চলচ্চিত্রে বাজেট থাকতে হবে উন্মুক্ত

বরাবরই তিনি থাকেন সাধারণ পোশাকে। মনেই হয় না মুশফিকুর রহমান গুলজার ছিলেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি। ঠিক সময়মতো চলে এলেন দেশ রূপান্তর অফিসে। কিছুক্ষণ আড্ডা হলো। এরপর গেলেন ছবি তুলতে। তারপর স্টুডিওতে। শুরু হলো ধুন্ধুমার আড্ডা। ছিলেন সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, আলোকচিত্র সম্পাদক সাহাদাত পারভেজ এবং নিজস্ব প্রতিবেদক উৎপল রায়। ক্যামেরায় ছিলেন কনটেন্ট এডিটর নুরুস সাফা।

তখনো ক্যামেরা রোলিং হয়নি। চলছে এলোমেলো কথা বলা। মুশফিকুর রহমান গুলজার এক প্রশ্নের উত্তরে বলছেন আমি একসময় জড়িত ছিলাম সাংবাদিকতার সঙ্গে। যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্নালিজম নিয়েই পড়াশোনা করেছি, সেই কারণে এই পেশার প্রতি আলাদা একটা ঝোঁক ছিল। ছাত্র অবস্থা থেকেই সাংবাদিকতার সঙ্গে জড়িয়ে যাই। এরপর লেখাপড়া শেষ করে জড়িত হই ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকার সঙ্গে। তারপর ছিলাম সাপ্তাহিক ‘সিনেমা’র নির্বাহী সম্পাদক। সেটা ১৯৯৫ সালের কথা। তখন থেকেই মাথায় ঘুরতে থাকে সিনেমার কথা। এমন সময় তাপস রায়হান তাকে থামিয়ে দেন। বলেন, আমরা প্রশ্নোত্তরে যাই। এরপর বিস্তারিত বলেন, নাকি? সবাই হেসে উঠলেন। মুশফিকুর রহমান গুলজার হেসে সম্মতি দিলেন।

তাপস রায়হান : আপনি পড়াশোনা করেছেন জার্নালিজমে। চলচ্চিত্রের প্রতি প্রবল ঝোঁক কীভাবে তৈরি হলো?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : আসলে ছোটবেলা থেকেই ফিল্মের প্রতি ঝোঁক ছিল। এর প্রতি ভীষণ দুর্বল ছিলাম। বিভিন্ন ধরনের চলচ্চিত্র দেখেছি। এমনও হয়েছে, গোপালগঞ্জ থেকে লঞ্চে খুলনা চলে গেছি সিনেমা দেখার জন্য। তখন লঞ্চে সাত থেকে সাড়ে সাত ঘণ্টা লাগত। বাড়িতে কিন্তু কাউকেই বলিনি। একটা সুবিধা ছিল, নানার বাসা ছিল শহরে। আর গ্রামের বাড়ি ছিল শহরের পাশে। আমি দুই জায়গাতেই থাকতাম। আমি যদি নানাবাড়িতে না থাকতাম, সবাই ভাবত আমি গ্রামের বাড়িতে আছি। আবার গ্রামের বাড়িতে না থাকলে সবাই ভাবত, আমি নানা বাড়িতে আছি। এভাবে সারা দিন সিনেমা দেখে, রাতে লঞ্চে ফিরে যেতাম। এটা সত্তর দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা। স্কুলে থাকতেই আমি ‘চিত্রালী’ পত্রিকা নিয়মিত পড়তাম। এরপর যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম, তখন বিভিন্ন চলচ্চিত্র বিষয়ক পত্রিকা পড়তাম। ফিল্ম এপ্রিসিয়েশন কোর্স করেছি। ধানমন্ডিতে যে ইন্ডিয়ান কালচারাল সেন্টার ছিল, সেখানে ফিল্মের ওপর বিভিন্ন ধরনের ওয়ার্কশপ করেছি। এরপর সোভিয়েত কালচারাল সেন্টার, এখন যেটা রাশিয়ান কালচারাল সেন্টার সেখানেও অনেক চলচ্চিত্র বিষয়ক কোর্স করেছি। পাশাপাশি বিভিন্ন ফিল্ম সোসাইটির কোর্সও করতাম। পড়াশোনার গ্যাপে কিছু ছবির সহকারী পরিচালক হই। প্রথম ছবি ছিল মেঘ বিজলি বাদল।

