কারিগরি শিক্ষার উন্নয়ন ছাড়া দেশের পরবর্তী উন্নয়ন প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়। মানসম্পন্ন কারিগরি শিক্ষার জন্য বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তিন সুপারিশ করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সুপারিশগুলোর প্রথমটি হলো পরবর্তী উন্নয়নের ধাপে যেতে মানসম্পন্ন কারিগরি শিক্ষা বাংলাদেশের উন্নয়নের আগামী দিনের অন্যতম ভবিষ্যৎ। এ কারিগরি শক্তি শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন ও সেবা খাতের আধুনিকায়নের জন্য প্রয়োজন। দ্বিতীয় সুপারিশে তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বহু ধরনের সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। কারিগরি শিক্ষার আধুনিকায়ন এবং এর সংস্কার ও রূপান্তরের জন্য অংশীদারত্বমূলক বিশেষজ্ঞ কমিটি তৈরি করার জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি। তিন মাস সময় নিয়ে এটি দ্রুত কার্যকর করা প্রয়োজন, যাতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থসংস্থান করে প্রয়োজনীয় নীতি-নির্দেশ দিতে পারে।
তৃতীয় সুপারিশ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ কাজটির উপকার যাতে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলো পায়। ছাত্রদের গণ-আন্দোলনে যারা আহত হয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, অসুবিধাগ্রস্ত হয়েছেন তারা যেন রূপান্তরমূলক প্রশিক্ষণের সুযোগে নিজেদের দাঁড় করাতে পারেন।
গতকাল শনিবার রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে আয়োজিত ‘যুব কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে স্থানীয় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা’ শীর্ষক জাতীয় সম্মেলনে এসব কথা বলেন ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। সম্মেলনটির আয়োজন করে এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম ও এসডো। এ সময় উপস্থিত ছিলেন ইউসেপ বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি এ মতিন চৌধুরী, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান সচিব মো. রুহুল আমিন, ইএসডিওর নির্বাহী পরিচালক ড. মুহম্মদ শহীদ উজ জামান প্রমুখ।
সম্মেলনে ড. দেবপ্রিয় বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। কারিগরি শিক্ষার শুধু আধুনিকায়ন নয়, সরকারের কাছে আহ্বান জানাচ্ছি, অংশীদারত্বমূলক সংস্কার কমিটি তৈরির। আশা করব, দ্রুত আধুনিক, দক্ষ, রূপান্তরমূলক কর্মপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেবে সরকার। ২০২৫-২৬ বাজেটে অর্থ সংস্থান ও প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেবে সরকার।
সিপিডির সম্মানীয় আরেক ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে যে সমস্যাগুলো বিদ্যমান, সেগুলোর সমাধান না করে নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি করা কোনো সমাধান নয়। কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাত্র ১৮ থেকে ২০ শতাংশ শিক্ষক দিয়ে কীভাবে চলে, যেখানে চলমান প্রতিষ্ঠানগুলোতেই ৮০ শতাংশ শিক্ষকের পদ শূন্য সেখানে নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করে লাভ কী।
তিনি আরও বলেন, স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কেমন হবে, তা নির্ভর করবে শিক্ষার্থীদের কেমন প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে তার ওপর। বাজারচাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি ও ইউসেপ বাংলাদেশের সাবেক সভাপতি এ মতিন চৌধুরী বলেন, প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। কিন্তু প্রযুক্তির সঙ্গে কারিকুলাম পরিবর্তন হচ্ছে না। কারণ আমাদের শিক্ষকরাই এসব আপডেট প্রযুক্তির সঙ্গে প্রশিক্ষিত নন।
শিল্প খাতের সঙ্গে মিল রেখে সিলেবাসের মিল রাখার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের শিল্প খাতের সঙ্গে শিক্ষা সিলেবাস কানেক্টেড না। সিলেবাসে শিল্প খাতের কাজের ধরনের সঙ্গে মিল রেখে সাজাতে হবে। আমাদের অনেক সম্ভবনা আছে, কিন্তু মাইন্ডসেট ঠিক করা যায়নি। আমাদের শিল্পমালিকদের আয়ের ২ শতাংশ প্রশিক্ষণে ব্যয় করলে সরকারকে ১ টাকাও ব্যয় করতে হবে না।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. রুহুল আমিন বলেন, কর্মসংস্থান আমাদের সবচেয়ে বড় ইস্যু। প্রত্যেকের আগ্রহ বাড়াতে হবে। অনেক ট্রেনিংয়ে শিক্ষার্থী নেই। সিরিয়াসনেস বাড়াতে হবে। কেননা বর্তমানে টেকনোলজি এত দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে, যা বলে বোঝানো সম্ভব নয়। ফলে পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কারিকুলামও পরিবর্তন করা সম্ভব হয় না।
এর আগে, ‘যুব কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে স্থানীয় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা’ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. তৌফিকুল ইসলাম খান। গবেষণা প্রতিবেদনটিতে সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল, কলেজ, পলিটেকনিক ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত কারিগরি শিক্ষা-প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের মতামত নেওয়া হয়েছে। ৬০০ বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী, ৬০ শিক্ষক-প্রশিক্ষক, ২৪০ অভিভাবক, ৭৫ সরকারি কর্মকর্তা এবং ৭৫ জন বিষয় বিশেষজ্ঞ ও চাকরিদাতাদের মতামত নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ৬৭ শতাংশ কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ভালো। তবে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের ১৩ শতাংশ শিক্ষার মানে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। সাবেক শিক্ষার্থীদের ৬৩ শতাংশের মাসিক বেতন ১০ হাজার টাকার নিচে।
প্রতিবেদনে আরও জানানো হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রয়োজনীয় উপকরণ ও যন্ত্রাংশ নেই, ল্যাবের সংখ্যা অপ্রতুল। পঞ্চগড় ও সুনামগঞ্জে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট না থাকায় শিক্ষার্থীরা দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা লাভের সুযোগ বঞ্চিত হচ্ছে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ ডাটাবেজ না থাকায় অসাধু শিক্ষার্থীরা ভাতার একাধিক কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিবন্ধিত হয়।
এতে আরও জানানো হয়, প্রতি বছর কারিগরি শিক্ষায় মাধ্যমিক পর্যায়ে সমাপনকারী মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রীর হার কমেছে। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, সাধারণ মানুষ তাদের ঘৃণার চোখে দেখে।