চুক্তি অনুযায়ী দাকোপ উপজেলায় মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল মাত্র ছয় মাসে। অথচ পাঁচ বছরেও কাজ শেষ হয়নি। এর মধ্যে কিছু কাজ এখনো শুরুই হয়নি। শুধু দাকোপ উপজেলাই নয়; খুলনায় ১১টির মধ্যে পাঁচটি মডেল মসজিদ ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণের চিত্র এ রকমই। অবশ্য বাস্তবায়নকারী সংস্থা গণপূর্তের ভাষ্য, জায়গা নিয়ে জটিলতা ও ঠিকাদারের গাফিলতিতে এ দুর্দশা তৈরি হয়েছে। তবে যেটির কাজ শুরু হয়নি, সেটি শিগগিরই শুরু হবে। এ ছাড়া চলমান কাজ দ্রুতই সমাপ্ত করা হবে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, দেশে পর্যাপ্ত মসজিদ থাকলেও একই স্থান থেকে বিভিন্ন ইসলামিক কার্যক্রম পরিচালনা করার মতো মডেল মসজিদ নেই। তাই এ ধরনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সামনে রেখে জেলা এবং উপজেলায় একটি করে ৫৬০টি মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র স্থাপন শীর্ষক প্রকল্প নেয় সরকার, যা ২০১৭ সালের মে থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদে বাস্তবায়নে অনুমোদিত হয়। এরই অংশ হিসেবে খুলনা আলিয়া মাদ্রাসা, বিভাগীয় কমিশনার অফিস, ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা, রূপসা, দিঘলিয়া, ফুলতলা, কয়রা, তেরখাদা, দাকোপ ও পাইকগাছা উপজেলায় ১১টি মডেল মসজিদ নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে এসব মসজিদ নির্মিত হচ্ছে তিনতলার। প্রতিটি মসজিদ নির্মাণে ব্যয় হচ্ছে ১৩ কোটি থেকে সাড়ে ১৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া জেলাপর্যায়ে আলিয়া মাদ্রাসা নির্মাণে ১৬ কোটি ৪৯ লাখ ৭৯ হাজার টাকা ও বিভাগীয় পর্যায়ে বিভাগীয় কমিশনার অফিসে মসজিদ নির্মাণে ১৫ কোটি ৬০ লাখ ৪৯ হাজার টাকা ব্যয় হচ্ছে।
প্রকল্প সূত্রে আরও জানা যায়, নির্মাণাধীন এসব মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে নারী এবং পুরুষদের পৃথক অজু ও নামাজ আদায়ের সুবিধা, লাইব্রেরি, গবেষণা এবং দ্বীনি দাওয়াত কার্যক্রম, পবিত্র কোরআন হেফজ, শিশুশিক্ষা, অতিথিশালা, বিদেশি পর্যটকদের আবাসন, মৃতদেহ গোসলের ব্যবস্থা, হজযাত্রীদের নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণ, ইমামদের প্রশিক্ষণ ইত্যাদি ব্যবস্থা থাকবে। ইমাম-মুয়াজ্জিনের আবাসনসহ সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অফিসের ব্যবস্থাও থাকবে। উপজেলা পর্যায়ে প্রতিটি মসজিদে ৯০০ মুসল্লি এবং জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের মসজিদে ১ হাজার ২০০ মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারবে।
গণপূর্ত অধিদপ্তর জানায়, খুলনায় ১১টি মডেল মসজিদ নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৯ সালে। ইতিমধ্যে জেলাপর্যায়ে আলিয়া মাদ্রাসা এবং উপজেলা পর্যায়ে তেরখাদা, রূপসা, ফুলতলা ও পাইকগাছা উপজেলায় কাজ সমাপ্ত হয়েছে। তবে দফায় দফায় মেয়াদ বাড়িয়েও শেষ হয়নি বিভাগীয় কমিশনার অফিসের পাশে, ডুমুরিয়া, দাকোপ, বটিয়াঘাটা, দিঘলিয়া ও কয়রা উপজেলায় নির্মাণকাজ। এর মধ্যে বিভাগীয় কমিশনার অফিসের পাশে ও ডুমুরিয়া উপজেলা মসজিদ নির্মাণে ফিনিশিংয়ের কাজ চলছে। দিঘলিয়া উপজেলায় মসজিদ নির্মাণে অগ্রগতি ৪০ শতাংশ। যার দোতলার ছাদ ঢালাইয়ের সাটারিংয়ের কাজ চলমান রয়েছে। কয়রা উপজেলায় কাজ শুধু শুরু হয়েছে। তবে দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় নির্মাণকাজ এখনো শুরুই হয়নি।