উৎপল রায় : এটা কত সালের কথা?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : এটা ছিল, ’৮০ সাল।

সাহাদাত পারভেজ : পরিচালক কে ছিলেন?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : কাজী নুরুল হক। আর কাহিনি হচ্ছে আকবর হোসেনের। তিনি খুব ভালো লেখক ছিলেন। লিখেছেন অল্প। কিন্তু সবই চমৎকার। এরপর আবার ফিরে গেলাম লেখাপড়ায়। পরবর্তী সময়ে পড়াশোনা শেষ করে বাংলার বাণীতে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে যোগ দিলাম। অবশ্য তার আগেই ছাত্রাবস্থার শেষের দিকে ‘ছায়াছন্দ’ পত্রিকায় চলচ্চিত্র বিষয়ে লেখালেখি করতাম। ’৮৮ সালে বাংলার বাণীতে স্টাফ রিপোর্টার হিসেবে কাজ শুরু করি। আবার কালচারাল পাতাটাও দেখতাম। ‘ছায়াছন্দ’ পত্রিকায় লেখালেখির সময়েই এফডিসিতে যাতায়াত করতাম। কিন্তু বাংলার বাণীর ‘সিনেমা’ পত্রিকার যখন নির্বাহী সম্পাদক হলাম, চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়ে যায়। তখন চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট সবাই আমাকে সাদরে গ্রহণ করেন। এরপর ’৯৬ সালে বাংলার বাণী বন্ধ হয়ে যায়। আমি ঝুঁকে যাই চলচ্চিত্রের দিকে। তখন আমার পরিচিত ছিলেন প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক আলমগীর কুমকুম সাহেব। তিনি ছিলেন, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তার মাধ্যমেই পরিচয় হয় আনন্দমেলা সিনেমা লিমিটেডের কর্ণধার সুকুমার রঞ্জন ঘোষ এবং সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে। তারাই একদিন বললেন, ‘আমরা একটা সিনেমার কপিরাইট নিয়ে আসছি, সেটা বানাতে চাই। কিন্তু যার কাছ থেকে কপিরাইট এনেছি, বোম্বের সেই নাসির হোসেন। তিনি বলেছেন, নতুন ছেলেমেয়ে নিয়ে নির্মাণ করতে। তাতে এটা ভালো হবে।’ তখন আমি ছায়াছবির কথা জানতে চাইলাম। তারা বললেন, ‘কেয়ামত সে কেয়ামত তক’। আমি যখন সিনেমা পত্রিকায় কাজ করি, তখন একটা প্রচ্ছদ প্রতিবেদন করেছিলাম। সেখানে মডেল হিসেবে ছিল বিপাশা হায়াত, শমী কায়সার, সাদিয়া ইসলাম মৌ, মেহজাবিন আর মৌসুমী। মৌসুমী তখন তিব্বত পাউডারের বিজ্ঞাপন করছিল। একপর্যায়ে আমি তাদের মৌসুমীর কথা বলি। সোহানুর রহমান সোহান ছিল ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির পরিচালক। তাকে একদিন মৌসুমীর ছবি দেখাই। তিনি বললেন, ভালো হয়। দেখো তো ওকে পাওয়া যায় কিনা? এরপরই যোগাযোগ করি মৌসুমীর সঙ্গে। অনেক দেনদরবারের পর সে রাজি হয়। কারণ একসময় বাবা রাজি তো, মা হয় না। আবার মা রাজি তো বাবা হয় না। তখন পরিচালক এস আলম সাকী, সম্ভবত এখন জার্মানিতে, তিনিই সালমান শাহর একটা ছোট ছবি দিলেন। তখন ওর নাম ছিল ‘ইমন’। এরপর আমি আর সোহান সাহেব গিয়ে তাকে দেখি। তাকে দেখে, কথা বলে পছন্দ হয় আমাদের। এমন সময় মৌসুমীর  মা-বাবা একটা শর্ত দেয়। বলেন, তুমি যদি এই ছবির সঙ্গে থাকো, তাহলে আমরা দেব। না হলে পারব না।

