গাজীপুরে দিনভর শ্রমিক বিক্ষোভে ভোগান্তি চরমে

বকেয়া বেতনের দাবিতে গাজীপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছে শ্রমিকরা। গতকাল শনিবার সকাল থেকে অবরোধ করেন টিএন্ডজেড অ্যাপারেলস লিমিটেড নামের কারখানার শ্রমিকরা। এতে দিনভর  মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হওয়ায় শত শত কর্মজীবী মানুষ দুর্ভোগে পড়েন। গতকাল সন্ধ্যায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শ্রমিকরা মহাসড়ক অবরোধ করে রেখেছিলেন।

জানা যায় ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইলসহ উত্তরাঞ্চল থেকে আসা যাত্রী ও বিভিন্ন পরিবহন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে আটকে থাকে। এছাড়া ঢাকা থেকে যেসব যাত্রী ময়মনসিংহ ও উত্তরাঞ্চলে যাবেন তারাও পড়েন বিড়ম্বনায়। মহাসড়ক অবরোধের কারণে টঙ্গী থেকে কোনো যানবাহন গাজীপুরের দিকে যেতে পারেনি। অনেকে সড়কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করে ফিরে গেছেন।

গাজীপুর শিল্পপুলিশ ও শ্রমিকরা জানান, গাজীপুর মহানগরীর মালেকেরবাড়ি এলাকায় টিএনজেড অ্যাপারেলস লিমিটেড কারখানার কয়েক মাসের বকেয়া পাওনা রয়েছে। শ্রমিকরা তিন মাস ধরেই কারখানায় বেতন দাবি করলেও তারা দিই দিচ্ছি বলে কালক্ষেপণ করে। ২৮ অক্টোবর শ্রমিকরা আন্দোলন করলে শিল্পপুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা শ্রমিকদের বুঝিয়ে শান্ত করেন। সেই সময় পুলিশ জানায়, চলতি মাসের ৩ তারিখ তাদের বেতন পরিশোধ করা হবে। সেদিন শ্রমিকদের বেতন না দিয়ে কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপরও গত ৫ নভেম্বর ফের শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। পরে শিল্পপুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা বিষয়টি সমধান করার আশ্বাস দিলে তারা ফিরে যান। মাসের ৯ তারিখ হয়ে গেলেও শ্রমিকরা বেতন পাচ্ছেন না; এছাড়া কারখানা বেশ কিছুদিন ধরে বন্ধ রয়েছে। যার কারণে শনিবার সকালে আবারও তিন মাসের বকেয়া বেতনের দাবিতে সকাল থেকে বিক্ষোভ করেন শ্রমিকরা।

কারখানা শ্রমিক ইকবাল হোসেন বলেন, গত দুই মাস ধরে বেতন দিয়ে দিচ্ছি বললেও এখন পর্যন্ত বেতন ভাতা পাইনি। যার কারণে বাধ্য হয়েই রাস্তায় নামতে হয়েছে। রাবেয়া আক্তার নামে অপর শ্রমিক বলেন, গত এপ্রিল মাস থেকে কারখানা বন্ধ ছিল। সেপ্টেম্বর মাসে কারখানা খুললে দুই মাসের বেতন না দিয়ে কর্তৃপক্ষ টালবাহানা করছে। পুলিশ ও সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বারবার বেতন পরিষদের তারিখ দিলেও কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের বেতন দিচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে সড়ক অবরোধ করতে হয়েছে।

শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের বাসা ভাড়া, দোকানে বাকি, আর সন্তানদের স্কুলের বেতন দিতে পারছেন না। ঘরে খাবার নেই। দোকান থেকে বাকি দেওয়া হচ্ছে না। গত এক মাস ধরে বারবার সময় দিলেও কারখানা কর্তৃপক্ষ পাওনা বেতন পরিশোধ করছে না। শ্রমিকরা বলেন, সেনাবাহিনী ও পুলিশের কথায় আশ^াসে আমরা কয়েকবার আমাদের কর্মসূচি স্থগিত করেছি। কারখানা কর্তৃপক্ষ প্রশাসনের কথাও মানছে না। তাই আমাদের পাওনা বুঝে না পাওয়া পর্যন্ত আমরা মহাসড়ক ছাড়ব না।

এদিকে সকাল থেকে পোশাক শ্রমিকরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক অবরোধ করে রাখায় ঢাকার দিকে এবং ঢাকা থেকে কোনো যানবাহন এ মহাসড়ক ব্যবহার করতে পারেনি। অনেক যানবাহন কুড়িল ঢাকা-বাইপাস ব্যবহার করে কুড়িল হয়ে ঢাকায় গিয়েছে। আবার অনেক যানবাহন টঙ্গী ও বোর্ড বাজার দিয়ে ভোগড়া বাইপাস হয়ে যাতায়াত করেছে। এতে ওই সড়কগুলোতে অতিরিক্ত যানবাহন চলাচলের কারণে দিনভর যানজটের সৃষ্টি হয়। ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীসহ এলাকার সাধারণ মানুষ।

অন্যদিকে কারখানা খুলে দেওয়ার দাবিতে বোর্ড বাজারের এসএমএস ফ্যাশন ওয়্যার লিমিটেড ও কোনাবাড়ীর বিসিক শিল্পনগরী এলাকায় লাইফ ট্যাক্স লিমিটেড নামের কারখানার শ্রমিকরা ৩৫ দফা দাবিতে কর্মবিরতি পালন করেছেন।

অপরদিকে, বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়ার দাবি জানিয়ে গাজীপুর মহানগরের বোর্ড বাজারের এসএমএস ফ্যাশন ওয়্যার লিমিটেডের শ্রমিকরা কারখানার নিচে অবস্থান করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।

শ্রমিকরা জানান, কারখানা কর্তৃপক্ষ চলতি বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের বেতন পরিশোধ না করে গত ৬ নভেম্বর টিএন্ডজেড অ্যাপারেলস কারখানা সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেন। ৯ নভেম্বর কারখানা খুলে দেওয়ার কথা, কিন্তু কর্তৃপক্ষ শনিবারও কারখানা বন্ধ রেখেছে। বন্ধ কারখানা খুলে দেওয়ার দাবি ও বেতনের দাবিতে শ্রমিকরা কারখানার নিচে অবস্থান করেন।

গাজীপুর শিল্পাঞ্চলের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারোয়ার আলম বলেন, কারখানা মালিক কয়েকবার বেতন দেওয়ার কথা দিলেও বেতন দিচ্ছে না। আমাদের দিয়েও তারিখ দিয়েছেন তবু কথা রাখেননি। এখন শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে সমাধান করার চেষ্টা চলছে।