যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন নির্বাচন নিয়ে দেশটির সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। এবার নির্বাচনের আগেই দেশটিতে ভোটবাক্স পোড়ানো, সহিংসতা, ফল পাল্টানোর চেষ্টাসহ রাজনৈতিক সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে, যা খুবই বিরল। ফলে সাধারণ মানুষদের ভেতরে উদ্বেগের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। এমনকি বিশে^র বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করছেন দেশটির সাধারণ নাগরিকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম এপির একটি জরিপে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের শঙ্কার চিত্র উঠে এসেছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এনওআরসি সেন্টার ফর পাবলিক অ্যাফেয়ার্স রিসার্চের একটি জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, দেশটির জনগণ গণতন্ত্র নিয়ে গভীর উদ্বেগের কথা বলেছেন। ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল মানতে ট্রাম্পের অস্বীকৃতি ও ক্যাপিটল হিলে ট্রাম্প সমর্থকদের হামলার ঘটনা এবারের নির্বাচনের আগে নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জন নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে চারজনই নভেম্বরের নির্বাচনের পর ফল পাল্টে দেওয়ার সহিংস প্রচেষ্টা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একইসংখ্যক মানুষ আইনি প্রচেষ্টার মাধ্যমে এমনটা করা হতে পারে বলেও মতপ্রকাশ করেছেন। প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন ভোটার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, স্থানীয় বা অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে নির্বাচনী কর্মকর্তারা চূড়ান্ত ফল প্রকাশ আটকানোর প্রচেষ্টা করতে পারেন।
২০২০ সালের নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর দাবি করেছিলেন, কারচুপি ও জালিয়াতির মাধ্যমে তাকে পরাজিত করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের সপক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনী বিশ্লেষকরা বলছেন, এবারো ফল নিজের পক্ষে না এলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। জরিপে দেখা গেছে, প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন ভোটার মনে করেন, প্রত্যেক অঙ্গরাজ্যে ভোটগণনা শেষ করে এবং অভিযোগের চ্যালেঞ্জগুলো আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে সমাধান করা হলে নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীকে তা অবশ্যই মেনে নেওয়া উচিত।
ট্রাম্প পরাজয় স্বীকার প্রসঙ্গে অবশ্য ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের মধ্যে ব্যাপকভাবে ভিন্নমত রয়েছে। রিপাবলিকান ভোটারদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মনে করেন, ট্রাম্প পরাজয় স্বীকার করবেন। তবে ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে প্রতি ১০ জনের মাত্র একজন এমনটি মনে করেন। অবশ্য ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিসের ক্ষেত্রে ভিন্নমত দেখা গেছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় ৮ জন ভোটারই মনে করেন, কমলা নির্বাচনের ফল গ্রহণ করবেন, এমনকি তিনি যদি হেরেও যান তবে তা মেনে নেবেন। আর ট্রাম্প নির্বাচনের ফল মেনে নেবেন এবং হারলে তা স্বীকার করবেন, এমন মত দিয়েছেন নিবন্ধিত ভোটারদের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ।