উৎপল রায় : আপনার সঙ্গে আগেই পরিচয় ছিল?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : না, ওই যে কভার স্টোরি। এইটুকুই। এর পর তো ওই ছবির সঙ্গেই জড়িয়ে যাই। আমি ছিলাম ছবির নির্বাহী প্রযোজক। আসল প্রযোজকরা তো কোথাও যেতেন না। সবকিছু আমাকেই দেখতে হতো। মূলত পালন করতে হতো অর্থনৈতিক দায়িত্বটা। এরপরই পুরোপুরি যুক্ত হয়ে যাই ফিল্মের সঙ্গে। সম্ভবত সিনেমটা ’৯৩ সালের ২৬ মার্চ ছবিটা মুক্তি পায়। সেদিন আবার ঈদ ছিল। এরপর ’৯৬ সালে ভাবলাম, নিজেই এখন ছবি বানাতে পারব। প্রথম সিনেমা হয় ‘সুখের ঘরে দুখের আগুন’। ছবিতে ছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন, দিতি, মৌসুমী। এখানে  একটা গল্প আছে। মৌসুমী বলল আমি করতে পারি, তবে একটা শর্ত আছে। আমাকে কোনো টাকা দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। না হলে, আমি ছবি করব না। আমি বললাম, এটা তো কথা না। তুমি কম নাও। একটা সাইনিং মানি তো নেবে? শেষ পর্যন্ত ছবিটা নাও হতে পারে! মৌসুমী বলল তা হোক। আমি কোনো স্বাক্ষর করব না, টাকা নেব না। এই শর্তে রাজি হলে করতে পারি। আমিও রাজি হলাম। এরপর হলো সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ঘটনা। এফডিসির ৮ নম্বর ফ্লোরে একটি ছবির শুটিং করছিলেন আলমগীর, শাবানা আপা। এরপর আলমগীর ভাইয়ের সঙ্গে কথা বললাম। তিনি রাজি হলেন। শাবানা আপা সব শুনে আমাকে দোয়া করলেন। এই তো এভাবে পরিচালক হিসেবে আমার যাত্রা শুরু হলো।

সাহাদাত পারভেজ : এরপর কতগুলো ছবি পরিচালনা করলেন?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : নয়টা রিলিজ হয়েছে। ১০ নম্বর শুরু হবে। এখন স্ক্রিপ্ট করছি। আগামী জানুয়ারিতে শুটিং শুরু হবে। এরপরের ছবি হচ্ছে ‘বিন্দুর ছেলে’। শরৎচন্দ্রের গল্প অবলম্বনে। ইমপ্রেস টেলিফিল্ম থেকে হবে।

উৎপল রায় : আপনি কি চ্যানেল আইয়ের সঙ্গে যুক্ত?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : হাহাহাহা। ২০০০ সালের দিকে সাগর ভাই একদিন ফোন দিলেন নাকি খবর পাঠালেন, মনে নেই। তখন চ্যানেল আইয়ের অফিস সিদ্ধেশ্বরীতে। সেখানে গেলাম। সাগর ভাই বললেন আপনি নাকি একটা সিনেমা বানাইছিলেন? আমি বললাম, হ্যাঁ। তিনি বললেন সিনেমাটা দেন। আমরা চালাই। সিনেমাটা অন এয়ার হওয়ার পর, সাগর ভাই বললেন নাটক বানাবেন? আমি বললাম, বানাব না কেন? তিনি একটা গল্প দিলেন। বললেন দেখেন কাকে দিয়ে অভিনয় করালে ভালো হয়। মৌসুমী আর কাকে নেবেন, সেটা আপনার বিষয়। সেটা শেষ করার পর সাগর ভাই বললেন আমরা চলচ্চিত্র বানাব। তিনি বললেন আপনি আমাদের সঙ্গে থাকেন। আমি বললাম, কীভাবে থাকব? আমি তো ফুলটাইম চাকরি করতে পারব না। চলচ্চিত্র বানাতে হবে তো। তিনি বললেন এটা কোনো সমস্যা না। ফাঁকে ফাঁকে সময় দিলেই হবে। আপনি ফিল্ম ডিভিশনে অ্যাডভাইজার হিসেবে থাকেন। অবশ্য প্রথমে কথা ছিল ‘দেবদাস’ ছবি বানানোর। সেটা হয়নি। বানানো হলো ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’। এরপরই ‘বিন্দুর ছেলে’। এরপর তো অনেক ছবি বানালাম। আনন্দমেলা থেকে অনেক ছবি বানিয়েছি।

