আবৃত্তি হচ্ছে বাচিক অভিনয়

তাকে অনেকেই বলেন আবৃত্তির বরপুত্র। আশির দশকের শেষ দিকে ১৯৮৮ সালে গড়ে তুলেছিলেন আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ। ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ই আবৃত্তিতে প্রথম একুশে পদক অর্জন করেন। দেশ রূপান্তর অফিসে এলেন মধ্যদুপুরে। পরনে খদ্দর পাঞ্জাবি। হাসিমুখে বললেন চলো, ছবি তুলে আসি। এরপর এলেন ডিজিটাল স্টুডিওতে। তাকে নিয়ে আড্ডায় মেতে উঠলেন বিশেষ প্রতিনিধি পাভেল হায়দার চৌধুরী, সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, সহ-সম্পাদক মো. ইমানুল সোহান এবং কনটেন্ট এডিটর গণেশ চন্দ্র রাজবংশী। ক্যামেরায় ছিলেন নুরুস সাফা।

যখন তিনি কথা বলছিলেন, তখন মনে হচ্ছিল ধীরস্থির একজন আলোকিত মানুষ নিচু স্বরে অবলীলায় কঠিন কিছু কথা সহজ ভঙ্গিতে বলছেন। কথাগুলো আমাদের স্পর্শ করে। কান-চোখ ফেরানো দায়। সবাই তন্ময় হয়ে শুনছিলেন। কী যে সাবলীল উচ্চারণ তার! ভরাট কণ্ঠস্বর, স্বাভাবিক মুখভঙ্গি, ঠোঁটের নাচন সবকিছুই যেন মাপা। মনে হলো এটাও কোনো আবৃত্তির ওয়ার্কশপ অথবা ইউনিভার্সিটির ক্লাসরুম। একসময় অনেক গল্প শেষে ক্যামেরার সামনে শুরু হলো কথা বলা। তখন আবার আরেক ভঙ্গি তার। প্রস্তুত হলেন বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য। এরপর প্রশ্নোত্তর

তাপস রায়হান : আপনার মধ্যে বাবা লোহিত কান্তি বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রভাব প্রবল। পরিবার থেকেই কি সংস্কৃতির প্রতি প্রবল ঝোঁক তৈরি হলো? 

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় : (মুচকি হেসে বললেন তোমরা তো আমার সম্পর্কে অনেক তথ্য নিয়ে বসেছ। হাহাহাহা) আসলে বাবা ছিলেন একজন অভিনেতা। তিনি ছিলেন জমিদার পুত্র। ফলে সারাক্ষণ অভিনয় আর আবৃত্তি নিয়েই

থাকতেন। তিনি পড়াশোনা করেছেন কলকাতার সিটি কলেজে, প্রেসিডেন্সি কলেজে। তখন কলকাতার আকাশবাণীতে নাটকের শিল্পী হিসেবে তালিকাভুক্ত হন। একসময় একটি অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ‘শেষ রক্ষা’ নাটকে ‘গদাই’ চরিত্রে অভিনয় করলেন। সেই অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন প্রধান অতিথি। নাটক শেষে বাবা তার পা ছুঁয়ে প্রণাম করার সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার মাথায় হাত রেখে বলেছিলেন আমি কি তোমাকে ভেবেই ‘গদাই’ চরিত্র লিখেছিলাম! নাটকটি অভিনীত হয়েছিল কলকাতা ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউটে। (পাভেল হায়দার বললেন এটা একটা অনেক বড় ব্যাপার।)

