প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে দেশের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করার অংশ হিসেবে ২০০৩ সালে কুষ্টিয়া শহরে প্রতিষ্ঠিত হয় কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি)। এখান থেকে প্রশিক্ষিত দক্ষ জনবল দেশের আর্থিক খাতে রেমিট্যান্স সংযোজনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছেন। তবে এমন যুগান্তকারী সফলতা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আছে অনিয়ম-দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ। সেখানে প্রশিক্ষণ নেওয়া জনগোষ্ঠীর অভিযোগ, লোক দেখানো লটারিতে উত্তীর্ণের নামে প্রশিক্ষণার্থীদের ভর্তি প্রক্রিয়া থেকে শুরু করে একেবারে প্রশিক্ষণের শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য সরকারি বরাদ্দের টাকাসহ বিভিন্ন খাত দেখিয়ে বিনা রসিদে আদায় করা হয় হাজার হাজার টাকা। সব মিলিয়ে বছরে প্রায় অর্ধলক্ষ প্রশিক্ষণার্থীর থেকে মোট আদায় হয় ৯ কোটি টাকার বেশি; যার পুরোটাই অবৈধভাবে আত্মসাৎ করেন প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও তার সহযোগীরা। অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করে প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. মিজানুর রহমান দাবি করেছেন, একটি চক্র কোনো অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে বানোয়াট ও মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে।
টিটিসি সূত্রে জানা যায়, ‘প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত কুষ্টিয়া কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বর্তমানে ৬টি ট্রেডে বিভিন্ন মেয়াদ ও দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু রয়েছে। এসব প্রশিক্ষণের লক্ষ্য বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, দক্ষতা উন্নয়ন ও অভিবাসী কর্মীদের অধিকতর কল্যাণ ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণে দক্ষ জনবল সৃষ্টি করা। এ লক্ষ্যে প্রতি বছর এই প্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার অপারেশন নিয়মিত ও স্বনির্ভর, মোটর ড্রাইভিং, গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং, স্পোকেন ইংলিশ, কোরিয়ান ও জাপানি ভাষা, মিডলেভেল ম্যানেজমেন্ট, সুইং মেশিন অপারেটর, ইলেক্ট্রিক্যাল ইনস্টলেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স, মেশিনারি হাউজকিপিং প্রি-ডিপার্সার ওরিয়েন্টেশনসহ প্রায় ২০টিরও অধিক বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। টিটিসির একটি বার্ষিক পরিসংখ্যান সূত্রে জানা যায়, অ্যাসেট প্রকল্পের অধীন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এসব বিষয়ভিত্তিক কোর্সে প্রতি বছর এখান থেকে ৪৪ হজার ১৯৫ জন প্রশিক্ষণার্থী ভর্তি হয়ে থাকেন।
কুষ্টিয়া মজমপুর জিলা স্কুলের সামনের এক বাসিন্দা সিনথিয়া আখতার টিটিসিতে ১৩ম ব্যাচে ড্রাইভিং কোর্সে ভর্তি হয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, ‘সীমাহীন অনিয়ম আর দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে টিটিসি। সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ভর্তিসহ ৪ মাসের কোর্স শেষে সাকুল্যে প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার টাকা আমাদের বৃত্তি দেওয়া ছাড়াও সরকারি খরচেই বিআরটিএ থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স করে দেওয়ার কথা। অথচ এসব খাত দেখিয়ে আমাদের কাছ থেকে