উৎপল রায় : ‘সুখের ঘরে দুখের আগুন’ ছবিটা তো বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছিল? এই ছবিই কি আপনাকে আরও ছবি বানাতে উৎসাহ দিয়েছে?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : হ্যাঁ। এই ছবিটা বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। অনেকেই বলেছিলেন। যখন এই ছবিটা রিলিজ হলো ’৯৭ সালের ১০ অক্টোবর, তখন বাণিজিক চলচ্চিত্রের বাজার অনেক ভালো ছিল। তখন পরিচালক হিসেবে অনেকেই প্রশংসা করেছিলেন। তখনই আসলে আমার উৎসাহ বেড়ে যায়। এরপর যত ছবি বানিয়েছি, কেউ বলতে পারবে না কোনো নকল গল্প নিয়ে সিনেমা বানিয়েছি। শুধু শরৎচন্দ্রের বিন্দুর ছেলে আর মেহের নিগার। এটি তাজুল ইসলামের একটি ছোট গল্প। এরপর মাহবুব জামিলের নিঝুম অরণ্য।

তাপস রায়হান : এক সময় বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে শুরু হয় অশ্লীলতা। এখন আগের পরিস্থিতি নেই। কিন্তু আপনি যখন চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির নেতৃত্বে ছিলেন, তখন চলচ্চিত্রের সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন? 

মুশফিকুর রহমান গুলজার : একটা কথা বলি। আগেও বলেছি। আমাদের চলচ্চিত্র নিয়ে অনেকেই সহানুভূতি দেখায়। বাস্তবে কেউ কিন্তু চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য কাজ করে না। বিশেষ করে, যাদের দায়িত্ব রয়েছে। আমরা জানি, এফডিসি হচ্ছে চলচ্চিত্র নির্মাণের সূতিকাগার। চলচ্চিত্র উন্নয়নের প্রধান সংস্থা। সেই এফডিসিতে যারা এমডি হয়ে এসেছেন, কেউ চলচ্চিত্র উন্নয়নের জন্য কাজ করেননি।

তাপস রায়হান : তাহলে তারা কী করেছেন?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : চলচ্চিত্রের উন্নয়নের জন্য তাদের আমরা অনেকবার বলেছি। কিছুই হয়নি। নির্মাতাদের সহযোগিতার কথা অনেকবার বলা হয়েছে। উল্টো আমাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়েছে। অকারণে চলচ্চিত্রের নির্মাণ কাজ বাড়িয়েছে। ক্যামেরা ভাড়া, এডিটিংসহ সব খরচ বাড়ানো হয়েছে। এসব নিয়েই তারা ব্যস্ত।

উৎপল রায় : আপনার কী মনে হয়, এফডিসির এমডি হিসেবে চলচ্চিত্রের একজন বোদ্ধা থাকলে অনেক সুবিধা হতো?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : অবশ্যই। যারা এমডি হয়ে এফডিসিতে আসেন তাদের চলচ্চিত্র নিয়ে কোনো ন্যূনতম জ্ঞানও নেই। শুধু রাজীব ভাই আর পীযূষ দা ছাড়া। আসলে দরকার হচ্ছে, যারা চলচ্চিত্র বোঝে তাদের এই পদে নিয়ে আসা। তাদের তো জানতে হবে, কোন যন্ত্রে কী কাজ হয়! আমাদের কিন্তু লেটেস্ট লাইট, ক্যামেরা, এডিটিং প্যানেল, কালার গ্রেডিং মেশিন রয়েছে। কিন্তু এসব চালানোর লোক নেই। এটা নিয়েও আমরা প্রতিবাদ করেছি।