আমার ঠাকুর দা, লোলিত মোহন বন্দ্যোপ্যাধায় যিনি জমিদার ছিলেন, তিনিও অভিনয় করতেন। খুলনা শহরের জিরো পয়েন্টে ৫ বিঘার বেশি জায়গা নিয়ে আমাদের বাড়ি ছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ১০ দিন আগে, মানে ১১ ফেব্রুয়ারি আমার জন্ম। ১৯৫৮ সালে সেটা দখল হয়ে যায়। আমাদের বাড়িতে ডিএল রায়সহ অনেকেই আসতেন। তিনি তো এক সময় ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। আমাদের বাড়িতে এসে অনেক গল্প করতেন, নাটক লিখতেন। খুলনাতে যখন একটা নাট্যমন্দির তৈরি হয়, তার একজন ক্রিয়েটর ছিলেন ঠাকুর দা। আসলে ওই সময় যারা অভিনয় করতেন, তারা শখ করে করলেও, খুব সিরিয়াসলি অভিনয় করতেন। এরপর সেপারেশনের সময় অধিকাংশ অভিজাত হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ কলকাতায় চলে যায়। কিন্তু বাবা যাননি। ভাবলেন সবাই চলে গেলে, এই নাট্যমন্দিরের কী হবে! অনেক অফার ছিল। গেলেন না। আসলে তিনি তো বৈষয়িক একেবারেই ছিলেন না। হাহাহাহাহা। (পাভেল হায়দার মুচকি হেসে বললেন সাংস্কৃতিক বোধসম্পন্ন মানুষ তো বৈষয়িক হয় না।) সেই, সেই। (মুখ অনেকটা মলিন করে) এর জন্য তো আমরা প্রতি পদে পদে ভুগেছি। যেটুকু ছিল একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তাও শেষ হয়ে গেল। এরপর ভাড়া বাসায় থাকতাম। আমার একমাত্র বড় বোন দীপা বন্দ্যোপাধ্যায়। দিদি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী। তিনি আকাশ বাণীতেও কাজ করেছেন। আবার লেখালেখি করতেন। বেঙ্গল থেকে বের হয়েছে ‘আমার মুক্তিযুদ্ধ-১৯৭১’। আমরা যখন একাত্তরের ২৯ মার্চ পুরো পরিবার কলকাতার উদ্দেশে রওনা হই, সেই ভ্রমণ বাস্তবতা নিয়েই এই বই। আমি তখন ডিগ্রি প্রথম বর্ষে পড়ি, বিএল কলেজে। সেটি ছিল ভীষণ বিপদ যাত্রা। পরবর্তী সময়ে চুকনগর, সাতক্ষীরা, কলারোয়া, ঝাওডাঙ্গা হয়ে অনেক লাশ ডিঙ্গিয়ে ভারতীয় সীমান্তের কাছাকাছি চলে যাই। এরপরও পাকিস্তানি আর্মির মুখোমুখি। তারপর বিল সাঁতরে, লাল জল শরীরে মেখে একটি পাড়ে উঠলাম। এরপর হাসনাবাদ, চব্বিশ পরগনা যাই। চুকনগরের সেই হত্যাকা- কিন্তু আমরা প্রত্যক্ষ করেছি।

তাপস রায়হান : একাত্তরের যুদ্ধের সময় ভারতে যতদিন ছিলেন, সেখানে আপনার ভূমিকা কী ছিল?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় : প্রথমে কলকাতার তিলজলাতে একটা নিম্নবর্ণের বস্তিতে ছিলাম প্রায় মাস দেড়েক। তারপর আমি হাবরাতে ডোল বা রেশন তুলতাম। এত পরিমাণে দিত যে, আমাদের প্রয়োজন মিটিয়েও বাড়তি

থাকত। সেগুলো আবার ক্যাম্পের বাইরে কিন্তু বিক্রি হতো। তখন বিক্রি করে দিতাম। কী করব, হাতে তো পয়সা নেই। ট্রেনে পয়সা লাগত না। ‘জয় বাংলা’ পরিচয় দিলেই হতো। শেষ দিকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজনের সঙ্গে সম্পর্ক হলো। সেখানে আবার আবৃত্তি শুরু। তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নিয়ে একটা ট্যাবলয়েড বের হলো। সেখানে ছিল বর্ডারের ঘটনা, মুক্তিযুদ্ধের গল্প, কবিতা, রেডিওতে যেসব কবিতা আবৃত্তি, নাটিকা হতো, সেগুলো শুনে পত্রিকায় লিখতাম। এ রকম অনেক কিছু। ঐগুলোই ছাপা হতো। এরপর কলকাতার শিয়ালদহ স্টেশনে তা বিক্রি করতাম। থিয়েটার রোডের বাংলাদেশ সচিবালয়, যেটা ছিল একটা দোতলা বাড়ি, এখন যেটা অরবিন্দ আশ্রম, সেখানে সেই পয়সা ডোনেট করতাম।

