একসময় কুমিল্লার মানুষের যাতায়াত ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য পছন্দের বাহন ছিল রেল। মালামাল ও যাত্রী ওঠানামায় দিনরাত সরগরম থাকত জেলার বেশিরভাগ রেলস্টেশন। কিন্তু দিনবদলের পালায় একের পর এক বন্ধ হচ্ছে কুমিল্লার ছোট রেলস্টেশনগুলো। গত কয়েক বছরে লাকসাম থেকে নোয়াখালী, চাঁদপুর, চট্টগ্রাম ও আখাউড়া রেলপথে ২২টি স্টেশন বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ স্টেশনের আশপাশ দখল করে গড়ে উঠছে ব্যবসা-বাণিজ্য। স্টেশন ভবনগুলো পরিণত হয়েছে পরিত্যক্ত ভবনে। সেখানে নিয়মিত বসছে মাদকসেবীদের আড্ডা। এর মধ্যে অবশ্য পাঁচটি আধুনিকায়ন করা হয়। কিন্তু সেগুলোও জনবল সংকটে সেভাবে চালু হয়নি।
কুমিল্লা অঞ্চলের বন্ধ স্টেশনগুলো হলোজ্বা লাকসাম-নোয়াখালী রেলপথের দৌলতগঞ্জ, খিলা, বিপুলাসার, বজরা, মাইজদী ও হরিনারায়ণপুর। কুমিল্লা-চট্টগ্রাম রেলপথের ময়নামতী, আলীশ^র, নাওটি, শর্শদি, কার্লিদহ, মুহুরিগঞ্জ, মস্তাননগর, মিরসরাই ও বারগু-। একই পথের লালমাই স্টেশনে একটি ট্রেন থামে, যা নামমাত্র চালু আছে। লাকসাম-চাঁদপুর রেলপথে চিতোষী, শাহরাস্তি, উয়ারুক, বলাখাল, মধু রোড, শাহতলী ও মৈশাদী স্টেশন বন্ধ রয়েছে। লোকবল সংকটে আরও পাঁচ-ছয়টি স্টেশন বন্ধ হওয়ার উপক্রম।
সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, মালামাল ও যাত্রী ওঠানামায় দিনরাত সরগরম থাকা এক সময়ের দৌলতগঞ্জ স্টেশনের সব কক্ষে এখন ঝুলছে তালা। জং ধরেছে যন্ত্রাংশে। দখল, দূষণে রেললাইন এবং স্টেশন প্ল্যাটফর্ম। প্রবেশমুখে সিএনজিচালিত অটোরিকশার স্ট্যান্ড। ডান পাশে মাছের আড়ত এবং বাম পাশে মাছ, মাংস, সবজি ও ফলমূলের খুচরা বাজার। সবই রেলস্টেশন দখল করে। এ স্টেশনে বর্তমানে কোনো ট্রেন থামে না। একই চিত্র দেখা যায় খিলা ও বিপুলাসার রেলস্টেশনের।
এদিকে, লাকসাম-নোয়াখালী এ রেলপথের নাথেরপেটুয়া রেলওয়ে স্টেশনটিও বন্ধ হওয়ার পথে। এ পথের যাত্রী নাথেরপেটুয়া বাজার ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেন বলেন, একসময় নিয়মিত ট্রেন মালামাল নিয়ে আসতেন। এতে যাতায়াত খরচ কমত। তাই কাস্টমারদের কাছে কম দামে মালামাল বিক্রি করা যেত। বর্তমানে সিএনজি যোগে মালামাল আনা হয়। তাই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
কুমিল্লা-চট্টগ্রাম রেলপথ নাওটি রেলস্টেশন গিয়ে দেখা যায়, ভিআইপি গেস্টরুম, হলরুম, সিগন্যালিং রুম, স্টেশন মাস্টারের কক্ষসহ পাঁচ কক্ষের এমন সুন্দর ও আধুনিক স্টেশন। কিন্তু রয়েছে সব কক্ষে তালা। নেই কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী। এ স্টেশনে থামে না কোনো ট্রেন। ফলে নতুন হলেও পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে স্টেশনটি। একই চিত্র দেখা যায় আলীশ^র রেলস্টেশনের।
এ বিষয়ে নাওটি গ্রামের বয়োবৃদ্ধ আলী হোসেন বলেন, একসময় এ স্টেশনে অনেক মানুষ ওঠানামা করত। স্টেশন এলাকায় সারা রাত মানুষ থাকত। যাতায়াতের একমাত্র ভরসা ছিল ট্রেন। কম দামে যাতায়াত করতাম। কিন্তু বর্তমানে কোনো ট্রেন থামে না। এতে করে স্টেশনটি বন্ধ হয়ে গেছে। এখন আর দিনের বেলাও রেলস্টেশনের দিকে কেউ যায় না।
কুমিল্লা রেলওয়ের স্টেশন মাস্টার মাহবুবুল ইসলাম বলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে আখাউড়া পর্যন্ত যেসব স্টেশন বন্ধ রয়েছে, তা খুলে দেওয়ার ইঙ্গিত আমরা পেয়েছি। স্টেশনগুলোয় সিগন্যালিং ও বাণিজ্য-সংক্রান্ত কাজ চালু হবে। তবে যাত্রীবাহী ট্রেন থামার বিষয়ে এখনো কোনো আলোচনা হয়নি।’
এ বিষয়ে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (পথ) লিয়াকত আলী মজুমদার বলেন, ট্রেনের ইঞ্জিন সংকট ও জনবল সংকটের কারণে স্টেশনগুলো বন্ধ রয়েছে। ইঞ্জিন এলে লাকসাম থেকে চাঁদপুর, লাকসাম থেকে নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম থেকে আখাউড়া পর্যন্ত স্বল্প আকারের ট্রেনগুলো যাতায়াত শুরু করবে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল চট্টগ্রাম মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নাজমুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের জনবল সংকট রয়েছে। যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনগুলো বন্ধ রয়েছে। তবে অল্প সময়ের মধ্যে স্টেশন মাস্টার পদে নতুন করে নিয়োগ দিয়ে বন্ধ থাকা স্টেশনগুলো চালু করা হবে।