উচ্চ খেলাপি ঋণে খুঁড়িয়ে চলছে দেশের ব্যাংক খাত। আর এই খেলাপির কারণে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রভিশন ঘাটতিও। ভালো এবং মন্দ ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত পরিমাণ প্রভিশন তথা নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে হয় ব্যাংকগুলোকে। তবে ঋণ জালিয়াতি এবং অব্যবস্থাপনাসহ নানা অনিয়মের কারণে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ যে হারে বাড়ছে, একই হারে পরিচালন মুনাফা না বাড়ায় পর্যাপ্ত প্রভিশন রাখতে পারছে না সরকারি ও বেসরকারি খাতের কিছু ব্যাংক। ফলে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাস শেষে দেশের ব্যাংক খাতের প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৫৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোরই প্রভিশন ঘাটতি ৪০ হাজার কোটি টাকা বা ৭২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদন থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোকে পরিচালন মুনাফার শূন্য দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশ সাধারণ ক্যাটাগরির ঋণের বিপরীতে প্রভিশন হিসেবে রাখতে হয়। নিম্নমানের খেলাপি ঋণের বিপরীতে ২০ শতাংশ প্রভিশন এবং ৫০ শতাংশ প্রভিশন রাখতে হয় সন্দেহজনক খেলাপি ঋণের বিপরীতে। এ ছাড়া প্রতিটি ব্যাংকের জন্য মন্দ বা লোকসান ক্যাটাগরির খেলাপি ঋণের বিপরীতে ১০০ ভাগ প্রভিশনিং আলাদা করে রাখার বিধান রয়েছে। প্রভিশন ঘাটতি ব্যাংক খাতের জন্য একটি অশনিসংকেত, কারণ এটি ব্যাংকগুলোর দুর্বল আর্থিক অবস্থার চিত্র তুলে ধরে, যা মূলত উচ্চ খেলাপি ঋণের ফল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে সরকারি, বেসরকারি, বিদেশি ও বিশেষায়িত ব্যাংকের মোট প্রভিশন তথা সঞ্চিতি ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫৫ হাজার ৩৭৮ কোটি টাকা। আর গত জুন শেষে ব্যাংক খাতের প্রভিশন ঘাটতি ছিল ২৪ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসের ব্যবধানে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ৩০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এখন ব্যাংকের যে অবস্থা, তাতে প্রভিশন ঘাটতি আরও বাড়বে। কারণ দিন দিন খেলাপি ঋণ বাড়ছে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয় বেশি বেড়েছে। তাই প্রভিশন ঘাটতি এসব ব্যাংকে বাড়তে থাকবে। এখানে শতভাগ প্রভিশন রাখা দরকার। এখানে একটার সঙ্গে আরেকটা জড়িত। এভাবে প্রভিশন ঘাটতি বাড়তে থাকলে ব্যাংকগুলো দুর্বল হয়ে যাবে। প্রভিশন ঘাটতি কমাতে হলে আগে খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই করে দিতে হবে, যাতে টাকাগুলো আবার ফেরত আসে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন মাসে সঞ্চিতি ঘাটতি সবচেয়ে বেশি বেড়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোয়। জুন শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি ছিল ১১ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। আর সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার ২০৪ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ২৮ হাজার ৭৭৬ কোটি টাকা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিতর্কিত ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানসহ অনেক রাজনৈতিক সুবিধাভোগী ব্যবসায়ীর ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে। এসব ব্যবসায়ী প্রভাব খাটিয়ে সরকারি ব্যাংকগুলো থেকে ঋণের নামে অর্থ লুট করেছেন, যা পরে ফেরত দেননি। এখন অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এসব ঋণ খেলাপি হয়ে পড়েছে।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ৮৪ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা, যা বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশ। এ সময় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ২৬ হাজার ১১১ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ৪০ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
গত জুন শেষে দেশের ব্যাংকব্যবস্থায় খেলাপি ঋণ ছিল ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে, গত তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৭৩ হাজার ৫৮৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা।
প্রতিবেদন বলছে, প্রভিশন ঘাটতিতে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। জুন শেষে বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি ছিল ১৪ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। আর সেপ্টেম্বর শেষে বেসরকারি খাতের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসে প্রভিশন ঘাটতি বেড়েছে ১ হাজার ৭৪৬ কোটি টাকা। গত ৩০ সেপ্টেম্বর শেষে বেসরকারি ব্যাংকগুলোয় খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৯ হাজার ৮০৬ কোটি টাকা, যা বিতরণ করা ঋণের ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
অবশ্য আলোচিত সময়ে বিদেশি ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি কিছুটা কমেছে। চলতি বছরের জুন শেষে বিদেশি ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি ছিল ৪৬৯ কোটি টাকা, যা সেপ্টেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ৪২৩ কোটি টাকা। সেই হিসাবে তিন মাসে বিদেশি ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি কমেছে ৪৬ কোটি টাকা। এ সময়ে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি অপরিবর্তিত রয়েছে। জুন শেষে বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর প্রভিশন ঘাটতি ছিল ২৩৩ কোটি টাকা, যা সেপ্টেম্বর শেষেও একই পরিমাণে রয়েছে।