অবৈধ অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাড়িয়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী রিপাবলিকান নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প। দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের আগেই গত বৃহস্পতিবার দেশটির সংবাদমাধ্যম এনবিসি নিউজের সঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেন। ভোটের আগেই অবৈধ অভিবাসীদের দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে একাধিকবার কথা বলেছেন ট্রাম্প। বলা যায়, এটি ছিল তার অন্যতম নির্বাচনী
ইশতেহার। তাই তিনি ক্ষমতা গ্রহণের পর অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে যে কঠোর পদক্ষেপ নেবেন তা অনুমেয়ই ছিল। এদিকে ট্রাম্পের এমন হুঁশিয়ারিতে দেশটিতে বসবাসকারী বিপুল সংখ্যক অবৈধ অভিবাসী আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, ট্রাম্পের নীতির ফলে গ্রিনকার্ডের অপেক্ষায় থাকা মার্কিন অভিবাসীদের সন্তানরাও আগামী দিনে জন্মসূত্রে আমেরিকার নাগরিক হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন।
এনবিসিকে ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে যাদের থাকার বৈধ অনুমতি নেই এমন মানুষকে তাড়ানো ছাড়া তার প্রশাসনের কোনো বিকল্প নেই। তিনি বলেন, ‘আমাদের সত্যিই কোনো বিকল্প নেই।’ ট্রাম্পের এমন বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রে অবৈধভাবে বসবাসকারী অভিবাসীরা আতঙ্কে রয়েছেন। অনেকে স্থানীয় আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন বলেও জানা গেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে বলেছে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিজয়ের পর গত বৃহস্পতিবার মেক্সিকো সীমান্তে অভিবাসীর সংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর উদ্দেশ্যে মেক্সিকো দিয়ে ভ্রমণকারী হাজার হাজার অভিবাসীর সংখ্যা বৃহস্পতিবার প্রায় আশ্চর্যজনকভাবে অর্ধেক কমে গিয়েছিল। ট্রাম্পের বিজয়ের খবরে অনেক অভিবাসীই এই দেশে তাদের সম্ভাবনা নিয়ে সন্দিহান।
মেক্সিকোর ন্যাশনাল মাইগ্রেশন ইনস্টিটিউটের একজন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার দক্ষিণাঞ্চলীয় তাপাচুলা শহর থেকে যাত্রা শুরু করার সময় ওই কাফেলায় ১৬০০ জনেরও কম অভিবাসী ছিলেন, যেখানে ৩ হাজার অভিবাসী থাকতে দেখা যায়।
কর্মকর্তারা বলেছেন, তাদের মধ্যে শতাধিক মানুষ তাপাচুলায় ফিরে যেতে কর্র্তৃপক্ষের কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন। তবে কাফেলা ছেড়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাকি অভিবাসীরা কোথায় যাচ্ছেন তা স্পষ্ট নয়।
ট্রাম্প জিতেছেন এই কথা শোনার পর ক্যারাভানের অনেকেরই যুক্তরাষ্ট্রে তাদের নতুন জীবনের সুযোগ নিয়ে আশা ক্ষীণ হয়ে যায়।
চিয়াপাস থেকে দক্ষিণ মেক্সিকোর ওক্সাকাতে ভ্রমণ করার সময় ভেনিজুয়েলার অভিবাসী ভ্যালেরি আন্দ্রাড রয়টার্সকে বলেছেন, আমি আশা করেছিলাম কমলা হ্যারিস জিতবেন। তবে তা হয়নি।
চিয়াপাস রাজ্যের নিরাপত্তা বিষয়ক একজন মুখপাত্র রয়টার্সকে বলেছেন, অভিবাসীদের কাফেলাটি উত্তরের দিকে চলে যেতে দেখা যায়। এ সময় কিছু পরিবার গুয়াতেমালা সীমান্তের কাছে তাপাচুলায় ফিরে যাওয়ার চেষ্টা করে। তবে অনেকেই যুক্তরাষ্ট্রের দিকে যাত্রা অব্যাহত রাখেন।