প্রিন্সিপ্যাল সারের নির্দেশে টাকা আদায় করেছেন ভারপ্রাপ্ত ভাইস প্রিন্সিপ্যাল সোহেল রানা স্যার। এখান থেকে এসব অনিয়ম-দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা বন্ধ না হলে প্রশিক্ষণার্থীদের দুর্ভোগ থেকেই যাবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে টাকা উত্তোলনকারী একজন দালাল জানান, প্রতি বার ভর্তির সময় সেই ব্যাচে মোট যত জনকে ভর্তি নেবে তাদের মধ্যে দু-একজন বাদে সবাইকে নির্ধারিত দুই হাজার টাকা দিয়েই নাম তালিকায় আসার জন্য কনফার্ম করতে হয়। তবেই কেবল লটারিতে তাদের পাস করিয়ে দেবে, সে যেকোনো মূল্যেই হোক। এখন সিদ্ধান্ত আপনার। ওই প্রক্রিয়ায় পাস নেবেন নাকি নিজেরাই চেষ্টা করবেন।
কুষ্টিয়া টিটিসির আরএসি বিভাগের সিনিয়র ইন্সট্রাক্টর মু. ছাখাওয়াৎ উল্লাহ বিশ্বাস বলেন, বর্তমানে এখানে ৬টি ট্রেডে বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। শিক্ষার্থীরা এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা সেক্টরে কাজ করছেন। এই কাজটি কেবলমাত্র সম্ভব হয়ে ওঠে নিয়মশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে এর কার্যক্রম পরিচালিত হলে।
অভিযোগ আছে, প্রতিষ্ঠানপ্রধান অধ্যক্ষ মো. মিজানুর রহমান মাসের অধিকাংশ দিনই থাকেন ঢাকায়। মাঝেমধ্যে এসে একবারে স্বাক্ষর করেন খাতায়। এমন অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে প্রতিবেদক সেখানকার সিসি ক্যামেরার এক সপ্তাহের ফুটেজে অধ্যক্ষের উপস্থিতির প্রমাণ দেখাতে অনুরোধ করলে সেটা দেখাতে ব্যর্থ হন (ভারপ্রাপ্ত ভাইস প্রিন্সিপ্যালের দায়িত্ব পালনকারী) সিনিয়র ইন্সট্রাক্টর (অটোমোটিভ) সোহেল রানা। তিনি বলেন, এখানে প্রশিক্ষণার্থী ভর্তি প্রক্রিয়াসহ যা কিছু হচ্ছে তা নিয়ম মেনেই হচ্ছে, নিয়মের বাইরে কোনো অবৈধ কাজের সুযোগ নেই।’
অভিযোগ বিষয়ে জানতে চাইলে অধ্যক্ষ মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘একটি চক্র উদ্দেশ্যমূলকভাবে অসত্য বানোয়াট তথ্য ছড়িয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করছে। নিয়ম বা বিধির বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই সরকারি প্রতিষ্ঠানে।
তবে অনিয়ম ও প্রশিক্ষণার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায়সহ সরকারি বরাদ্দকৃত ভাতার টাকা আত্মসাৎ সংক্রান্ত বিষয়ে একজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথোপকথনের একটি ভিডিওতে অধ্যক্ষকে বলতে শোনা যায়, ‘তোমার এখানে লার্নার করতে এক হাজার টাকা লাগবে, দিবা। এই টাকা সরকার দেবে। এরপর আবার যখন ড্রাইভিং লাইসেন্স করবা তখনো তোমাকে টাকা দেওয়া লাগবে। এইটা তো সরকার নির্ধারণ করে দিয়েছে ২ হাজার টাকা দিতে হবে। এসব হিসাব করতে আসলে হবে?’
কথোপকথনের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, (ধমক দিয়ে) এখানে দুই নাম্বারি করার কোনো সুযোগ আছে? টাকার হিসাব করলে হবে? তোমারে যে সুযোগ দিয়েছি এমন সুযোগ আছে? এখানে লটারি হয়েছে, সেখানে একজন দুজন মেয়ে চান্স পেয়েছে, আমি মেয়েদের এত বেশি চান্স দিলাম কেন? আমার যা হয় হোক তোমাদের একটা সুযোগ দিয়েছি যাতে তোমাদের লস না হয়। এই ২ হাজার টাকা দিয়ে তোমরা ভর্তি হবা, এরপর তোমাদের উপরে আর চাপ দেব না, লটারির নিয়মে ফেলিনি, তোমাদের তো আমি ভাগ্যের বাইরে নিয়েছি।’
তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনে আমি ডিসি স্যারের সঙ্গে কথা বলব, তোমাদের জন্য। রিস্ক তো আমি মাথায় নিয়েছি। তোমরা কেন এত টাকার চিন্তা করো? টাকা ইনকাম করবা না জীবনে?’