২০২৩ সালের শেষ দিকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের (আইবিবিএল) ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় দেশ জুড়ে সমালোচনা শুরু হয়। এত সমালোচনার মধ্যেও ডিসেম্বর মাসে নিয়ম না মেনে ব্যাংকটির চট্টগ্রামের তিনটি শাখা থেকে তিন প্রতিষ্ঠানের নামে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ দেওয়া হয়। ওই তিন প্রতিষ্ঠান হলো মেসার্স মুরাদ এন্টারপ্রাইজ, সেঞ্চুরি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড ও ইউনাইটেড সুপার ট্রেডার্স। এর মধ্যে মুরাদ এন্টারপ্রাইজের ১ হাজার ৫৪ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৩ কর্মকর্তাকে তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের উপরিচালক ইয়াসির আরাফাতের স্বাক্ষরিত নোটিসে তাদের তলব করা হয়। নোটিসে ২০ নভেম্বর ছয় এবং ২১ নভেম্বর সাতজনকে দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করতে বলা হয়েছে।
দুদকের তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যাংকটির চট্টগ্রামের চাক্তাই শাখার গ্রাহক মো. গোলাম সরওয়ার চৌধুরীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মেসার্স মুরাদ এন্টারপ্রাইজের নামে ১ হাজার কোটির বেশি ঋণ দেওয়ার অভিযোগ দুদকে জমা হয়। কমিশন অভিযোগটি অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দুদকের উপরিচালক ইয়াসির আরাফাতকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি দল গঠন করে। অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে ঋণ কেলেঙ্কারির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৩ জন কর্মকর্তার নামে তলবি নোটিস পাঠানো হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে পাঠানো নোটিসে ২০ নভেম্বর তলব করা হয় ব্যাংকটির চট্টগ্রাম কার্যালয়ের ব্যাংক পরিদর্শন শাখার উপপরিচালক মো. জুবাইর হোসেন, যুগ্ম পরিচালক সুনির্বান বড়ুয়া, অতিরিক্ত পরিচালক শংকর কান্তি ঘোষ, প্রধান কার্যালয়ের ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগের উপপরিচালক রুবেল চৌধুরী, যুগ্ম পরিচালক অনিক তালুকদার ও অতিরিক্ত পরিচালক ছলিমা বেগমকে। আর ২১ নভেম্বর তলব করা হয় প্রধান কার্যালয়ের পরিচালক মো. সরোয়ার হোসাইন, পরিদর্শন দলের প্রধান ও অতিরিক্ত পরিচালক মো. মঞ্জুর হোসেন, দলের সদস্য উপরিচালক লেনিন আজাদ পলাশ, অতিরিক্ত পরিচালক মো. আব্দুর রউফ, চট্টগ্রাম কার্যালয়ের যুগ্ম পরিচালক সৈয়দ মো. আরিফ-উন-নবী, অতিরিক্ত পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেন এবং অতিরিক্ত পরিচালক মো. শোয়েব চৌধুরীকে।
দুদকের টেবিলে থাকা অভিযোগে বলা হয়েছে, ঋণ জালিয়াতির কারণে আলোচনায় থাকা ইসলামী ব্যাংকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসেও ব্যাপক ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে। নিয়ম না মেনে তিন প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংকটির চট্টগ্রামের তিন শাখা থেকে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ দেওয়া হয়েছে। তিনটি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মেসার্স মুরাদ এন্টারপ্রাইজের নামে ১ হাজার ৫৪ কোটি, ইউনাইটেড সুপার ট্রেডার্সের নামে ১ হাজার ৮৪ কোটি এবং সেঞ্চুরি ফুড প্রোডাক্টসের নামে ১ হাজার ১১৯ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, ঋণ-সংক্রান্ত নথিপত্র অনুযায়ী ব্যাংকটির চট্টগ্রামের চাক্তাই শাখার গ্রাহক মেসার্স মুরাদ এন্টারপ্রাইজের ঠিকানা চট্টগ্রামের ১৫০০/১ আসাদগঞ্জ। এই গ্রাহককে ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর ২৪০ কোটি টাকা, ৭ ডিসেম্বর ১১০ কোটি, ১১ ডিসেম্বর ১৩০ কোটি, ১২ ডিসেম্বর ১২০ কোটি, ১৩ ডিসেম্বর ১৩০ কোটি, ১৪ ডিসেম্বর ১২০ কোটি এবং ১৫ ডিসেম্বর ১১৮ কোটি টাকা দেওয়া হয়। মুনাফাসহ এই ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৫৪ কোটি টাকা দেখানো হয়। এ ছাড়া চট্টগ্রামের জুবিলি রোড শাখার গ্রাহক ইউনাইটেড সুপার ট্রেডার্সের ঠিকানা চট্টগ্রামের কোতোয়ালির ৪০ আসাদগঞ্জ। এই গ্রাহককে ১৮ থেকে ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যে মাত্র ১১ দিনে ৯৫৯ কোটি টাকা দেওয়া হয়। মুনাফাসহ এ ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ করপোরেট শাখার গ্রাহক সেঞ্চুরি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের ঠিকানা হাটহাজারীর ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী। ব্যাংকটির এই গ্রাহককে সব মিলিয়ে ১ হাজার ১১৯ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারি-অক্টোবর সময়ে ঋণ ও ঋণ সুবিধা মিলিয়ে ৫৭৪ কোটি টাকা দেওয়া হয়। আর বাকি টাকা দেওয়া হয় ডিসেম্বরে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে এই ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে। এসব ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। ব্যাংকটি এসব ঋণ দিয়েছে, যখন তারল্যসংকটের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে টাকা ধার করতে হয়েছে। এসব ঋণের সুপারিশকারী, অনুমোদনকারী ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতে ব্যর্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ করপোরেট শাখার গ্রাহক সেঞ্চুরি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড, জুবিলি রোড শাখার গ্রাহক ইউনাইটেড সুপার ট্রেডার্স ও চাক্তাই শাখার গ্রাহক মেসার্স মুরাদ এন্টারপ্রাইজের কাছে ব্যাংকের পাওনা ৩ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। এসব ঋণের মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হওয়ায় বকেয়া ঋণ অবিলম্বে আদায় করতে হবে। আদায় না হলে এসব ঋণকে ক্ষতিকারক মানে অন্তর্ভুক্ত করে খেলাপি হিসেবে দেখাতে হবে। এ ছাড়া এই গ্রাহকদের ঋণ দিতে সুপারিশ, অনুমোদন ও বিনিয়োগের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় জড়িত সব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এসব নির্দেশনা দিয়েছে ব্যাংকটির নির্বাহী কমিটির সভার নথিপত্র পর্যালোচনা করে। ব্যাংকটির এসব ঋণ অনুমোদিত হয় নির্বাহী কমিটির সভায়। ব্যাংকটির নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান মো. সেলিম উদ্দিন।