পাভেল হায়দার চৌধুরী : আপনার আইডল কে? কে আবৃত্তিতে উদ্বুদ্ধ করেছেন?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় : মূল জায়গাটা কিন্তু আমার বাবা। তার কাছেই শিখেছি, কীভাবে আসন করে বসে, নাভিমূল থেকে বাতাস টেনে মুখে আনতে হয়? সেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেবতার গ্রাস, চ-ীপাঠ, মেঘদূত সংস্কৃত শ্লোক খুব শুনতাম। সেসব আমাকে ভীষণ উদ্বুদ্ধ করে। আমাদের একটা ট্রানজিস্টার ছিল। ৬ ব্যাটারির সেটা কিন্তু এখনো আছে। সেই ট্রানজিস্টারে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের গান, আবৃত্তি, রম্য শুনতাম। অনেক শিল্পী ছিলেন। মূলত শম্ভু মিত্রকে ভীষণ ভালো লাগত। তিনি নাটকের অভিনেতা হয়েও যেভাবে আবৃত্তি করতেন, সেটা যেন একটা শিল্প হয়ে উঠত। দারুণ এক্সাইটেড হতাম তার কণ্ঠ শুনে। তখন আমি তার মতো করে কবিতা আবৃত্তি করার চেষ্টা করতাম। এখনো কিন্তু সেসব মুখস্থ আছে। শম্ভু মিত্র যখন জীবনানন্দের আট বছর আগের একদিন কবিতাটা আবৃত্তি করতেন, তখন আমি শিউরে উঠতাম। আহা...! এরপর যার কথা বলবে, তিনি হচ্ছেন কাজী সব্যসাচী। অসাধারণ কণ্ঠ, অপূর্ব আবৃত্তি শুধু নজরুলের কবিতা না, ৩০ দশকের অচিন্ত্য কুমার সেনগুপ্ত এবং অন্য কবিদের কবিতাও যে দারুণ নৈপুণ্যের সঙ্গে আবৃত্তি করতেন, যা রেকর্ড হতো তা ছিল অসম্ভব ভালো লাগার মতো। রেডিওতেই ওই সব শুনতাম। আর উচ্চারণের কথা যদি বলি, আবৃত্তির ধারা যদি বলি, যাদের মানি এখনো পর্যন্ত তারাই। আসলে যুগে যুগে সবই তো পাল্টায়। আধুনিক হয়। এটাই নিয়ম। ৫০ বছর আগে যে সিনেমা তৈরি হতো, তা এখন হবে না। ভাবনা, মেকিং অনেক পাল্টে গেছে।

পাভেল হায়দার চৌধুরী : আবৃত্তি শিল্প আমাদের দেশে কোন পর্যায়ে রয়েছে? আপনার কি মনে হয়, এই শিল্পের কোনো বিবর্তন হয়েছে? যদি বলি, আবৃত্তি কি সেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে?

ভাস্বর বন্দ্যোপ্যাধায় : আসলে বাংলাদেশ আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ হওয়ার আগে, সংগঠনভিত্তিক তেমন আবৃত্তি হতো না। যা হতো, তা ব্যক্তিকেন্দ্রিক। তার মধ্যে কয়েকজনের নাম তো বলতেই হয়। যেমন- ফতেহ লোহানী, দাউদ খান মজলিস, কাফি খান,  গোলাম মুস্তাফা এবং খান আতা। এই খান আতা অভিনয় ছাড়াও চমৎকার আবৃত্তি করতেন। তারপর ইকবাল বাহার চৌধুরী। আসলে গোলাম মুস্তাফাই আবৃত্তিকে শিল্পের মানদ-ে উন্নীত করেছেন। আসলে আবৃত্তি হচ্ছে বাচিক অভিনয়।

মো. ইমানুল সোহান : এই প্রশ্নটা আগেই করা দরকার ছিল। তারপরও বলি, আপনার ছেলেবেলা, বেড়ে ওঠা কেমন ছিল? একেবারেই শান্ত না ডানপিটে?

ভাস্বর বন্দ্যোপ্যাধায় : একেবারেই ডানপিটে। গাছের ওপর থেকে পুকুরে ঝাঁপ দেওয়া, নারকেল গাছে ওঠা, সেখান থেকে নারকেল পেড়ে খাওয়া যা হয় আর কী। এক কথায় ‘গেছো’ বলতে যা বোঝায়। আমাদের বাড়িতে তো যাবতীয় ফলের গাছ ছিল। ফ্যামিলির মধ্যে আমিই এ রকম ছিলাম। আমি যেহেতু মধ্যম সন্তান, তারা নাকি এ রকমই হয়। হাহাহাহা। দিদির কণ্ঠে গান শুনতাম। মা সেতার বাজাতেন। বাবা তো নাটক, আবৃত্তির মানুষ। ছোটভাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অভিনয় করত। আর আমার লেখালেখির শুরু ছোটবেলা থেকেই। আবৃত্তি তো আছেই। একটা বিষয় এই ফাঁকে জানিয়ে রাখি, আমি নভেম্বরে সিঙ্গাপুর যাচ্ছি। সেখানে আমার এক ছাত্র একটা আবৃত্তি দল করেছে। ওদেরই আমন্ত্রণে যাচ্ছি নভেম্বরের ২৩ তারিখে।

পাভেল হায়দার চৌধুরী : আপনি অনেক জায়গায় বিচরণ করেছেন। সাংবাদিকতা, কবিতা, লেখালেখি, আবৃত্তি, শিক্ষক আসলে কোন জায়গাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেছেন?

