সাধারণ শিক্ষা সিলেবাসে ধর্মশিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করাসহ ৯টি দাবি জানিয়েছেন তাবলিগ জামাতের প্রয়াত মাওলানা জুবায়েরুল হাসানের অনুসারী শীর্ষস্থানীয় আলেম ও বিভিন্ন ইসলামি সংগঠনের নেতাকর্মীরা। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কওমি মাদ্রাসা, তাবলিগ ও দ্বীন রক্ষার লক্ষ্যে ওলামা মাশায়েখ বাংলাদেশের ব্যানারে আয়োজিত মহাসমাবেশ থেকে এসব দাবি উপস্থাপন করেন শায়খুল হাদিস পরিষদের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও বেফাকুল মাদারিসিল অ্যারাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হক।
বাকি দাবিগুলো হলো মাওলানা সাদকে বাংলাদেশে আসতে নিষেধাজ্ঞা জারি, কাকরাইল মসজিদে সাদপন্থিদের কার্যক্রম বন্ধ করা, কওমি শিক্ষাকে দারুল উলুম দেওবন্দের আওতায় পরিচালনা, তাবলিগ নিয়ে ‘বিচ্ছিন্ন মহলের সব ষড়যন্ত্র’ বন্ধ করা, আলেমদের বিরুদ্ধে বিগত সরকারের করা সব মামলা প্রত্যাহার, শাপলা চত্বরের গণহত্যায় জড়িত আসামিদের দেশে এনে শাস্তি নিশ্চিত করা, সারা দেশে মিথ্যা অভিযোগে করা সব মামলা প্রত্যাহার এবং ২০১৮ সালে টঙ্গী ময়দানে সাদপন্থিদের আক্রমণের বিচার করা।
গতকালের এই মহাসমাবেশ ঘিরে সকাল থেকেই ওলামা মাশায়েখদের ভিড় বাড়তে থাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। এরপর উদ্যানের আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেন মাওলানা জুবায়েরুল হাসানের অনুসারীরা। সকাল ১০টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকা, শাহবাগ মোড় থেকে মৎস্য ভবন পর্যন্ত সড়ক ও শাহবাগ মোড় থেকে টিএসসি হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দোয়েল চত্বর পর্যন্ত সড়কে তাবলিগ জামায়াতের বিপুলসংখ্যক অনুসারীর অবস্থান দেখা যায়। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বেলা পৌনে ১১টার দিকেও তাবলিগের অনুসারীদের মহাসমাবেশে আসতে দেখা গেছে।
মহাসমাবেশের পুরো সময়েই সাদপন্থিদের সমালোচনায় মুখর ছিলেন বক্তারা। এ সময় এক ইজতেমা ও এক কাকরাইলের দাবি জানান তারা। মাওলানা জুবায়ের ও মাওলানা সাদপন্থিরা বিভেদে জড়ানোর একপর্যায়ে ২০১৯ সালে দুপক্ষ বিশ্ব ইজতেমা দুবারে করার সিদ্ধান্ত নেয়। সেভাবেই দুই পর্বে হচ্ছে বিশ্ব ইজতেমা। তবে দুপক্ষেরই চলতি সপ্তাহের শুরুতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পাল্টাপাল্টি সমাবেশের ঘোষণায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে সরকারের ‘মধ্যস্থতায়’ সাদপন্থিরা কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন।
সমাবেশে বেফাক মহাসচিব মাহফুজুল হক বলেন, ‘মাওলানা সাদের অনুসারীরা আসন্ন বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সহিংসতা করার ষড়যন্ত্র করছে। ছাত্র-জনতাকে সঙ্গে নিয়ে আলেম-ওলামারা সাদপন্থিদের ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে দিতে প্রস্তুত আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সাদপন্থিরা নবী করিম (সা.)-সহ সাহাবিদের সমালোচনা করে আসছে। সাদ তাবলিগের নীতিমালা উপেক্ষা করেছেন। তাই সাদ সাহেবকে দেশে আসতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। কোনো অবস্থাতেই তাকে দেশে আসতে দেওয়া হবে না।’
আলেমদের ঘোষিত তারিখেই বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে জানিয়ে মাহফুজুল হক বলেন, ‘আগামী বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব হবে ২৭-২৮-২৯ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় পর্ব ৭-৮-৯ ফেব্রুয়ারি হবে। এ বিষয়ে সরকারের সার্বিক সহযোগিতা কামনা করছি।’
কাকরাইল মসজিদে সাদপন্থিদের কার্যক্রম বন্ধের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কাকরাইলে আজ থেকে শুধু শূরায়ি নেজামে পরিচালিত হবে।’ এ ছাড়া তিনি কাদিয়ানিদের অবিলম্বে অমুসলিম ঘোষণার দাবি জানান।
সাদপন্থিরা বিশ্ব ইজতেমায় অংশ নিতে পারবে না জানিয়ে মাহফুজুল হক বলেন, ‘এবারও দুই পর্বে ইজতেমা হবে। কিন্তু সাদপন্থিরা তাতে অংশ নিতে পারবেন না। এমনকি মাওলানা সাদকে বাংলাদেশে আসতে দেওয়া হবে না।’
বাংলাদেশ নেজামে ইসলামের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক বলেন, ‘আসন্ন বিশ্ব ইজতেমা ঘিরেও সাদপন্থিদের ষড়যন্ত্র চলছে। বিশ্ব ইজতেমাকে কেন্দ্র করে স্বঘোষিত আমির সাদ ও তার অনুসারীরা বিশৃঙ্খলা করার পরিকল্পনা নিয়েছে। আমরা কোনোভাবেই সেটি হতে দেব না। তাদের সমস্ত ষড়যন্ত্র যেকোনো মূল্যে আমরা ব্যর্থ করে দেব। বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে আজকের সম্মেলন থেকে ওলামায় কেরামের পক্ষ থেকে যে ঘোষণা দেওয়া হবে, সরকারকে সেই নির্দেশনা মানতে হবে। এর বাইরে কারও সিদ্ধান্ত তৌহিদী জনতা মানবে না।’
হেফাজতে ইসলামী বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব জুনায়েদ আল হাবিব বলেন, ‘আমরা ১৫ বছর ধরে ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এ সরকারকে বসিয়েছি। কেউ যদি রক্তচক্ষু দেখায়, তবে আমরা তাদের চক্ষু উপড়ে ফেলব। জাতির পথপ্রদর্শক হবেন আলেমরা। তাবলিগের রাহবারও আলেমদের থেকেই হবে, অন্য কেউ নয়।’