দিঘলিয়া মডেল মসজিদ নির্মাণে ধীর গতির কারণে সম্পর্কে গণপূর্ত অধিদপ্তর-১-এর উপবিভাগীয় প্রকৌশলী দীপক চন্দ্র শীল বলেন, ২০১৯ সালে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু তারা কিছু কাজ করে দীর্ঘদিন ফেলে রাখে। ফলে তাদের কার্যাদেশ বাতিল করে গত ১২ মার্চ এসএম বিল্ডার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এ প্রতিষ্ঠানকে ১২ মাস সময় দেওয়া হয়। এখন কাজ চলমান রয়েছে। মূলত আগের ঠিকাদারের গাফিলতি ও পরে ঠিকাদার নিয়োগে সময়মতো কাজ বাস্তবায়ন হয়নি।
খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, কয়রা উপজেলায় মডেল মসজিদ নির্মাণে প্রথমে কাজ পায় মেসার্স মধু ট্রেডার্স। ২০১৯ সালের ৩০ মে প্রতিষ্ঠানটিকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কাজ সমাপ্তে সময় দেওয়া হয় ছয় মাস। কিন্তু নকশার সঙ্গে জমির অমিল দেখা দেওয়ায় কাজ দেরি হয়। সে কারণে কার্যাদেশ বাতিল হয়। তবে জমির জটিলতা নিরসন করে গত ১৪ মে নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সনেক্স ইন্টারন্যাশনাল-মেসার্স তুহিন এন্টারপ্রাইজকে (জেভি) কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানকে কাজ বাস্তবায়নে ১২ মাস সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ২০ দিন আগে কাজ শুরু হয়েছে।
দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রসঙ্গে নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, দাকোপ উপজেলা মডেল মসজিদ নির্মাণে ২০১৯ সালে ১৩ জুন এমসিএএল অ্যান্ড আইসি (জেভি) নামে প্রতিষ্ঠানকে ও বটিয়াঘাটা উপজেলা মডেল মসজিদ নির্মাণে ২০১৯ সালের ২৭ মে মো. মিজানুর রহমান নামের প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। কিন্তু কাজে গাফিলতির কারণে ওই দুই প্রতিষ্ঠানে কার্যাদেশ বাতিল করা হয়। তাদের কার্যাদেশ বাতিল করার পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আদালতে মামলা করে। তবে সেই মামলা খারিজ হয়ে গেছে। চলতি বছর ২১ মার্চ নতুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসএনবিপিএল-এনএইচএরকে (জেভি) কার্যাদেশ দেওয়া হয়। দুটি উপজেলায় মসজিদ নির্মাণে প্রতিষ্ঠানটিকে ১৭ মাস সময় দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও জানান, প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে যেটির কাজ শুরু হয়নি, সেটির কাজ শিগগিরই শুরু হবে। এ ছাড়া চলমান কাজ দ্রুতই সমাপ্ত হবে।
ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে খুলনার বাসিন্দা রোকনুজ্জামান ও মিজানুর রহমানসহ মুসল্লিরা দেশ রূপান্তরকে জানান, একটু একটু কাজ করা হচ্ছে। ফেলে রাখা হচ্ছে বছরের পর বছর। এতে ব্যয় বাড়ছে, মানুষ সুফল পাচ্ছে না, যা হতাশাজনক।