মৃতপ্রায় মৃৎশিল্প

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের কাশিয়াবালা পালপাড়ার বাসিন্দা সুশীল পাল (৫৫)। প্লাস্টিক ও সিরামিকের চাহিদার এই যুগে মাটির তৈজসপত্র টিকিয়ে রাখতে বাপ-দাদার  পেশায় ৩১ বছর ধরে লেগে আছেন তিনি। কিন্তু, তার ৪ পুত্র সন্তানের কেউই এ পেশায় নেই। চার পুত্রের কেউ পড়ালেখা করছেন আবার কেউবা আছেন চাকরির খোঁজে। উপজেলার পালপাড়াগুলোতে একসময় হাজারের অধিক মৃৎশিল্পী ছিলেন। কিন্তু মৃতপ্রায় এ পেশার মানুষের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র অর্ধশতকে। সুশীল পালের মতো এ পেশায় জড়িত মৃতশিল্পিরা জীবন যাত্রার মান উন্নয়নে পেশা বদল করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গ্রামাঞ্চলের ঘরে ঘরে আগে মাটির পাতিলে রান্না হতো। ঠা-া পানির আধার হিসেবে ঘরের কোনায় স্থান পেত মাটির কলস। পিঠা তৈরির তা, ফুলের টব, মাটির ব্যাংক, প্রদীপদানি, মোমদানি, মাটির তৈরি খেলনাসহ কোনোকিছুরই আর চাহিদা নেই। এসব জিনিসের জায়গা দখল করে নিয়েছে প্লাস্টিক, সিরামিক, অ্যালুমিনিয়ামের বাসন-কোসন। অন্যদিকে মাটির তৈরি জিনিসপত্র পোড়ানোর ব্যবহৃত কাঠ এখন ২০০-২৫০ টাকা মণ। প্রতি বস্তা কাঠের গুঁড়া ১২০-১৫০ টাকা। প্রধান উপাদান মাটির দামও অনেক চড়া। মাটির তৈরি পণ্য উৎপাদনের খরচসহ সবকিছুর দাম বাড়লেও, মাটির পণ্যের দাম বাড়েনি। উপরন্তু, চাহিদা কমেছে। ফলে, এ পেশা ছেড়ে দিয়েছেন অনেকে।

মৃৎশিল্পী লিপন পাল বলেন, ‘বংশ পরম্পরায় চলে আসা এ পেশা ছাড়ার কথা ভাবতেই খুব কষ্ট হয়। যদিও, আমাদের বর্তমান প্রজন্মের কাছে আর এমনটা মনে হয় না। মনে হবেই বা কেন? তারা তো এটা দেখেই বড় হয়েছে যে, এ পেশা লালন করে আমাদের নুন আনতে পানতা ফুরায়। বংশীয় পেশা টিকে রাখতে গিয়ে আমাদের জীবনধারণই কঠিন হয়ে পড়েছে।’

সুশীল পাল বলেন, ‘পহেলা বৈশাখে মাটির তৈরি বাসনসহ মাটির হাঁড়ি-পাতিলের প্রচুর চাহিদা ছিল। বর্তমানে ওয়ানটাইম প্লেট এসে সে স্থান দখল করে নিয়েছে। তাই এখন সারা বছর দইয়ের সরা, দইয়ের গ্লাস তৈরি করছি। শুধুমাত্র এক-দুই ধরনের পণ্য বিক্রি করে সংসার চালানো কঠিন। উৎপাদনের খরচসহ মাটির দাম বেড়ে যাওয়ায় মূলধন সংকটে আছি। প্রয়োজনীয় সরকারি পৃষ্টপোষকতাসহ বরাদ্দ পেলে বাপ-দাদার পেশা টিকিয়ে রাখা সম্ভব। তা না হলে মৃৎশিল্পীদের স্থান হবে ইতিহাসের পাতায়।’

এ প্রসঙ্গে শেরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আশিক খান বলেন, ‘মৃৎশিল্পীদের ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর, সমাজসেবা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া ও ঋণদান কর্মসূচিসহ নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। এই কর্মসূচি আরও বেগবান করার চেষ্টা করবে উপজেলা প্রশাসন।’