নিরাপত্তার শঙ্কায় নামের শুধু প্রথম অংশ প্রকাশ করে ভেনিজুয়েলার অভিবাসী জেইলিমার বলেছেন, মার্কিন কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রটেকশন অ্যাপ সিবিপি ওয়ানের মাধ্যমে আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছিলেন তিনি। সেই অ্যাপয়েন্টমেন্টটি জানুয়ারিতে ট্রাম্পের দায়িত্ব নেওয়ার আগেই আসবে বলে আশাবাদী জেইলিমার।
মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, অভিবাসীরা যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ সীমান্তের দিকে যেতে থাকবেন। চিয়াপাসের একজন ক্যাথলিক ধর্মযাজক ও প্রো-রিফিউজি কর্মী হেইম্যান ভাজকুয়েজ বলেছেন, ‘মানুষ নতুন পথ খুঁজবে যা আরও বিপজ্জনক হবে। তবে এটি তাদের থামাতে পারবে না।’
এদিকে ট্রাম্পের রানিংমেট জে ডি ভ্যান্সের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর ১০ লাখ অভিবাসীকে বের করে দেওয়া হতে পারে। কিন্তু কাজটা যে ততটা সহজ নয়, তা ট্রাম্পের আগের আমলেও দেখা গেছে। কারণ সে সময় তাকে অবৈধ অভিবাসীদের নিয়ন্ত্রণ করতে বেশ হিমশিম খেতে হয়। ধারণা করা হচ্ছে, এবার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে রিপাবলিকান পার্টির নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সামরিক বাহিনী থেকে শুরু করে বিদেশি কূটনীতিক পর্যন্ত সবাইকে ডেকে অবৈধ অভিবাসীদের বের করে দেওয়ার বিষয়টি বাস্তবায়ন করতে বলতে পারেন। এ কাজে রিপাবলিকান নেতৃত্বাধীন অঙ্গরাজ্যগুলোর নেতাদের সহযোগিতা নিতে পারেন। এমনকি যেসব রাজ্যে আইনি বিধিনিষেধ আছে, সেখানকার তহবিল বন্ধ করে দেওয়ার মতো পদক্ষেপও নিতে পারেন।
তবে অভিবাসী নিয়ে কাজ করা আইনজীবীরা বলছেন, ট্রাম্পের অভিবাসী বিতাড়নের চেষ্টা ব্যয়বহুল, বিভাজন সৃষ্টিকারী ও অমানবিক হয়ে উঠতে পারে। এতে অনেক পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়বে। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ কয়েকজন বলছেন, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের তুলনায় এবারে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরকে আরও আগ্রাসী ভূমিকায় দেখা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে মূল সমস্যা হচ্ছে, অন্য দেশ বিতাড়িত অভিবাসী গ্রহণ করবে কি না।
এদিকে ট্রাম্পের নীতির ফলে গ্রিনকার্ডের অপেক্ষায় থাকা মার্কিন অভিবাসীদের সন্তানরাও আগামী দিনে জন্মসূত্রে আমেরিকার নাগরিক হওয়ার সুযোগ পাবেন না। রিপাবলিকান প্রার্থীদের নির্বাচনী ওয়েবসাইটে লেখা রয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই এ বিষয়ক একটি নির্দেশিকায় স্বাক্ষর করবেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের নির্দেশিকায় যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পেতে বেঁধে দেওয়া হয়েছে কিছু কড়া শর্ত, যেগুলোর প্রথম ধাপেই বাদ পড়বেন অবৈধ অভিবাসীরা।
সেই নির্দেশিকায় বলা থাকবে, শুধু আমেরিকায় জন্মেছে বলেই কোনো শিশুকে আর নাগরিকত্ব দেওয়া হবে না। ওই সন্তানের মা-বাবার মধ্যে যেকোনো একজন যদি মার্কিন নাগরিক হয় তবে তাকে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। অথবা বাবা-মায়ের যদি গ্রিনকার্ড বা স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি থাকে তবে তাদের সন্তানরা আগামী দিনে আমেরিকার নাগরিকত্ব পাবে।