ভাস্বর বন্দ্যোপ্যাধায় : আসলে যখন যেটা করি, তার ওপরেই কনসেন্ট্রেশনটা বেশি দিই। লেখালেখিতে কোন জায়গায় গেছি জানি না। নাটকসংক্রান্ত তিনটি বই বের হয়েছে। সামনের বইমেলায় আরও দুটো বের হবে। সবই নাটকসংক্রান্ত। গল্প, উপন্যাসের দিকে আমি যাইনি। আর আবৃত্তি তো ভালোবাসার একটা বিষয়। আর এখন তো মানুষের ডাকের ওপরে আছি। শিক্ষকতায় ঢুকেছি। একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই। জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটে কোর্স মডিউল শুরু করা থেকে, ক্লাস নেওয়া পর্যন্ত চলছে। আর অবসর নেওয়ার পরে তো স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে আছিই। এর আগে ১ বছর ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনে কনসালট্যান্ট হিসেবে ছিলাম। তখনই আমার স্টামফোর্ড থেকে ডাক পড়ে। এরপর চলে যাই। ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া ডিপার্টমেন্টে। যেহেতু মস্কোতে ফিল্ম অ্যান্ড স্ক্রিপ্ট রাইটিংয়ে একটা কোর্স করেছিলাম, সেই কারণেই ওরা ডাকে। আর টিচিংয়ের মধ্যে কিন্তু এডুকেশন এবং ট্রেনিং আছে। এই দুটোকে ব্লেন্ডিং করে ক্লাসগুলো নিচ্ছি। আবার জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টেও ক্লাস নিচ্ছি। এসবই আমার প্রিয়।

তাপস রায়হান : আপনি একটা বিষয় পরিষ্কার করেন। ঠিক কোন সময় জার্নালিজম বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করলেন?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় : আমি ছিলাম খুলনায় একটু এক্সট্রিম বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ছিলাম বিজ্ঞানের ছাত্র। সেখানে তো রেগুলারিটি দরকার। প্র্যাকটিক্যাল করতে হয়। আমি তো তা পারিনি। পরীক্ষা দিতে এসে তো দেখলাম, কিছুই পারিনি। ভাবলাম, প্র্যাকটিক্যাল না করলে সায়েন্সে পাস করা যাবে না। তখন বাদ দিলাম। ভর্তি হলাম পাসকোর্সে। ছাত্র কিন্তু খারাপ ছিলাম না। মুক্তিযুদ্ধের পর দেশে যখন এলাম, তখন মুজিব বাহিনীর অনেক নেতার সঙ্গে পরিচয় ছিল। তখন স্থানীয় একটি পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত হলাম। সে সময় আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অনেক লেখা হতো। আমি এর সঙ্গে ৭৪ সাল পর্যন্ত যুক্ত ছিলাম। এরপর ঢাকার বঙ্গবার্তায় যুক্ত হলাম। সেখানে ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্টিং করতাম। বার্তা সম্পাদক ছিলেন কামাল লোহানী। তখনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্নালিজমে ভর্তি হলাম। তখন তো আর লিখিত পরীক্ষা হতো না। শুধু মৌখিক। এরপর যুক্ত হলাম ম. হামিদের নাট্যচক্রে। আমি অনার্স শেষ করেই পড়াশোনা করতে দিল্লি চলে যাই। সেখান থেকে আবার এলাম দেশে। এরপর মাস্টার্স দিলাম।

মো. ইমানুল সোহান : প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবৃত্তি সংসদ আছে। কিন্তু আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা নেই। এটা বড় একটা সমস্যা। ফলে সাংগঠনিক কাজটা ঠিকমতো হয় না। এক্ষেত্রে কী করা যেতে পারে?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় : এটা দীর্ঘ আলোচনা। এত স্বল্প পরিসরে বলা সম্ভব নয়। তবে সংগঠনকেই এই বিষয়ে তৎপর হতে হবে। আর্থিক বিষয়টা সংগঠন চালাতে গেলে ভাবতেই হবে।

তাপস রায়হান : আপনি ১৯৮৫ সালে আবৃত্তি সংগঠন ‘কথা’ তৈরি করলেন। এরপর ৮৮ সালে করলেন আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ। প্রথম অনুষ্ঠান হলো ৮৯ সালে। নব্বইয়ের আন্দোলনের কেমন ভূমিকা ছিল?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় : সে এক বিশাল ঘটনা। তবে সেই সময় আমরা ট্রাকে করে শহরে শহরে ঘুরেছি। ঢাকার বাইরেও গেছি। তখন কিন্তু আমি আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদের সভাপতি। সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সাগর লোহানী। পরেরবারও আমি সভাপতি ছিলাম। তখন সাধারণ সম্পাদক ছিল ইস্তেকবাল হোসেন। এখন ও অসুস্থ। এরপর হাসান আরিফ হলো সাধারণ সম্পাদক।