তাপস রায়হান : এই থাকা না থাকাটা কার ওপরে নির্ভর করে?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : এখানে কথা আছে। যে সমস্ত জায়গা থেকে এসব যন্ত্রপাতি কেনা হয়, তখন কিন্তু কোম্পানির পক্ষ থেকে একটা অফার থাকে। তারা আমাদের ৩-৪ জন মানুষকে ট্রেনিং দিয়ে দেবেন সেই যন্ত্র চালানোর জন্য। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, এখানে কোনো ক্যামেরাম্যান, এডিটিং প্যানেলের কাউকে পাঠানো হয় না সেখানে যান সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সরকারি কর্মকর্তা, এমডি। তারা কী শিখে আসেন আমরা জানি না।

তাপস রায়হান : এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ জানিয়েছিলেন?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : অনেকবার। প্রয়োজন ছিল সংশ্লিষ্ট শাখার কর্মকর্তাদের, টেকনিশিয়ানদের পাঠানো। বহুবার বলেছি। লাভ হয়নি।

তাপস রায়হান : এফডিসির বিভিন্ন শাখার দুর্নীতি নিয়ে অনেক কথা আছে। সেখানে কোটি কোটি টাকা নয়ছয়ের অভিযোগও আছে। এসব নিয়ে পরিচালক সমিতির কিছু করার নেই?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : এফডিসিতে আগে একটা টেকনিক্যাল কমিটি ছিল। সেই কমিটিতে পরিচালকসহ টেকনিক্যাল লোকেরা থাকতেন। কোনো কিছু কেনার টেন্ডার হওয়ার আগে, পরামর্শ করা হতো তাদের সঙ্গে। কমিটির মিটিংয়ে সবকিছু উত্থাপিত হতো। তারপর সর্বসম্মতিতে একটা জিনিস কেনা হতো। এখন সেই কমিটিতে আর আমাদের নেওয়া হয় না। সব নিজেরা নিজেরাই করেন। সেখানে যা দরকার নাই, সেটাও কেনেন। খেয়াল খুশি মতো। একসময় একজন এমডিকে বলা হয়েছিল এখন আর ফিল্ম না কিনলেও চলবে। দরকার নাই। সব ডিজিটাল হয়ে যাচ্ছে। এসব আর কেউ ব্যবহার করবে না। তিনি এই কথা শুনলেন না। তিনি ৮ কোটি টাকার ফিল্ম কিনলেন। কেন কিনলেন? কারণ সেখান থেকে তিনি কমিশন পাচ্ছেন। এরপর হলো কী, যে নেগেটিভ এলো, তার দাম বাড়ানো হলো। কিন্তু আমরা যদি সরাসরি কিনি তাহলে অনেক কম দামে পাব। এরপর সেটা বাধ্যতামূলক করা হলো। বলা হলো, এখান থেকে না কিনলে বাইরের ফিল্ম হলে এত টাকা ডেভেলপ খরচ হবে। আর এফডিসির ফিল্ম হলে এত টাকা। আসলে যে টাকা ঘুষ খেয়েছেন, তা এডজাস্ট করার পলিসি। তখন আমরা প্রতিবাদ করলাম। কিছুই হলো না। আস্তে আস্তে ফিল্মগুলো নষ্ট হয়েছে। ডিএফপি কিছু ব্যবহার করেছে। অধিকাংশই পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এফডিসি কিন্তু সেই টাকাটা ঋণ হিসেবে নিয়েছিল ব্যাংক থেকে। তখন কর্মচারীদের বেতন দিতে পারে না। এই তো অবস্থা। এই হলো দুর্নীতির চিত্র। আবার ডিজিটাল সাউন্ড কমপ্লেক্স নিয়েও অনেক কথা রয়েছে। একবার একটা কোটেশনে ছিল, ইউএসএর এই মডেল দিতে হবে। যেখানে মেড ইন লেখা থাকে, সেখানে পাতলা একটা স্টিলের পাত লাগিয়ে লেখা হয় ‘মেড ইন ইউএসএ’। আমরা অভিযোগ পেয়ে সেই মেশিনের পাত সরিয়ে দেখি সেখানে লেখা ‘মেড ইন চায়না’।

