বগুড়া থেকে ঢাকার কারওয়ানবাজার পণ্য আনতে ১৭ জায়গায় টাকা দিতে হয় বলে জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, কিছু জায়গায় মধ্যস্বত্বভোগী দরকার হলেও কেউ কেউ কিছু না করেই শুধু ফুটপাতে দাঁড়িয়ে চাঁদাবাজি করছে।
গতকাল শনিবার আর্থিক খাতে সংস্কার বিষয়ে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত ‘পলিসি ডায়ালগ অন ফাইন্যান্সিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক রিফর্মস ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অর্থ উপদেষ্টা আর্থিক খাতে এত বড় ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে সেটা বাইরে থেকে কল্পনাও করা যাবে না। এত অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতি পৃথিবীর আর কোথাও হয়নি। আশা করছি এই ক্ষত সারিয়ে তোলা যাবে। তবে কিছুটা সময় লাগবে। দেশের মানুষের কর্মদক্ষতা অতুলনীয়। এই দক্ষতা দিয়ে আগামীতে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। অর্থনীতির এই অবস্থায় উচ্চ সুদে বিদেশ থেকে ঋণ নেবে না অন্তর্বর্তী সরকার। আপাতত আমরা স্বল্পমেয়াদি কিছু সংস্কারে জোর দিয়েছি। মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার করতে হবে পরবর্তী রাজনৈতিক সরকারকে।
এত বিশৃঙ্খলার পরও দেশের যেটুকু উন্নয়ন হয়েছে তাতে কৃষকদের বড় ভূমিকা আছে উল্লেখ করে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, এগ্রিকালচার সায়েন্টিস্টদেরও অবদান অনেক। বৈদেশিক মুদ্রার নিট আয় করছে প্রবাসী বাংলাদেশিরা। বিগত সরকারের অনেক ভুল পলিসি উত্তরাধিকার সূত্রে অন্তর্বর্তী সরকারকে টানতে হচ্ছে। সেগুলো সংস্কার করতে সময় লাগবে। সব সংস্কার আমরা করে যেতে পারব না। আমরা হয়তো জরুরি কিছু প্রাথমিক সংস্কার করব। বাকি সংস্কার রাজনৈতিক সরকার করবে। বাংলাদেশের মানুষের যে দক্ষতা, তা দিয়ে সংস্কার সম্ভব।
মধ্যস্বত্বভোগীদের জন্য বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়ে বলে অভিযোগ রয়েছে। মূল্যস্ফীতি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের বিষয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ে আমরা অস্থির হয়ে যাচ্ছি। আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থায় কিছু ক্রটি আছে। বগুড়া থেকে কারওয়ানবাজার আসতে ১৭ জায়গায় টাকা দিতে হয়। কিছু জায়গায় মধ্যস্বত্বভোগী দরকার হলেও কেউ কেউ কিছু না করেই শুধু ফুটপাথে দাঁড়িয়ে চাঁদাবাজি করছে। যে কারণে আমি চেয়েছিলাম কিছু ডিলার পরিবর্তন করতে। তবে পরিবর্তন করলে আরেক গ্রুপ এসে নাকি চাঁদাবাজি শুরু করবে। এটা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন? তবে এদের সংখ্যা কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
রাজস্ব খাতের পলিসি আর প্রয়োগ আলাদা করার ইঙ্গিত দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের এই উপদেষ্টা বলেন, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই রয়েছে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। অনেক প্রকল্প করা হয়েছে, ফিজিবিলিটি টেস্ট করা হয়নি। শুধু প্রবৃদ্ধি, প্রবৃদ্ধি করা হয়েছে। দেখানো হয়েছে রিজার্ভ বাড়ছে, রপ্তানি বাড়ছে, প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি কম রয়েছে। অর্থনীতিতে শুধু উন্নয়ন দেখানোর যে প্রবণতা, সেই উন্নয়ন কৌশল পরিবর্তন করতে হবে।
দেশ থেকে পাচার করা অর্থ ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে জানিয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ভবিষ্যতে কেউ টাকা পাচার করলে সে প্রাইভেট কিংবা পাবলিক যে সেক্টরই হোক ধরা পড়বে। কেউ লুটপাট করলে শাস্তি পেতেই হবে। যে প্রতিষ্ঠানের প্রধান রাত ৯টা পর্যন্ত একটা অনুমোদন দেওয়ার জন্য বসে থাকে সেই প্রতিষ্ঠান কেমন চলতে পারে ভাবুন। এখন রিজার্ভ থেকে ১ টাকাও বিক্রি না করে বাংলাদেশ ব্যাংক আগের বকেয়া পরিশোধ করছে। অথচ আগের গভর্নর ৪২ বিলিয়ন থেকে ১২ বিলিয়ন ডলার বিক্রি করে দিলেন। এভাবে রিজার্ভ নিঃশেষ করে এখন মহাআনন্দে কোথায় আছেন জানি না।
তিনি বলেন, ‘আমি তিন সরকারের সময়ে গভর্নরের দায়িত্ব পালন শেষে ২০০৯ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক ছেড়েছি। তখন সবাই ফেরেশতা ছিল না। ওই সময়ে খেলাপি ঋণ ছিল ১৮ হাজার কোটি টাকা। এখন তা আড়াই লাখ কোটি টাকা। এই খেলাপি কেন, কাদের জন্য বেড়েছে সেটা সবার জানা।’
ব্যাংক খাত ও শেয়ারবাজারের অবস্থা নিয়ে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, ‘ব্যাংক খাত, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, শেয়ারবাজারে কিছুটা শৃঙ্খলা ফিরতে শুরু করেছে। তবে সংস্কার করতে গেলে কিছু ব্যথা সইতে হবে। অনেক ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না। চিন্তা করেন ব্যাংকগুলোকে কীভাবে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে। সবকিছু সংস্কারের জন্য সময় প্রয়োজন।’
সেমিনারে সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, মাসোহারা দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে লোক রাখা হয়েছিল। তারা টাকা ছাপিয়েছে, ভুয়া রিজার্ভ দেখিয়েছে। ব্যাংক চালানোর মতো যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও এমন ব্যক্তিকে ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা মধ্যম আয়ের ফাঁদে পড়ে আছি। রাষ্ট্রের মেরামত যদি না হয়, দুই পয়সার সংস্কার করে কোনো লাভ হবে না। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনা না গেলে, সংস্কারের পথে এগোনো সম্ভব নয়। বিগত সরকারের আমলে প্রবৃদ্ধির তথ্য ও উপাত্তে মারাত্মক সমস্যা ছিল। তথ্যে রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ ছাড়া প্রবৃদ্ধি দেখানো হয়েছে, যেখানে ট্যাক্স জিডিপি বাড়েনি। ট্যাক্স নেই, বিনিয়োগ নেই আর দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখাতে গিয়ে সামাজিক উন্নয়ন, স্বাস্থ্য-শিক্ষায় গুরুতর অবমূল্যায়ন করা হয়েছে।’
সেমিনারে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ লিমিটেডের (এবিবি) চেয়ারম্যান সেলিম আর এফ হোসাইন বলেন, সরাসরি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় অর্থনৈতিক সেক্টরে লুটপাট হয়েছে। যেখানে ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিবিদরা জড়িত ছিলেন।
বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কমিশনার ফারজানা লালারুখ বলেন, বিএসইসি মার্কেট রিফর্ম করতে চায়। বর্তমান মার্কেটকে উল্লেখযোগ্য জায়গায় নিয়ে যেতে কাজ করছি।