রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখে আবারও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। জাতীয়তাবাদী রাজনীতির জন্য পরিচিতি পাওয়া ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউজে ফেরায় তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও পররাষ্ট্রনীতি কী হতে পারে, সে নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলছে বিস্তর। এর পাশাপাশি বিশ^ জুড়ে চলমান যুদ্ধ-সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে কি না, সেটি নিয়েও কৌতূহল তাই বাড়ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বন্ধের ক্ষেত্রে তিনি কী পদক্ষেপ নেবেন, তা নিয়ে আশা-নিরাশার দোলাচলে আছেন যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিন ও লেবাননের বাসিন্দারা। এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে এ বিষয়গুলো তুলে ধরেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।
নির্বাচনী প্রচারে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বলেছিলেন, তিনি জিতলে গাজায় ইসরায়েল-হামাস এবং লেবাননে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধ বন্ধ করবেন। তবে কোন উপায়ে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত বন্ধ করবেন, সে বিষয়ে কোনো কিছু বলেননি তিনি। প্রথম মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনের সময় ট্রাম্পের কট্টর ইসরায়েলপন্থি নীতি বিবেচনায় নিলে শঙ্কার জায়গাও রয়েছে। তিনি জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং তেল আবিব থেকে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তরিত করেন।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে খুব একটা পরিবর্তন হবে না। তবে নির্বাচনী প্রচারে প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় যুদ্ধ বন্ধে ট্রাম্প তাই কী পদক্ষেপ নেবেন, সেটিই এখন মুখ্য বিষয়। অতীতে ট্রাম্প অনেকবার দাবি করেছেন বাইডেনের পরিবর্তে তিনি ক্ষমতায় থাকতেন, তবে ইরানের ওপর তার সর্বোচ্চ চাপের কারণে হামাস ইসরায়েলে হামলাই চালাত না। সার্বিকভাবে ইরান বিষয়েও ট্রাম্প সম্ভবত তার পুরনো কৌশলই অবলম্বন করবেন। ইরানের বিরুদ্ধে বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং ইরান পরমাণু চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে দূরে রাখার পথে হাঁটবেন তিনি।
ট্রাম্পকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ভালো বন্ধু বলে অভিহিত করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাদের মধ্য এ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ট্রাম্পের মধ্যপ্রাচ্য নীতিতে কেমন প্রভাব ফেলবে সেটিও কৌতূহলের সৃষ্টি করেছে। সমালোচকদের আশঙ্কা, মধ্যপ্রাচ্যের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি আরও উসকে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে ২০২০ সালের শেষে দিকে আব্রাহাম চুক্তিকে সামনে নিয়ে এসেছেন সমালোচকরা। আরব ও মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে ট্রাম্পের উদ্যোগে এ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এ চুক্তিতেও ফিলিস্তিনিদের দাবিকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে গেছেন ট্রাম্প। তবে ট্রাম্প যদি যুদ্ধ বন্ধে নেতানিয়াহুর ওপর চাপ সৃষ্টি কিংবা সামরিক সহায়তা পুনর্বিবেচনা করেন, তাহলে সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে এক বছর ধরে চলা গাজা যুদ্ধে নিহতদের প্রায় ৭০ শতাংশই নারী ও শিশু। গতকাল জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয় এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। সংস্থাটি হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রথম সাত মাসের মৃতের সংখ্যার হিসাব গণনা ও যাচাই-বাছাইয়ের পর এ বিবৃতি দিয়েছে। ফিলিস্তিন কর্র্তৃপক্ষ জানিয়েছে, হামাসের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর পর থেকে ৪৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এ সাত মাস সময়ে মানবাধিকার কার্যালয় ৮ হাজার ১১৯টি মৃতদেহ যাচাই করেছে, যাদের ৭০ শতাংশই নারী ও শিশু। এর আগে ফিলিস্তিন কর্র্তৃপক্ষও দাবি করেছিল যুদ্ধে নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগই নারী ও শিশু। ৩২ পাতার প্রতিবেদনে এ হত্যাযজ্ঞকে আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মৌলিক নীতির ধারাবাহিক লঙ্ঘন বলে নিন্দা করেছে জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালায়। তবে ইসরায়েল জাতিসংঘের প্রতিবেদনের বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি। সেই সঙ্গে জাতিসংঘের ত্রাণ ও কর্মসংস্থান সংস্থা জানিয়েছে, ইসরায়েলের আগ্রাসনে গাজায় প্রতিদিন গড়ে ৬৭ জন শিশুর মৃত্যু হয়।