সাহাদাত পারভেজ : আমাদের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র এখন কোন জায়গায় রয়েছে?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : সত্যি কথা বলতে গেলে, আমাদের চলচ্চিত্র এখন খুবই খারাপ জায়গায় রয়েছে। কোনো ভালো সিনেমা হল নেই। ইচ্ছা থাকেলও যে সিনেমা দেখবে, এ রকম হলের সংখ্যা কত? মাঝখানে একটা হিসাব পেয়েছিলাম, আমাদের দেশের ১৬-১৭টি জেলায় কোনো সিনেমা হলই নেই। অথচ একসময় এসব জেলায় সিনেমা হল ছিল। এখন সাধারণ দর্শক কোথায় সিনেমা দেখবেন? আর সিনেপ্লেক্সে কোন শ্রেণির মানুষ ছবি দেখেন?  একটা ‘দেবি’, ‘তুফান’, ‘মনপুরা’ এ ধরনের ছবি তো ৪-৫ বছরে একটা। সেই ১-২টা ছবি দিয়ে তো ইন্ডাস্ট্রি চলতে পারে না। কমপক্ষে ৮-১০টা ছবি লাগে।

তাপস রায়হান : তাহলে কি সিনেমা ধ্বংসের মূল কারণ পাইরেসি?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : একদম। এটা তো শুরু। এর সঙ্গে রয়েছে বুকিং এজেন্টদের কারসাজি।

সাহাদাত পারভেজ : পরিচালক সমিতির মূল কাজ কী?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : প্রথমেই মনে রাখতে হবে, আমরা সরকারি কোনো অথরাইজড না। স্বেচ্ছাসেবীমূলক সমিতি। আমাদের কাজ হচ্ছে, চলচ্চিত্র নির্মাণে কোনো বাধা আসছে কি না? কেউ অন্যায়ভাবে কিছু চাপাচ্ছে কি না? পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্ব হচ্ছে কোনো পরিচালক অসুস্থ রয়েছেন কি না, তার পরিবারের আর্থিক অবস্থা কেমন এসব দেখা। একজন পরিচালক যদি ১০ বছর ছবি পরিচালনা না করতে পারেন, তাহলে তারা খাবেন কী? এসব ক্ষেত্রে আমরা সাধ্যমতো দেখি। চলচ্চিত্রের ভালোমন্দ নিয়ে কিন্তু সবচেয়ে বেশি সোচ্চার থাকে পরিচালক সমিতি। টেকনিশিয়ানদের প্রধান সংগঠন হচ্ছে চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতি। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে পরিচালক হতে হয়। প্রযোজক তো যে কেউ হতে পারেন, টাকা থাকলেই হন। যে কারণে রুচিহীন কিছু মানুষও প্রযোজক হয়ে যান।

তাপস রায়হান : রুচিহীন পরিচালক ছাড়া তো রুচিহীন প্রযোজক হওয়া সম্ভব নয়। দায় কি পরিচালকের নেই?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : একটা কথা আছে না, অভাবে স্বভাব নষ্ট। জীবনের তাগিদে অনেককেই আপস করতে হয়। অনেকেই প্রযোজকের ফরমায়েশি ছবি বানাতে বাধ্য হয়েছেন। এখন কি একজন পরিচালকের আগের সম্মান আছে?