পাভেল হায়দার চৌধুরী : আপনি অনেক কিছু করেছেন। এ সময় কারও সঙ্গে প্রেম-ভালোবাসা হয়নি?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় : আসলে আমি তো অনেকের সঙ্গেই মিশেছি। সেখানে কারও কারও সঙ্গে ভালো সম্পর্ক ছিল। তখন চাকরি নেই, ইনকাম নেই, পয়সা নেই প্রেম করা, সময় দেওয়া তো বিরাট বিষয়। এ রকম কিছু ছিল না। আসলে বিয়ের আগে সেভাবে কোনো প্রেম হয়নি। এরপর তো বিয়েই করলাম ৮৭ সালে।

তাপস রায়হান : আপনার স্ত্রী শর্মিলা বন্দ্যোপ্যাধায়। বরেণ্য নৃত্যশিল্পী। তার সঙ্গে আগে পরিচয় ছিল?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল সংস্কৃতি সংসদ। সেখানে আসাদুজ্জামান নূর, হাসনাত ভাই ছিলেন। আমি ছিলাম তার ভাইস প্রেসিডেন্ট। শর্মিলা সেখানে তখন নাচের প্রশিক্ষক ছিল। ওই রকম জানাশোনা বা বিশেষ কিছু ছিল না। আমরা একই সময় স্কলারশিপে ভারতে যাই। সে গেল বিশ্বভারতীতে আর আমি গেলাম দিল্লিতে।

তাপস রায়হান : আপনি চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন। নাটক, চলচ্চিত্র, অধ্যাপনা, লেখালেখি এত সময় পাচ্ছেন কোথায়? আর চলচ্চিত্র কতগুলো হয়েছে?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় : এখন তো আর আগের মতো পারি না। তবু প্রায় দশটা ছবিতে অভিনয় করেছি। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেলালন, নদীর নাম মধুমতি আর রাবেয়া। এই তিনটি হলো তানভীর মোকাম্মেলের। সাজেদুল আওয়ালের ছিটকিনি। এছাড়া গৌতম ঘোষের ‘মনের মানুষ’।

তাপস রায়হান : সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আবৃত্তি কেমন লাগে?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় : এক কথায় অসাধারণ। তার মুখে কোনো বাড়তি ছাপ নেই। আমি ভীষণ পছন্দ করি।

গণেশ চন্দ্র রাজবংশী : আপনার বয়স কেমন? বাঁচার ইচ্ছা কত দিন?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় : এখন ৭৩ চলছে। তত দিন বাঁচতে চাই, যত দিন সুস্থমতো চলাফেরা করতে পারি।

গণেশ চন্দ্র রাজবংশী : সরকারের কাছে কিছু চাওয়া আছে?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় : আমি চাই আবৃত্তির জন্য একটা পৃথক ইনস্টিটিউিট হোক।

তাপস রায়হান : এখন কী নিয়ে ব্যস্ততা?

ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় : একটা হিন্দি নাটকের অনুবাদ করছি। মোহন রাকেশের। আষাঢ়ের একদিন। কবি কালীদাসের জীবনের ওপর। অনেকটা কল্পিত কাহিনি। আমার মনে হয়েছে এটা অসাধারণ নাটক।

আড্ডা শেষে পাভেল হায়দার চৌধুরী চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্দেশে বললেন দাদা, একটা দারুণ তথ্য পেলাম আজকের আড্ডায়। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আপনার বাবার মাথায় হাত রেখে আশীর্বাদ করে বলেছিলেন, ‘গদাই’ চরিত্রটা মনে হয় তোমাকে মনে করেই লিখেছি। এটা কিন্তু দারুণ বিষয়। ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় খেতে খেতে, মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন একদম। এসব পরম্পরায় এসে গেছে।

তখন অনেক রাত। মোবাইলে সময় দেখে ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যায় চমকে উঠলেন। বললেন হায় হায়, সর্বনাশ। অনেক দেরি হয়ে গেছে। দেখো তো কত রাত হয়ে গেল। মুচকি হেসে বললেন ধ্যাত...!

গ্রন্থনা : অনিন্দিতা আচার্য

ছবি : আবুল কালাম আজাদ 

লোকেশন : গ্রিন লাউঞ্জ