মতাদর্শগত বিষয়ে আমেরিকানরা গভীরভাবে বিভক্ত ছিল। প্রায় ১০ জনের মধ্যে ৮ জন রিপাবলিকান মনে করেন, ট্রাম্প আরেকটি মেয়াদে দেশটির প্রেসিডেন্ট হলে গণতন্ত্রকে ‘অনেক’ বা ‘অল্প’ করে হলেও শক্তিশালী করবে। ডেমোক্র্যাটদেরও একই অংশ কমলার বেলায় একই কথা বলেছে। প্রতিটি দলের প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৯ জন ভোটারই মনে করেন, বিরোধী দলের প্রার্থী নির্বাচিত হলে গণতন্ত্রকে অন্তত ‘কিছুটা’ হলেও দুর্বল করতে পারে। নভেম্বরের নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র কীভাবে চলতে পারে এ নিয়ে উভয় দলের সদস্যদের মধ্যে ব্যাপক উদ্বেগ রয়েছে। সামগ্রিকভাবে প্রায় অর্ধেক ভোটার মনে করেন, নির্বাচনে জয়ী হলে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্রকে ‘অনেক’ বা ‘কিছুটা’ হলেও দুর্বল করে ফেলবেন। হ্যারিসের বিষয়েও একই অভিমত রয়েছে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৪ জন ভোটারের। উদ্বেগের মধ্যে সীমান্ত এবং অভিবাসনও রয়েছে। রিপাবলিকানদের মতে, কমলা জিতলে সেটি হবে সীমান্ত টহলের সমাপ্তি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের শেষ সময়ে দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্যে দুই প্রার্থীর লড়াই আরও তীব্র হচ্ছে। গত বুধবার সিএনএনের জরিপে দেখা গেছে দুই দোদুল্যমান রাজ্যে মিশিগান ও উইসকনসিনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চেয়ে স্পষ্টত এগিয়ে রয়েছেন কমলা হ্যারিস। আর পেনসিলভানিয়ায় জনসমর্থনে দুজনের অবস্থান সমানে সমান। জরিপ অনুযায়ী, মিশিগানে ৪৮ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন কমলা। সেখানে ট্রাম্প সমর্থন পেয়েছেন ৪৩ শতাংশ ভোটারের। আর উইসকনসিনে কমলার ৫১ শতাংশ সমর্থনের বিপরীতে ট্রাম্প পেয়েছেন ৪৫ শতাংশ সমর্থন। ফলে এ দুই অঙ্গরাজ্যের ইলেকটোরাল ভোট কমলার ঝুলিতে যাবে বলে প্রত্যাশা বিশ্লেষকদের। তবে পেনসিলভানিয়ায় দুই প্রার্থীরই জনসমর্থন ৪৮ শতাংশ করে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের জনসভা থেকে পেনসিলভানিয়ার পুয়ের্তোরিকান ভোটারদের নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্যের কারণে সেখানে রিপাবলিকানরা ধাক্কা খেতে পারেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আর তেমনটা হলে এ তিন দোদুল্যমান রাজ্য ডেমোক্র্যাটরা জয় পেলে, কমলা হোয়াইট হাউজের পথে অনেকটাই এগিয়ে যাবেন বলে মনে করা হচ্ছে। মিশিগান, উইসকনসিন ও পেনসিলভানিয়া এ তিন রাজ্যে ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের সংখ্যা ৪৪টি।
এদিকে, ক্যালিফোর্নিয়া সাবেক রিপাবলিকান গভর্নর আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিস ও তার রানিংমেট টিম ওয়ালজকে ভোট দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। গত বুধবার এ ঘোষণা দেন তিনি। নির্বাচনের শেষ মুহূর্তেও প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন কমলা ও ট্রাম্প। সম্প্রতি রিপাবলিকানদের সমর্থকদের আবর্জনা বলে আখ্যায়িত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। তার জবাবে বুধবার উইসকনসিনের একটি বিমানবন্দরে নিজের উড়োজাহাজ থেকে নেমে সোজা আবর্জনাবাহী একটি ট্রাকে গিয়ে ওঠেন ট্রাম্প। সেখান থেকেই সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট। তবে এ নিয়েও সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। কারণ নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্পই প্রথম প্রতিপক্ষকে আবর্জনা বলে সম্বোধন করেছিলেন। ট্রাম্প যখন উইসকনসিনে নতুন কৌশল নিয়ে ব্যস্ত তখন আরেক দোদুল্যমান রাজ্য নর্থ ক্যারোলিনায় সমাবেশ করেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিস।
অন্যদিকে, আসন্ন নির্বাচনে ট্রাম্পের হয়ে প্রচার চালানো বিশে^র শীর্ষ ধনকুবের ইলন মাস্ককে শুনানির জন্য আদালতে হাজির হতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে লটারির মাধ্যমে ১০ লাখ ডলার উপহার দেওয়াকে কেন্দ্র করে গতকাল বৃহস্পতিবার তাকে শুনানিতে উপস্থিত থাকার আদেশ দেয় ফিলাডেলফিয়ার আদালত। ফিলাডেলফিয়া ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় থেকে সোমবার এ মামলা করা হয়।