খাদ্যসংকটে হাতি লোকালয়ে হানা

চট্টগ্রামের আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার দেয়াঙ পাহাড়ের আশপাশের এলাকায় খাবারের সন্ধানে প্রতিনিয়ত হানা দিচ্ছে বন্যহাতি। সংরক্ষিত বন উজাড় ও দখল, বন্যহাতির অভয়ারণ্য ও জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে ফেলায় আবাসস্থল হারিয়ে অনেকটাই ছন্নছাড়া হাতির দল। খাদ্যসংকটে পড়ে প্রতিনিয়ত লোকালয়ে হানা দিচ্ছে তারা। এতে নষ্ট হচ্ছে ফসল-ঘরবাড়ি, প্রাণ হারাচ্ছে মানুষ। দুই উপজেলার অন্তত ১৫ গ্রামে কয়েক বছর ধরে হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব বাড়ছে। এসব হাতির দলকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আনোয়ারা ও কর্ণফুলী উপজেলার দেয়াঙ পাহাড়ের আশপাশের এলাকায় ২০১৮ সালের জুলাই থেকে এ পর্যন্ত ৬ বছরে হাতির আক্রমণে ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন শতাধিক নারী-পুরুষ। সর্বশেষ গত এক মাসের ব্যবধানে হাতির আক্রমণে ৩ জন মারা গেছেন। তার মধ্যে গত ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে উপজেলার বৈরাগ ইউনিয়নের কৃষক মো. দুলাল (৬০), গৃহবধূ রেহেনা আক্তার (৩৮) ও গত ২১ অক্টোবর রাতে বটতলী আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা হালিমা খাতুন (৫৫) হাতির আক্রমণে নিহত হন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, মানুষ ও হাতিকে রক্ষা করা যাদের দায়িত্ব, সেই বন বিভাগের স্থায়ী কোনো সমাধানের উদ্যোগ নেই। এত ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির পরও বন বিভাগ স্থায়ী কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। বন বিভাগ লোক দেখানো ক্ষতিপূরণ দিয়েই দায় সারছে। হাতি সরানোর উদ্যোগ নিচ্ছে না কেউ। বরং ভাঙচুর ও ক্ষতি হলে পরামর্শ হিসেবে জিডি করতে বলা হয় ক্ষতিগ্রস্তদের। এ নিয়েও পোহাতে হয় নানা ভোগান্তি।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, বন্যহাতির তা-বে ঘরবাড়ি ভাঙচুর ও ফসলের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে এ পর্যন্ত আনোয়ারা ও কর্ণফুলী থানায় হাতির বিরুদ্ধে শতাধিক জিডি হয়েছে।

বন বিভাগ ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নব্বই দশকের দিকে চট্টগ্রাম দক্ষিণের পাহাড় থেকে দুয়েকটি বন্যহাতি দলছুট হয়ে দেয়াঙ পাহাড়ে আসা-যাওয়া করত। তখন খাবারের অভাব ছিল না। পরে বন পরিষ্কারের মাধ্যমে দেয়াঙ পাহাড়ে আশ্রয়ণ প্রকল্প ও কোরিয়ান ইপিজেড প্রতিষ্ঠা হয়েছে। গড়ে উঠেছে বসতিও। বনের জমি দখল হওয়ায় সংকুচিত হয়ে পড়েছে হাতির আবাসস্থল। ২০২০ সালের দিকে এই পাহাড়ে থেকে গেছে চারটি বন্যহাতি দল। তখন থেকেই হাতি ও মানুষের দ্বন্দ্ব বাড়ছে। বর্তমানে চারটি হাতির দল ধান ও ফলের মৌসুমে খাদ্যের সন্ধানে লোকালয়ে হানা দেয়। এতে নির্ঘুম রাত কাটে এলাকার মানুষের। কোরিয়ান ইপিজেডে কর্মরত ৩০ হাজার শ্রমিকও রয়েছেন আতঙ্কে।

জলদি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের কর্মকর্তা আনিসুজ্জামান শেখ বলেন, দেয়াঙ পাহাড়ে চারটি বন্যহাতির দলের অবস্থান। খাবার ও পানির খোঁজে তারা পাহাড়ের আশপাশে বিচরণ করে। লোকালয় কাছাকাছি হওয়ায় এবং অনেক সময় মানুষ নানাভাবে তাদের উত্ত্যক্ত করায় তারা ভয় পেয়ে আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।

দেয়াঙ পরগনার ইতিহাস লেখক ও গবেষক জামাল উদ্দিন বলেন, ‘হাজার বছরের ইতিহাসে দেয়াঙ পাহাড়ে কখনো হাতির অস্তিত্ব ছিল না। প্রাচীন তথ্য-উপাত্তে কোথাও খুঁজে পাইনি যে দেয়াঙ পাহাড়ে হাতি ছিল। সাগর-নদী বেষ্টিত এ অঞ্চলের পাহাড়ের সঙ্গে আর কোনো পাহাড়ি অঞ্চলের সংযোগ নেই। তাই দেয়াঙ পাহাড়ে হাতির বিচরণ থাকার কথাও নয়। কিন্তু হঠাৎ খাদ্যসংকটে পড়ে বন থেকে এখানে হাতির দল ছুটে এসে মানুষের ক্ষতি করে চলছে।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশ বিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ড. আবুল হাসনাত মো. রায়হান সরকার বলেন, ‘চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে হাতির আবাসের ক্ষতি করছে মানুষ। ফলে প্রাণীগুলো এখন চট্টগ্রামের বাঁশখালী, আনোয়ারা, কর্ণফুলী, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া এমন কি পাহাড়ি পথ ধরে পটিয়া ও বোয়ালখালী উপজেলা পর্যন্ত চলে আসতে বাধ্য হচ্ছে।’ 

তিনি আরও বলেন, ‘বন্যহাতির লোকালয়ে আসার প্রবণতা কমানোর জন্য হাতির খাদ্য উপযোগী গাছ লাগানো, কৃত্রিম জলাধার তৈরি, হাতির চলার করিডোর সৃষ্টি ও হাতির অভয়ারণ্যের গাছ কাটা থেকে বিরত

থাকতে হবে।’ চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ফরিদা খানম বলেন, হাতি-মানুষের দ্বন্দ্ব নিরসনে সম্ভাব্য করণীয় নির্ধারণে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করা হয়েছে। এ কমিটির সদস্যরা সম্প্রতি ওই এলাকা পরিদর্শন ও স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। সে অনুসারে শিগগিরই কিছু কর্মপরিকল্পনা হাতে নেওয়া হবে।