বাকুতে জলবায়ু সম্মেলন

ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা প্রয়োজন: ড. ইউনূস

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, বেশিরভাগ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশে সবুজ শিল্প বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রয়োজন। গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন আরও বেশি দ্রুত ও টেকসই উপায়ে হ্রাস করতে ব্যাপক আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নিতে হবে। গতকাল মঙ্গলবার আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে জার্মানি ও চিলি আয়োজিত ক্লাইমেট ক্লাবের সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

ড. ইউনূস বলেন, বাংলাদেশ সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও কার্বন নির্গমন কমানোর ক্ষেত্রে ক্লাইমেট ক্লাবের সঙ্গে কাজ করতে ইচ্ছুক। তিনি বিশেষ করে উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোতে কম কার্বন নির্গমন প্রযুক্তি প্রদর্শন ও স্থাপনা গড়ার আহ্বান জানান। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অর্থায়নের সীমিত সুযোগ রয়েছে এমন দেশ বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দুর্বল উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অধিক মূলধন বিনিয়োগ করা শিল্পের জন্য একটি বাধা। প্যারিস চুক্তির আর্টিক্যাল ৬.৮-এর অধীনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

আমদানিতে সুষম কার্বন খরচ আরোপ করে একটি সুষম ক্ষেত্র তৈরি করতে কার্বন মূল্য নির্ধারণ বা সীমা সমন্বয় করের ওপর আন্তর্জাতিক চুক্তির ওপর জোর দিয়ে ২০০৬ সালে শান্তিতে নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে (এলডিসি) তাদের বিশেষ পরিস্থিতি ও উন্নয়ন চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে অগ্রাধিকারমূলক ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে।

শিল্পের ডিকার্বনাইজেশন সম্পর্কে তিনি বলেন, কার্বন নির্গমন বিশ্বব্যাপী স্বল্প-কার্বন প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্ভাবনের জন্য প্রণোদনা কমিয়ে দিতে পারে, কারণ কিছু খাত টেকসই ব্যবস্থা অনুশীলনের তুলনায় ব্যয়কে অগ্রাধিকার দিতে পারে।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘এসব ঝুঁকি প্রশমিত করার জন্য, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে ডিকার্বনাইজেশন প্রচেষ্টার ভারসাম্য বজায় রাখতে কার্বন সীমা সমন্বয় ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মতো নীতিগুলো অপরিহার্য।’

তিনি আরও বলেন, ‘এসব নীতি বাংলাদেশের মতো বিশেষভাবে দুর্বল উন্নয়নশীল দেশের কোম্পানিগুলোর প্রতিযোগিতামূলকতা প্রভাবিত করতে পারে। অধিক নির্গমন নীতির কারণে উচ্চ উৎপাদন খরচের পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী তাদের কম প্রতিযোগিতামূলক করে তুলবে। অতএব, স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য তাদের বিশেষ পরিস্থিতি ও উন্নয়ন চাহিদার কারণে অগ্রাধিকারমূলক ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে।’

জলবায়ু সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার ব্যস্ত দিন : জলবায়ু সম্মেলনে অংশ নিতে ইতিমধ্যে বিশ্বনেতারা বাকুতে জড়ো হয়েছেন। গতকাল সম্মেলনের প্রথম দিনে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানসহ বিশে^র বিভিন্ন দেশের অন্তত ২০ জন শীর্ষ নেতা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এ সময় তারা জলবায়ু সংকট সমাধানের উপায় এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় জানিয়েছে, আজ বাংলাদেশ সময় দুপুর দেড়টা থেকে বেলা সাড়ে ৩টার মধ্যে কপ-২৯-এ ওয়ার্ল্ড লিডারস ক্লাইমেট অ্যাকশন সামিটের উদ্বোধনী অধিবেশনে ভাষণ দেবেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দিতে চার দিনের সফরে বাকুতে রয়েছেন অধ্যাপক ইউনূস। বৈশি^ক জলবায়ু সংকট সমাধানের লক্ষ্যে এবারের সম্মেলনে প্রায় ২০০ দেশের শীর্ষস্থানীয় নেতারা একত্র হয়েছেন। এবারের সম্মেলনের মূল লক্ষ্য জলবায়ু সংকটের ভুক্তভোগী দরিদ্র দেশগুলো আরও অর্থসহায়তা দেওয়ার পথ খুঁজে বের করা।

প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় জানিয়েছে, জলবায়ু সম্মেলনে এক সাক্ষাতে শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক ইউনূসকে তুরস্ক সফরের আমন্ত্রণ জানান প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। পাশাপাশি তিনি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে এবং চলমান সংস্কার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে সব ধরনের সহায়তার আশ্বাস দেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূস ৫৭ বাংলাদেশিকে মুক্তি দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান। কোটা সংস্কার আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে তারা মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন।

এ ছাড়া পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুইজ্জু, ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে, নেপালের প্রেসিডেন্ট রাম চন্দ্র পৌদেলের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন প্রধান উপদেষ্টা। এ সময় অধ্যাপক ইউনূস সার্কের পুনরুজ্জীবনে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

প্রধান উপদেষ্টা আরও যাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন তাদের মধ্যে আছেন বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডি ক্রু, ঘানার প্রেসিডেন্ট ন্যানা কুফো-আদো, বসনিয়ার প্রেসিডেন্ট ডেনিস বেচিরভিচ, রুয়ান্ডার প্রেসিডেন্ট পল কাগামে, আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী এদি রামা, মন্টিনিগ্রোর প্রেসিডেন্ট জ্যাকব মিলাটভিচ, বার্বাডোজের প্রধানমন্ত্রী মিয়া মটলি, ব্রাজিলের ভাইস প্রেসিডেন্ট জিরাওদো আউখহিম ও ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট শিনা আনসারি। এ ছাড়া তিনি ফিফার প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনো এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) মহাপরিচালক অ্যামি পোপের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।

ইউনূসের নেতৃত্বের প্রশংসায় গ্র্যান্ড ইমাম : প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সমৃদ্ধ হবে এবং উন্নতি করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যান্ড ইমাম আহমেদ আল তৈয়ব। গতকাল সকালে বাকুর একটি হোটেলে অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তিনি এ মন্তব্য করেন। এ সময় প্রধান উপদেষ্টাকে আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান গ্র্যান্ড ইমাম তৈয়ব। আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ফুল ফান্ডেন্ড স্কলারশিপ ঘোষণা করবে বলেও জানান তিনি।

আমন্ত্রণ জানানোর জন্য গ্র্যান্ড ইমামকে ধন্যবাদ জানান অধ্যাপক ইউনূস। তিনি গ্র্যান্ড ইমামকে গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশ সশরীরে ঘুরে দেখার আহ্বান জানিয়ে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান। অধ্যাপক ইউনূস এ সময় বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবের দেয়ালচিত্রের সংকলন ‘দ্য আর্ট অব ট্রায়াম্ফ’ উপহার দেন গ্র্যান্ড ইমামকে।