বন্যা ও বৃষ্টির পানির চাপে ধসে পড়েছে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মুছাপুর সøুইসগেট (রেগুলেটর)। বন্যার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে না পারার আগেই মুছাপুর রেগুলেটর ভেঙে পড়ার প্রভাবে ছোট ফেনী নদী, সিলোনিয়া ও কালিদাস পাহালিয়া নদীতে পানির গতিবেগে একে একে বিলীন হচ্ছে নদীর তীরবর্তী ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি। ছোট ফেনী এবং সিলোনিয়া নদীর তীরবর্তী ১৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া বিলীন হয়েছে ৪১ হাজার হেক্টর কৃষিজমি। হুমকিতে ৩০ হাজার হেক্টর জমির চাষাবাদ। ভাঙনের মুখে রয়েছে বাড়িঘর, বাজার, মসজিদ, শ্মশানসহ এলাকার প্রধান সড়ক। আগামী বর্ষার আগে ভাঙন রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ১০ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের অনুসারীরা ছোট ফেনী নদীর কোম্পানীগঞ্জের দুই অংশে বালু উত্তোলন করায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ছোট ফেনী নদীর কোম্পানীগঞ্জের দুই অংশে বালু উত্তোলন করা হতো। ছোটধলি এলাকায় বালু উত্তোলনে নেতৃত্ব দিতেন সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ভাই শাহাদাত হোসেন ও মুছাপুরের আহসান উল্লাহ ভুট্টো মেম্বার। তাদের বালু কুমিল্লা পর্যন্ত যেত। অন্য অংশে বালু উত্তোলন করতেন জালাল উদ্দিন। তিনি মুছাপুর এলাকাও নিয়ন্ত্রণ করতেন। এই দুই অংশেই শেল্টার দিতেন মুছাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী এবং ওবায়দুল কাদেরের আরেক ভাই কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বসুরহাট পৌরসভার মেয়র আবদুল কাদের মির্জা। ফেনীর সোনাগাজী অংশে বালু উত্তোলন করতেন যুবলীগ নেতা সেন্টু ও জামশেদ আলম। ভাগ নিয়ে শেল্টার দিতেন সাবেক এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী, সাবেক উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রুহুল আমিন (বর্তমানে নুসরাত হত্যা মামলায় কারাগারে), আমিরাবাদ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিরন, চরদরবেশ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ভুট্টো ও চরচান্দিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন মিলন।
নদীভাঙনের কবলে পড়েছেন চরদরবেশ ইউনিয়নের দক্ষিণ চর সাহাভিকারী এলাকার আকলিমা আক্তার। ভাঙনে বসতভিটা ছেড়ে রাস্তার পাশে আশ্রয় নিয়েছেন তিনি। ছেলেসন্তান ও অসুস্থ শ্বশুর-শাশুড়ি নিয়ে নিদারুণ কষ্টে দিন কাটছে তার। নদীর দিকে চেয়ে চোখের পানি ফেলা ছাড়া আর উপায় নেই তার। তিনি বলেন, এ এলাকায় নদীভাঙনে গত দুই মাসে অন্তত ৫০-৬০টি বসতি বিলীন হয়ে বাস্তুহারা হয়েছে শতাধিক পরিবার। নদীভাঙনের শিকার হয়ে যাযাবরের মতো জীবনযাপন করছেন তারা।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ফেনী জেলা সভাপতি ও দৈনিক ফেনীর সময় সম্পাদক মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন বলেন, মুছাপুর রেগুলেটরটি ভাঙার অন্যতম দুটি কারণ প্রায় ১৫ বছর ধরে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা রেগুলেটরের ৫০ থেকে ১০০ মিটার দূরত্বে বালু তুলে শত শত কোটি টাকার বালু ব্যবসা করেছেন। ফলে এই রেগুলেটরের ভিত্তি দুর্বল হয়েছে এবং ভাঙার মতো এই ভয়ানক পরিণতি বরণ করতে হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড নোয়াখালীর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হালিম সালেহী বলেন, মুছাপুর রেগুলেটর ভেঙে যাওয়ার পর থেকে নদীভাঙনের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। উজান থেকে ধেয়ে আসা পানি ও অতি বৃষ্টির চাপ নিতে না পারার কারণে সøইসগেটটি ভেঙে গেছে। নতুন করে মুছাপুর রেগুলেটর এবং ক্লোজার না করা পর্যন্ত ভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধান হবে না।
পানি উন্নয়ন বোর্ড ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ শাহরিয়ার বলেন, আগামী বর্ষা পর্যন্ত এটি তৈরি করার সম্ভাবনা নেই। ততদিন কার্যক্রম থামিয়ে না রেখে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধের চেষ্টা করা হবে।