রাজধানী ঢাকার উপকণ্ঠে গড়ে উঠছে নাগরিক বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা সংবলিত পূর্বাচল উপশহর। শহরের ব্যস্ততা থেকে একটুখানি অবসরের আশায় ভ্রমণপিপাসুরা বেড়াতে আসেন পূর্বাচলে। দৃষ্টিনন্দন ৩০০ ফুট সড়কের পূর্বাচল উপশহর হয়ে উঠেছে ঢাকাসহ আশপাশের এলাকার বাসিন্দাদের জন্য অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। পূর্বাচল ঘিরে গড়ে উঠেছে হরেক রকমের কয়েক হাজার দোকানপাট। কিন্তু দিনের আলো ও সন্ধ্যার দিকে পর্যটকে মুখরিত থাকলেও পশ্চিম আকাশে লাল আভা ছড়িয়ে সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গেই পূর্বাচলে নেমে আসে ঘুটঘুটে অন্ধকার। রাত যত গভীর হতে থাকে ততই বাড়তে থাকে নীরবতা। রীতিমতো গা ছমছমে পরিবেশ। ৩০০ ফুট সড়কে সড়কবাতি থাকলেও পূর্বাচলের ভেতরে রাস্তাগুলোতে কোনো সড়কবাতির ব্যবস্থা নেই। এ কারণে ভেতরের রাস্তাগুলো থাকে নীরব ও সুনসান। আর এ নীরব ও সুনসান জায়গাগুলোই অপরাধীদের অপরাধের পছন্দের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পূর্বাচল উপশহরে ঘটে চলছে একের পর এক অপরাধ। বিশাল এই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পর্যাপ্ত তৎপরতা না থাকায় হত্যা, ছিনতাই, ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধ বেড়েই চলছে। গত আট বছরে পূর্বাচল থেকে হত্যার শিকার হওয়া ১৯ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। বাইরে হত্যার পর লাশ ফেলে যাওয়া হয় পূর্বাচলের নির্জন স্থানে। যে কারণে এলাকাটি ‘লাশের ডাম্পিং পয়েন্ট’ নামে পরিচিতি পাচ্ছে।
রাজধানী উন্নয়ন কর্র্তৃপক্ষের (রাজউক) অধীনে গড়ে ওঠা পূর্বাচলের সিংহভাগ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় পড়লেও গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলারও কিছু অংশ রয়েছে। জমি অধিগ্রহণের পর স্থানীয়দের অনেকেই এলাকা ছেড়ে অন্যত্র বাড়িঘর করেন। ফলে ফাঁকা হয়ে পড়ে পূর্বাচল। তবে কুড়িল বিশ্বরোড-কাঞ্চন ৩০০ ফুট রাস্তা হওয়ার পর থেকে পূর্বাচল একদিকে যেমন জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র হয়ে ওঠে, তেমনি অপরাধীদের জন্য হয়ে উঠেছে অপরাধের ‘স্বর্গরাজ্য’। পূর্বাচলের প্রত্যেকটি এলাকাই দুর্গম। ফলে অপরাধীরা নির্বিঘ্নে তাদের কাজ সারতে এই এলাকা বেছে নিয়েছে। দিনের আলোতে পূর্বাচল উপশহর যত সুন্দর, রাতের বেলায় ঠিক ততটাই ভয়ংকর। রাত যত বাড়তে থাকে, পূর্বাচলে অপরাধীদের আনাগোনাও তত বাড়ে। ঢাকা থেকে দূরত্ব কম হওয়ায় অনেকেই পরিবার-পরিজন ও বন্ধু-বান্ধব নিয়ে, আবার প্রেমিক-প্রেমিকাও ঘুরতে আসেন পূর্বাচল উপশহরে। যাদের অনেককেই ছিনতাইকারী ও ডাকাত দলের কবলে পড়ে সর্বস্ব হারাতে হয়। এ ছাড়া হত্যা, ধর্ষণ ও মাদক কারবারের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড ঘটছে।
