জলবায়ু ফান্ডে অর্থ ছাড়ের বিষয়ে উন্নত বিশ্বের দেশগুলোর দরকষাকষির পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবে ক্ষতিপূরণ বঞ্চিত হচ্ছে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো। ফলে সম্মেলনে অনুদান বা ক্ষতিপূরণের চেয়ে ঋণ দিতে আগ্রহী রাষ্ট্রগুলো। জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন ক্ষতিপূরণ আদায়ের এই পথকে বেশ জটিল ও কঠিন মনে করছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে অর্থছাড় বা ক্ষতিপূরণের বিষয়ে বিগত বছরগুলোতে উন্নত বিশ্ব প্রতিশ্রুতি দিয়ে তা রক্ষা করেনি। ফলে কপ-২৯-এ এ বিষয়ে শঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
জলবায়ু প্রভাব মোকাবিলায় ১০ ট্রিলিয়ন ডলার সবুজ শিল্পে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছেন কপে অংশ নেওয়া ব্যবসায়িক নেতা, ব্যাংক ও বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মালিকরা। আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে ‘অর্থ, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য’র জন্য নির্ধারিত দিনে বিজনেস, ইনভেস্টমেন্ট এবং ফিলানথ্রপি ক্লাইমেট প্ল্যাটফর্ম থেকে (বিআইপিসিপি) বিনিয়োগ সংক্রান্ত অর্থছাড়ের বিষয়ে বৃহৎ ব্যবসায়ী ও ব্যাংকিং সেক্টর থেকে এই ঘোষণা করা হয়।
বিআইপিসিপি জানায়, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় এই বাজারে বেসরকারি মূলধন স্থাপন ও খাতটিকে আরও ফলপ্রসূ করতে গতি বাড়াতেই বিশাল এই অর্থ বিনিয়োগের ঘোষণা করা হয়েছে। নতুন কর্মসূচির জন্য ৩৫০ কোটি ডলার তহবিল ঘোষণা করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), আজারবাইজানের ব্যাংকিং খাত ২০৩০ সালের মধ্যে সবুজ প্রকল্পে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার, সুইডেন জাতিসংঘের সবুজ জলবায়ু তহবিলে ৭৩০ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নের ঘোষণা করেছে।
সুইডেন সরকারের পক্ষ জাতিসংঘের সবুজ জলবায়ু তহবিলে (জিসিএফ) ৭৩০ মিলিয়ন ডলার প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে। এটি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনে বিনিয়োগ করা হবে। কার্বন নিঃসরণ কমাতে জলবায়ু উদ্যোগে বিনিয়োগেও কাজ করবে। দেশটির পক্ষ থেকে এই সপ্তাহের শুরুতে ফান্ড ফর লস অ্যান্ড ড্যামেজে ১৯ মিলিয়ন ইউরো বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে, বিপুল এই অর্থছাড়ে খুব একটা আশাপ্রদ কিছু দেখছে না বাংলাদেশসহ স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। উন্নত রাষ্ট্রগুলোর কাছে বিনিয়োগ বা ঋণ নয় বরং ক্ষতিপূরণ চাচ্ছে এলডিসিভুক্ত দেশগুলো।
বাংলাদেশ ডেলিগেশন টিমের সদস্য ড. মিজানুর রহমান জানান, কপ-২৯-কে বলা হয় ‘কপ অব ফাইন্যান্স’। ২০২০ সালের মধ্যে আমাদের ১০০ বিলিয়ন ডলার অর্জন করার কথা ছিল সেটি আমরা অর্জন করতে পারিনি। ২০২২ সালে উন্নত বিশ্ব, তারা বলছে ১১৬ বিলিয়ন ডলার দিয়েছে, কিন্তু আমরা এই নম্বরকে বিশ্বাস করি না। অক্সফাম হিসাব করে দেখিয়েছে সেটা প্রয়োজনের তুলনায় এক-চতুর্থাংশেরও কম। তাই জলবায়ু অর্থায়নের ওপর আমি খুব আশাবাদী না।
ক্ষতিপূরণের অর্থ না পাওয়ার বিষয়ে বা বিশ্বনেতাদের আশ্বাসে হতাশা প্রকাশ করেছেন জলবায়ু অর্থায়নের এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, ১০ ট্রিলিয়ন ডলার অর্থায়নের যে কথা বলা হচ্ছে, সেটি বিরাট অঙ্কের একটি টাকা। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসাকে প্রসার করতে ‘গ্রিন ওয়াশিং স্ট্র্যাটিজি’ নেয়। তাদের ব্যবসায়িক অর্থায়ন কতখানি কার্বন নিঃসরণ করবে সেটা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।
লস অ্যান্ড ড্যামেজ বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ ডেলিগেশন টিমের সদস্য মো. হাফিজ খান বলেন, অ্যাডাপটেশন, মিটিগেশন, লস অ্যান্ড ড্যামজ খাতে সহায়তা নয়, ঋণ দিতে চান বিশ্বনেতারা। তবে বাংলাদেশসহ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর দাবি লোন নয় দরকার ক্ষতিপূরণ। অন্তত এবারের কপে আমরা বার্ষিক ১.৩ ট্রিলিয়ন ক্ষতিপূরণের একটি গোল সেট করতে চাই। যদি এখন পর্যন্ত তেমন প্রতিশ্রুতি মেলেনি। দেশগুলোর প্রতিনিধি সেই চেষ্টা করছেন। প্যারিস চুক্তির আলোকে প্রতি বছর উন্নত দেশগুলোর ১০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা থাকলেও তা তারা পূরণ করেনি, তাই অর্থছাড়ে সংকট ও শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বেসরকারি খাতের সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করতে অন্তত এক হাজারেরও বেশি ব্যবসা, অর্থ ও দাতা সংস্থার শীর্ষ নেতারা কপ-২৯ বিজনেস, ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ফিলানথ্রপি ক্লাইমেট প্ল্যাটফর্ম (বিআইপিসিপি) বৈঠকে অংশ নেন। এই ইভেন্টে অংশীদারদের মধ্য এভিপিএন, বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্স করপোরেশন, মারাকেশ পার্টনারশিপ, সাসটেইনেবল মার্কেটস ইনিশিয়েটিভ, ডব্লিউবিসিএসডি, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এবং এক্সপ্রাইজ অংশগ্রহণ করে।