উৎপল রায় : তাহলে কি যোগ্য পরিচালক-শূন্যতায় ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : আমি তা মনে করি না। বর্তমানে সুন্দর গল্পের ব্যাপক চাহিদা। নানা কারণে চলচ্চিত্র এখন সর্বজনীন নয়।

তাপস রায়হান : এই শিল্প কি হুমকির মুখে?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : এটা বলা মুশকিল। চলচ্চিত্রের ব্যাপক প্রসারও কিন্তু হচ্ছে।

সাহাদাত পারভেজ : এটা কি বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের কথা বললেন?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : না, বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র না। ফিচারধর্মী চলচ্চিত্র প্রসার হচ্ছে। এগুলো অন্যরকম। আসলে এখন চলচ্চিত্রের গল্পে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয়েছে। সিনেমা ভালো হলে কিন্তু সিনেমা হলেও দর্শক যায়। ওটিটি বা ওয়েব ফিল্ম তো সবার দেখার সুযোগ নেই। মোট জনসংখ্যার বা দর্শকের কজন দেখে? মোবাইল বা টেলিভিশনে চলচ্চিত্রের স্বাদ পাওয়া যাবে না। চলচ্চিত্রে বাজেট থাকতে হবে উন্মুক্ত। পরিচালককে স্বাধীন করতে হবে। তাহলেই বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র ঘুরে দাঁড়াবে।

তাপস রায়হান : সরকার নিয়মিত প্রতিবছর বিভিন্ন ছবিতে অনুদান দিচ্ছে। বিষয়টি কীভাবে দেখেন?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : অনুদান কমিটিতে আমি ছিলাম। এখানে কিছু সমস্যা আছে। এমন কিছু লোক অনুদান পেয়ে যান, যারা জীবনে ছবিই বানাননি। এখানে অনেক সুপারিশ থাকে, রাজনৈতিক চাপ থাকে। এখান থেকে মুক্ত হতে হবে। এটা অনেকবার বলেছি।

সাহাদাত পারভেজ : এই মুহূর্তে চলচ্চিত্র প্রসারে কী দরকার?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : ৬৪ জেলায় সিনেমা হলের মতো সিনে কমপ্লেক্স তৈরি করতে হবে। প্রতিটি জেলা শহরে অনেক খাসজমি পড়ে আছে। সিটি করপোরেশনকে একটা বরাদ্দ দেওয়া হোক। বলা হোক, প্রতিটি সিনেমা হলের চেহারা একই রকম হবে। তিনটা সিনেমা হল থাকবে। অডিটোরিয়াম থাকবে। লাইব্রেরি থাকবে। স্ন্যাকসের দোকান থাকবে। হেরিটেজের দোকান থাকবে। এ রকম অনেক কিছু। আহামরি খরচ কিন্তু না। ছয়তলার একটা কমপ্লেক্স যদি হয়, সেখানে যদি ১০০ দোকান থাকে, এসব দোকান, সিনে কমপ্লেক্স, অডিটোরিয়াম ভাড়া দিয়েই তো লিজ দিতে পারে। সরকারের সদিচ্ছা থাকতে হবে। এতে কিন্তু সেই এলাকায় একটা সাংস্কৃতিক বিপ্লব হবে। আসলে সরকারের আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশ সম্ভব নয়।

তাপস রায়হান : আপনার পারিবারিক জীবনের কথা শোনা হলো না?

মুশফিকুর রহমান গুলজার : হাহাহাহাহা...। সব চলছে। পরিবারই তো নেই। ঘর-সংসার করিনি। আমি একাই আছি। তবে আমার বিশাল পরিবার। চাচাতো-মামাতো-ফুপাতো ভাইবোনদের নিয়ে ভালোই আছি। আমাদের পরিবারের বন্ধন অনেক শক্তিশালী। সবাই সবার সমস্যা শেয়ার করি। আর চ্যানেল আই নিয়েই আছি। চলচ্চিত্রের ওপর নির্ভর করে বাঁচা সম্ভব নয়। এটা শখ। আসলে চ্যানেল আইয়ের সূত্র ধরেই জীবন-জীবিকা চলছে।

গ্রন্থনা : অনিন্দিতা আচার্য

ছবি : আবুল কালাম আজাদ

লোকেশন : গ্রিন লাউঞ্জ