পূর্বাচলের বাঘবের এলাকার শাকিল মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভাই, রাইতের বেলা পূর্বাচলের ভেতরের রাস্তাগুলো এতোডাই অন্ধকার থাকে কিছু দেহা যায় না। এই কারণে এইখানে ছিনতাই হয় বেশিরভাগ সময়।’
একই এলাকার কৃষক আজিজ মিয়া বলেন, ‘বাবাগো, রাজউকে আমাগো জমি লইয়া যাওনের পর থেইকা পূর্বাচল আন্ধারই থাকে। কয় দিন পরপর দেহি লাশ পাওয়া যায় পূর্বাচল থেইকা। পুলিশ ঠিকমতো পূর্বাচলের নির্জন এলাকাগুলা দিয়া ঘুরলে আর এইসব অপরাধ অইতো না।’
ভোলানাথপুর এলাকার বাসিন্দা রহুল আমিন বলেন, ‘প্রায় সময় অপরিচিত লোকজনের আনাগোনা দেখা যায়। জিজ্ঞেস করলে প্লট দেখতে আসার কথা বলে। কিন্তু তাদের চালচলনে মনে হয় না প্লট দেখার বিষয়টি সত্য।’
লাশের ডাম্পিং পয়েন্ট পরিচিতি : পূর্বাচলের বিভিন্ন এলাকা থেকে গত আট বছরে হত্যার শিকার ১৯ জনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সর্বশেষ গত ১৩ নভেম্বর সকালে ৫ নম্বর সেক্টরের একটি লেক থেকে জসিম উদ্দিন নামে এক শিল্পপতির লাশের সাতটি টুকরো উদ্ধার করে পুলিশ। পরদিন বিকেলে ১৭ নম্বর সেক্টর থেকে জসিম উদ্দিনের লাশের আরও তিনটি টুকরো উদ্ধার করা হয়। এর আগে গত ২৪ সেপ্টেম্বর ১০ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর ব্রিজের নিচ থেকে কাপড়ে মোড়ানো অবস্থায় মানুষের একটি কঙ্কাল উদ্ধার করা হয়। ২০১৭ সালের ২৪ এপ্রিল ১৩ নম্বর সেক্টরে স্যুটকেসের ভেতর থেকে তরুণীর মরদেহ উদ্ধার হয়। পরের বছর ১৪ সেপ্টেম্বর ১১ নম্বর ব্রিজের নিচ থেকে গুলিবিদ্ধ সোহাগ, শিমুল ও আজাদ নামে তিন যুবকের মরদেহ এবং একই বছর ৭ নভেম্বর ১০ নম্বর সেক্টর থেকে নারীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ২০১৯ সালে ভোলানাথপুরে কাশফুলের ঝোপ থেকে এক তরুণীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই বছরের ১৬ নভেম্বর এক অটোরিকশা চালকের লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০২০ সালের ১২ জানুয়ারি ৮ নম্বর সেক্টর থেকে মজুর উদ্দিন নামে একজনের মরদেহ, ২০২১ সালের ৩ জানুয়ারি ১০ নম্বর সেক্টর থেকে মিলন মিয়ার মরদেহ, একই বছরের ২৩ আগস্ট ৪ নম্বর সেক্টর থেকে সাত মাসের নবজাতকের মরদেহ এবং একই বছরের ৮ অক্টোবর ৭ নম্বর সেক্টর থেকে হৃদয় হাসানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই বছরের ১৬ অক্টোবর ২৬ নম্বর সেক্টর থেকে সাইফুল ইসলাম (২৬) নামে এক ইজিবাইক চালকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরের বছর ১৯ মে ২৫ নম্বর সেক্টর থেকে মজিবুর রহমানের মরদেহ এবং একই বছরের ২৭ ডিসেম্বর অজ্ঞাতপরিচয় যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। গত বছর ৭ জুলাই ১৯ নম্বর সেক্টর থেকে অজ্ঞাতপরিচয় যুবকের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। একই বছরের ২৪ আগস্ট ২০ নম্বর সেক্টর এলাকার একটি সবজিক্ষেত থেকে আবদুল্লাহ আল মামুন নামে এক বিশ^বিদ্যালয় শিক্ষকের লাশ উদ্ধার হয়।
