আন্দোলনে নির্দেশদাতা কর্মকর্তা, অস্ত্রের তালিকা প্রকাশ করতে চাইছে না সিএমপি!

বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর যেসব অস্ত্র, গোলাবারুদ ও গ্রেনেড ব্যবহার করেছে গণমাধ্যমে তা প্রকাশ করতে চাইছেন চট্টগ্রাম নগর পুলিশ কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি ছাত্র-জনতার ওপর বলপ্রয়োগে নির্দেশদাতা পুলিশ কর্মকর্তা এবং মাঠ পর্যায়ে ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশনা বাস্তবায়নকারী ইতিমধ্যেই চিহ্নিত হওয়া পুলিশ সদস্যদের তালিকা প্রকাশ করা নিয়েও লুকোচুরি করছে সিএমপি।
 
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণের  নির্দেশদাতা হিসেবে সারাদেশে ১১০ জন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হয়েছে ৫৭ হাজার ৬১৩ রাউন্ড বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রের গুলি। পাশাপাশি আন্দোলনকারীদের দমাতে মাঠে ছোড়া হয়েছে ১ হাজার ৪৭৯টি সাউন্ড গ্রেনেড এবং ছাত্র-জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হয়েছে ১৪ হাজার ২২৩ রাউন্ড। 

জানা যায়, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশের সব ইউনিট আলাদাভাবে পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত করে একটি তালিকা তৈরি করেছে। আজ সোমবার (১৮ নভেম্বর) বিকেলে ওই তালিকা চাইতে গেলে লুকোচুরি খেলায় মেতে উঠেন সিএমপির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা। আন্দোলনে চট্টগ্রাম নগরে কী ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, কত গোলাবারুদ ও গ্রেনেড, টিয়ারশেল খরচ হয়েছে সে বিষয়ে তথ্য চাইলে সিএমপির সিনিয়র কর্মকর্তারা একেকজন একেক কথা বলেন। 

জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে ছাত্র-জনতার ওপর বলপ্রয়োগে নির্দেশদাতা হিসেবে চিহ্নিত করা পুলিশ সদস্যদের তালিকা চাইলে সিএমপির ভারপ্রাপ্ত অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) হুমায়ন কবীর সোমবার বিকেল ৩টায় তার দপ্তরে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এটা সরাসরি পুলিশ সদর দপ্তর দেখছে।’ আন্দোলনে কী ধরনের অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার হয়েছে এবং তা পরিমাণে কত? জানতে চাইলে সিএমপির অন্যতম শীর্ষ এই কর্মকর্তা বলেন, ‘তালিকা দেওয়া যাবে না। আপনি (প্রতিবেদক) লিখে নেন।’ কিছুক্ষণ পর বলেন, ‘আপনি এডিসি পিআরও (জনসংযোগ কর্মকর্তা) কাজী মো. তারেক আজিজের কাছে যান। ব্যক্তিগতভাবে আমি এই তথ্য দিতে পারি না।’ 

এরপর এই প্রতিবেদক যান সিএমপির জনসংযোগ কর্মকর্তা এডিসি কাজী মো. তারেক আজিজের কাছে। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে তথ্য আছে। তবে কমিশনার স্যারের অনুমতি ছাড়া দিতে পারব না।’এরপর অনুমতি নিতে তিনি ছুটে যান পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজের দপ্তরে। ১০ মিনিট পর ফিরে এসে বলেন, ‘ভাই আন্দোলনে কী ধরনের অস্ত্র ও গোলাবারুদ ব্যবহার করা হয়েছে সে বিষয়টি জেলা প্রশাসনের একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত করছেন। তদন্ত এখনো শেষ হয়নি।’ তবে ওই ম্যাজিস্ট্রেটের নাম জানাতে পারেননি তিনি।

একই বিষয়ে সোমবার বিকেল সোয়া ৪টায় সিএমপির উপকমিশনার (অপরাধ) রইছ উদ্দিনকে কল করা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব তথ্য আমার কাছে আছে। তবে কাল (মঙ্গলবার) স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মহোদয় চট্টগ্রামে আসছেন। তাই দৌঁড়ের ওপর আছি। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া আমি তালিকা দিতে পারব না।’

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে নগর পুলিশের ব্যবহার করা অস্ত্র ও গোলাবারুদের তথ্য এবং বলপ্রয়োগে নির্দেশদাতা হিসেবে ইতিমধ্যেই পুলিশ সদর দপ্তর কর্তৃক চিহ্নিত পুলিশ কর্মকর্তাদের তালিকা প্রকাশ করতে লুকোচুরি কেন তা জানতে একাধিকবার মোবাইলে কল করা হলেও ফোন রিসিভ করেননি নগর পুলিশ কমিশনার হাসিব আজিজ।  

চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী আন্দোলন ঘিরে পুলিশ ও দুর্বৃত্তদের ছোড়া গুলিতে নিহত হয়েছেন পাঁচ শিক্ষার্থীসহ ১১জন। ৩৭জন গুলিবিদ্ধসহ, ধারালো অস্ত্রের আঘাত ও মারধরের শিকার ৬৩০জনকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এর মধ্যে ৬৮জন ছাত্র, ২জন দোকানকর্মী, ১১জন চাকরিজীবী। অন্যান্য ৫৪৯জন। নিহত ১১ জনের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৬জন এবং মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয় পাঁচজনকে।

পুলিশ সদর দপ্তরে একটি সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশের সব ইউনিট আলাদাভাবে পুলিশের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত করেছে। আন্দোলনের সময় পুলিশ কী ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র, কত সংখ্যক গুলি, টিয়ারশেল, সাউন্ড  গ্রেনেড ও অন্যান্য অস্ত্র ব্যবহার করেছে সে তথ্য বের করেছে। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে পুলিশের কোন কোন সদস্য অ্যাকশনে ছিল তাদের প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এ ছাড়া মাঠ পর্যায়ের কারা নির্দেশ দিয়েছেন তাদের বিষয়েও তথ্য উদঘাটন করা হয়েছে। ১ হাজার ৭১৭ জন পুলিশ সদস্য অস্বাভাবিক বলপ্রয়োগে জড়িত থাকার তথ্য অনেকটা নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপকমিশনার, অতিরিক্ত উপকমিশনার, সহকারী পুলিশ কমিশনার এবং ওসিসহ ১৮২জন সদস্য রয়েছে বলে একটি গোয়েন্দা সংস্থা সুত্র দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছে।  

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, আন্দোলনে শিক্ষার্থী ও নিরীহ লোকজন, পুলিশ, আনসারসহ ৭৩৫ জন  প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার। পঙ্গুত্ব ও অন্ধত্ব বরণ করেছেন অনেকেই। গুরুতর আহত কয়েকজন চিকিৎসা নিচ্ছেন বিদেশে।