বাংলাদেশে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের কার্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব নিয়ে সরকারের দুজন উপদেষ্টা দুই রকম বক্তব্য দিয়েছেন। একজন বলেছেন, সিদ্ধান্ত হয়েছে। অন্যজন বলেছেন, সিদ্ধান্ত হয়নি। এরই মধ্যে হেফাজতে ইসলাম মানবাধিকার পরিষদের কার্যালয় স্থাপনের বিরোধিতা করে বিবৃতি দিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন রাজনীতি ও কূটনীতি বিশ্লেষকরা।
তারা মনে করছেন, লাভ-ক্ষতি বিবেচনা করে এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তবে ফলকার টুর্কের সফরে এ বিষয়ে কোনো কিছু চূড়ান্ত না করাকে তারা ইতিবাচক বলে মনে করছেন।
গত মাসে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে এই প্রস্তাব দেওয়া হয়। গত সপ্তাহে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্কের সফরে এ সংক্রান্ত একটি নীতিগত চুক্তির প্রস্তুতিও নেওয়া হয় জাতিসংঘের মানবাধিকর সংস্থার পক্ষ থেকে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটি আলোচনা পর্যন্তই সীমিত ছিল। যদিও সফরের প্রথম দিন গত মঙ্গলবার টুর্কের সঙ্গে বৈঠক শেষে সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমিন মুরশিদ জানিয়েছেন, ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কার্যালয় হবে।
তবে সফরের শেষদিন বুধবার পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এ বিষয়ে বলেন, ‘ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের কার্যালয় খোলার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বিষয়টা নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। এটা পরীক্ষা করে দেখা হবে। এটাই হলো প্রকৃত অবস্থান। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে অফিস দেওয়া হবে বা হবে না এটাও বলা হয়নি। আমরা বিষয়টা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখছি।’
বৃহস্পতিবার হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ বিবৃতি দিয়ে বলেছে, এটা চরম আত্মঘাতী হবে।
সাবেক কূটনীতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই-আগস্ট ইস্যুতে জাতিসংঘ তদন্ত করছে। তারা মানবাধিকার ইস্যুতে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করছে এটা অবশ্যই ভালো বিষয়। এটা নির্দিষ্ট একটি ইস্যু। তাছাড়া বিভিন্ন সময়ে মানবাধিকার বিষয়ে জাতিসংঘ সহায়তা করে থাকে। কিন্তু বাংলাদেশে অফিস করা মানে হলো তারা সব সময় নানা ইস্যুতে কাজ করবে। এটা বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের জন্য কতটা সহজ হবে সে বিষয়ে রাজনৈতিক দল এবং সমাজে প্রতিনিধিত্বকারীদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার।
কূটনীতিকরা মনে করেন, এখানে জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের কার্যালয় খুললে হয়তো সব মানবাধিকার সমস্যার সমাধান হবে, এমন ধারণা রয়েছে। ব্যাপারটা আসলে সে রকম নয়। তাদের মধ্যে বহুপক্ষীয় ব্যবস্থায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশন বিভিন্ন স্পর্শকাতর বিষয়ের প্রসারের জন্য কাজ করে। বাংলাদেশে কার্যালয় খোলা হলে এ বিষয়ে তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে সরকারকে।
তাদের মতে, কারণ জাতিসংঘ মানবাধিকার হাই কমিশন কিছু বিষয়ের প্রসার চায়, যা বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে গ্রহণযোগ্য নয়। এর মধ্যে সমকামিতার বৈধতা বা সর্বজনীন শিক্ষা (যৌন শিক্ষাসহ) বা সবক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমান অধিকার এসব বিষয় রয়েছে।
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবির) সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা একটি বড় বিষয়। কাজেই এ সিদ্ধান্তটা আলাপ-আলোচনা করেই নেওয়া উচিত। বিশ্বের অন্যান্য দেশে কীভাবে তারা কাজ করে সেটাও দেখতে হবে।
কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত মাসে ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের দপ্তর খোলার প্রস্তাব দেওয়া হয়। দপ্তর চালুর বিষয়ে ফলকার টুর্কের সফরেই চুক্তি সই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে একটি খসড়া দেয় জাতিসংঘ। তাতে বলা হয়, ঢাকায় জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের এদেশীয় দপ্তর চালু হলে সেটি মানবাধিকার সমুন্নত ও বিকাশের স্বার্থে নীতি প্রণয়ন, বাস্তবায়ন এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সহায়তা করবে। বাংলাদেশ মানবাধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক যেসব সনদ অনুসমর্থন করেছে, তার সঙ্গে সংগতি রেখে আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পূরণে দপ্তর থেকে পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দেওয়া হবে। খসড়ায় জাতিসংঘের প্রতিনিধিদের অবাধে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া এবং প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে কোনো গ্রেপ্তার, আটক এবং জেরা করার প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের দপ্তরের প্রতিনিধিদের অবাধে প্রবেশাধিকার দিতে হবে।
এ ছাড়া প্রস্তাবিত দপ্তর বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সমুন্নত রাখতে বিদ্যমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। আন্তঃসীমান্ত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সুরাহা ও বলপূর্বক গুমবিষয়ক কমিশনসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে নানা সহায়তা দেবে। এই দপ্তর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রক্রিয়ায় মানবাধিকারের দৃষ্টিভঙ্গিকে যুক্ত করার ওপর জোর দেবে। পুলিশ এবং আইন সংস্কারে প্রয়োজনীয় সুপারিশ ও কারিগরি সহায়তাসহ সংস্কার প্রক্রিয়ায় কারিগরি সহায়তা দেবে।