ছিনতাইয়ে সক্রিয় ৭ সিন্ডিকেট : কয়েক সপ্তাহ আগে রাজধানী ঢাকার উত্তরা থেকে পূর্বাচল উপশহরে স্বামীকে নিয়ে ঘুরতে এসেছিলেন ঊর্মি আক্তার। একদল ছিনতাইকারী তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেয়। শুধু ঊর্মি নন, পূর্বাচলে বেড়াতে এসে প্রায়ই ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন পর্যটকরা। গত ২৪ সেপ্টেম্বর সাজ্জাদ নামে এক যুবককে গাড়িতে বিমানবন্দর থেকে উঠিয়ে পূর্বাচলে নিয়ে এসে তার কাছ থেকে ৭ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা ছিনতাই করে নিয়ে যায় একটি চক্র। পূর্বাচলে ছিনতাইয়ে সক্রিয় রয়েছে অন্তত সাতটি সিন্ডিকেট। সিন্ডিকেটগুলোতে মো. সাইফুল ইসলাম, মো. মাহাবুবুর রহমান, মো. ওবায়দুর রহমান এবং ডাকাত সর্দার বাবুসহ অন্তত ৪৫ জন সদস্য রয়েছে বলে জানা গেছে। যাদের কাজ পূর্বাচলে ছিনতাই, ডাকাতি ও হত্যাসহ নানা অপরাধ ঘটানো। ২০১৭ সালের ৩ জুন পূর্বাচল উপশহরের ৫ নম্বর সেক্টরের একটি খাল থেকে ৬১টি চায়না সাবমেশিনগান, সেভেন পয়েন্ট সিক্স টু বোরের পাঁচটি পিস্তল, দুটি রকেট লঞ্চার, ৪২টি হ্যান্ড গ্রেনেড, ৪৯টি মর্টার শেল, দুটি ওয়ারল্যাস সেট, ১৫২৭ রাউন্ড গুলি, ৪৪টি ম্যাগজিন ও ৪৯টি রকেট লঞ্চার প্রজেক্টর উদ্ধার হয়। বিপুলসংখ্যক এই অস্ত্র উদ্ধারের সাত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো রহস্য উদঘাটন করতে পারেননি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
বেপরোয়া ডাকাত দল : সুনসান হওয়ায় পূর্বাচলে ডাকাতির ঘটনাও ঘটছে প্রায়ই। প্রবাসীরা পূর্বাচলের ৩০০ ফুট সড়ক বিমানবন্দরে যাওয়া-আসার জন্য ব্যবহার করেন। ডাকাত দলের টার্গেট থাকে বিমানবন্দরে যাওয়া-আসা করা গাড়ি। গত ৪ সেপ্টেম্বর ৮ নম্বর সেক্টরের গোবিন্দপুর এলাকায় বিল্লাল হোসেন নামে এক শিক্ষকের বাড়িতে ডাকাতি করে স্বর্ণালংকারসহ ২০ লাখ টাকার মালপত্র লুট করে নিয়ে যায় ডাকাত দল। এ ঘটনায় নারীসহ দুজন আহত হন। তার আগে গত ১২ জুলাই রাতে এক প্রবাসীর গাড়িতে ডাকাতির চেষ্টাকালে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পূর্বাচলের পলখান, গোবিন্দপুর, বাগলা, চাপড়ি, ধামচি, মাঝিপাড়া, রঘুরামপুর, গুতিয়াবো, হাড়ারবাড়ী, আলমপুরা, কালুইয়া, খাইসা, পিংনাল, কালনি, সুলপিনাসহ আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা ডাকাত আতঙ্কে থাকেন। স্থানীয়রা মনে করেন, এলাকার নিরাপত্তার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি বাড়াতে হবে, সেই সঙ্গে পূর্বাচলে দ্রুত বসতি গড়ে তুলতে হবে।
পূর্বাচলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মেহেদী ইসলাম বলেন, ‘আমাদের পূর্বাচলের পুলিশ ক্যাম্পটি দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল। সম্প্রতি ক্যাম্পটি চালু করেছি। আমাদের জনবল সংকট রয়েছে। তবুও পূর্বাচলে টহল বাড়ানোর চেষ্টা চালাচ্ছি।’