পাড়েও নামতে দেয়নি। একই গ্রামের নুরুল ইসলাম মাস্টার বলেন, লোকজন দিয়ে বাবু চেয়ারম্যান আমার বাড়ি, জমি সব দখলে নিয়ে অন্যায়ভাবে বিক্রি করেছেন। প্রতিবাদ করলে আমাকে ও আমার ছোটভাইকে মারধর করেছেন। প্রাণের ভয়ে আমার ছোটভাই এলাকায় থাকতে পারেনি। পরে সে মারা যায়। এ রকম হাজারো ঘটনা আছে, যেগুলো বাবু ও তার বাহিনীরা ঘটিয়েছে।
একই গ্রামের বাসিন্দা বেড়া উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক সবুজ বলেন, এক দশকেরও বেশি সময় এই বাবু ও তার গুন্ডা বাহিনীর অত্যাচারে আমরা বিএনপি বা ভিন্নমতের লোক এলাকায় থাকতে পারিনি। সাধারণ মানুষকেও তারা ছাড়েনি। যে তাদের অন্যায়কে সমর্থন করেনি, তাকেই হামলা মামলা দিয়ে হয়রানি করেছেন। অবৈধভাবে মাটি ও বালু উত্তোলন, লোক দিয়ে মাদক ব্যবসাসহ কোনো অপকর্ম নেই, বাবু করেননি। মানুষের জমি ও বাড়ি দখলের অসংখ্য নজির রয়েছে সৈয়দপুর, আহম্মদপুর ও জাতসাখিনী গ্রামে। অবৈধ টাকায় ঢাকায় বিয়ের প্রলোভনে এক নারীর সঙ্গে সম্পর্ক করে, ওই নারীর কিশোরী মেয়েকে ধর্ষণ করেন বাবু। অপমানে ওই কিশোরী আত্মহত্যা করে। এ ঘটনায় মামলা চলমান।
বেড়ার ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী ছাত্রনেতা রাকিব বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে কাশীনাথপুরে ছাত্রদের ওপর বাবুর নেতৃত্বে হামলা করে সন্ত্রাসীরা। আন্দোলন চলাকালে অসংখ্যবার আমার ওপর হামলা চালানো হয়েছে। প্রকাশ্যে মারধর করা হয়েছে। মিথ্যা মামলা দিয়ে আমাকে থানায় দেওয়া হয়েছে। আমরা বাবু, মুকুসহ তাদের দোসরদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি চাই।
আমিনপুর থানার ওসি সৈয়দ মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ছাত্র আন্দোলনে হামলার ঘটনার আসামি বাবুসহ অন্য আসামিদের গ্রেপ্তারে পুলিশ তৎপর রয়েছে। অন্য বিষয়গুলোয় লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।