কপ-২৯ প্রেসিডেন্সির প্রেসিডেন্ট মুখতার বাবায়েভ বলেন, দরকার হলো জলবায়ু পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং আমাদের প্রয়োজনীয় অর্থায়ন সরবরাহ করা। যেহেতু আমরা জলবায়ু অর্থায়নকে সবচেয়ে গুরুত্ব দিই। সেহেতু বৃহত্তর আর্থিক প্রতিশ্রুতির জন্য আমাদের বেসরকারি খাত, বহুজাতিক কোম্পানি, বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক এবং জলবায়ু তহবিল, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের এসব বিষয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
কপ-২৯ বাকু ইনিশিয়েটিভ ফর ক্লাইমেট ফাইন্যান্স, ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ট্রেড (বিআইসিএফআইটি) সম্পর্কে জাতিসংঘের প্রোগ্রাম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর এবং বিআইসিএফআইটি ইনিশিয়েটিভের সহ-নেতা আচিম স্টেইনার বলেন, অর্থায়ন সীমাবদ্ধতার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে তাদের উচ্চাকাক্সক্ষী জলবায়ু কর্মসূচি বাস্তবায়ন থেকে পিছিয়ে রাখা উচিত নয়। এই মুহূর্তে আমাদের বিশ্বব্যাপী আর্থিক কাঠামোর সংস্কারসহ দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সরকারি ও বেসরকারি অর্থায়নে একটি বড় পরিবর্তন প্রয়োজন। বিআইসিএফআইটি জলবায়ু অর্থায়ন, বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য বড় ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে।
বাকু ইনিশিয়েটিভ ফর ক্লাইমেট ফাইন্যান্স, ইনভেস্টমেন্ট অ্যান্ড ট্রেড (বিআইসিএফআইটি) প্রসঙ্গে আঙ্কটাডের মহাসচিব ও বিআইসিএফআইটি ডায়ালগ ইনিশিয়েটিভের কো-লিডার রেবেকা গ্রিস্প্যান বলেন, ‘২০২৫ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জলবায়ু অর্থায়নে বছরে ১ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। এই উদ্যোগটি আমাদের বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং অর্থায়নকে ত্বরান্বিত করবে।
অন্যদিকে জলবায়ু প্রভাবের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর প্রয়োজন প্রায় ৬ ট্রিলিয়ন ডলার। কিন্তু বিপুল এই অর্থ দিতে বিশ্ব মোড়লরা একমত হতে পারছে না। ছোট ছোট যে অর্থ দেওয়া হচ্ছে তা ছাড়ের ক্ষেত্রেও প্রস্তুত নয় অনেক দেশ। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, চীনের মতো দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা না আসায় শঙ্কাও কাটছে না ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব মোড়লরা না আসায় থমকে যেতে পারে আগের দেওয়া অনেক প্রতিশ্রুতি।
প্যারিস চুক্তির আলোকে প্রতি বছর উন্নত দেশগুলো বছরে ১০০ বিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সেটি গত ৯ বছরে বাস্তবায়ন হয়নি। এর মধ্যে জলবায়ু সম্মেলনের জলবায়ু প্রভাবে ক্ষতি মোকাবিলায় বছরে ১৭০ বিলিয়ন অর্থ প্রয়োজন বলে মনে করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংক, এশিয়া ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকসহ উন্নয়ন সংস্থাগুলো এমনই একটি ধারণা তুলে ধরেছে।
কপ-২৯ সূত্র বলছে, ২০২৩ সালের তথ্য বলছে চীন কার্বন নিঃসরণ করেছে ৩২ দশমিক ৮৮ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্র ১২ দশমিক ৬ শতাংশ, ভারত ৬ দশমিক ৯ শতাংশ, রাশিয়া ৪ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ করে। বিপুল পরিমাণ কার্বন নিঃসরণ করেও অর্থ দিতেই চাচ্ছে না চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ প্রভাবশালী দেশগুলো।
নিজেদের দায় স্বীকার না করতে কপের ২৯তম জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দেননি চীন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানরা।
সম্মেলনে উন্নত রাষ্ট্রগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের অনুপস্থিতিতে অনেকটা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর প্রতিনিধিরা। তারা মনে করেন রাষ্ট্রপ্রধানদের অনুপস্থিতি অর্থছাড়ে বাধা হতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি সব দেশের প্রতিনিধিদের অর্থছাড়ে সদিচ্ছা থাকে তাহলে রাষ্ট্রপ্রধানদের অনুপস্থিতি বাধা হবে না। তবে বেশ কিছু বিষয়ে আলোচনার পথ তৈরি হয়েছে।