ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রোপোজাল (ডিপিপি) বা উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের আগেই পেট্রোবাংলার অধীন রাষ্ট্রায়ত্ত দুই প্রতিষ্ঠান সাতটি কূপ খননের দরপত্র আহ্বান করেছে। মূলত ডিপিপি অনুমোদন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে সময় বাঁচাতে দ্রুত গ্যাস অনুসন্ধানে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।
বিশেষজ্ঞরা এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। পাশাপাশি কাজের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও দক্ষতা যাতে নিশ্চিত হয় সেই পরামর্শও দিয়েছেন। সঙ্গে কূপ খননে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বেশি বেশি কাজের সুযোগ দেওয়ারও কথা বলছেন তারা।
ডিপিপি অনুমোদন ছাড়া সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে যে সাতটি গভীর কূপ খননের দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে, এর মধ্যে বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেডের (বিজিএফসিএল) তিনটি গভীর কূপ খনন প্রকল্প রয়েছে। বাকি চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করবে সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড এবং বিজিএফসিএল।
সরকারি অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে সাধারণত পরিকল্পনা কমিশন থেকে ডিপিপি অনুমোদন নিতে হয়। ওই ডিপিপিতে প্রকল্পের ব্যয়, মেয়াদ ও অন্যান্য বিস্তারিত বিষয়গুলো উল্লেখ থাকে। মন্ত্রণালয় থেকে পরিকল্পনা কমিশন ও অন্যান্য দপ্তর হয়ে ডিপিপি অনুমোদন পেতে ছয় মাস থেকে কখনো কখনো আরও বেশি সময় লেগে যায়। এতে প্রকল্প বাস্তবায়নেও সময় বেশি লাগে। মূলত কাজের গুণগত মান এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই এ নিয়ম চলে আসছে। যদিও এরপরও বহু প্রকল্পে বিগত সময়ে নানা অনিয়ম দুর্নীতির চিত্র পাওয়া গেছে।
জানতে চাইলে বিজিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. ফজলুল হকের মোবাইলে গত দুদিনে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তার সাড়া মেলেনি।
তবে প্রতিষ্ঠানটির উপমহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ শামিমুজ্জামান আখন দেশ রূপান্তরকে বলেন, চারটি কূপ খননের জন্য দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এর মধ্যে একটির ডিপিপি অনুমোদন পাওয়া গেছে। বাকি তিনটির অনুমোদনের জন্য ডিপিপি একনেকে আছে। শিগগিরই তিনটি কূপ খননের আশা করছি।
তিনি বলেন, দেশে এখন গ্যাসের সংকট চলছে। সংকট কাটাতে দ্রুত কূপ খনন দরকার। সেজন্যই ডিপিপি অনুমোদন প্রক্রিয়ার পাশাপাশি দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। যাতে সময় কম লাগে। ডিপিপি অনুমোদনের পরই খননকাজের চুক্তি সই হবে। ওই চারটি কূপে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সিলেট গ্যাস ফিল্ডের এক কর্মকর্তা জানান, গ্যাস পাওয়ার বিপুল সম্ভাবনার জায়গা থেকেই তারা চারটি কূপ খননের জন্য দরপত্র আহ্বান করেছেন। একই সঙ্গে প্রকল্পের ডিপিপি তৈরিও করে জমা দিয়েছেন। প্রকল্পের সময় কমিয়ে আনতে সমান্তরালে দুটি কাজ চলছে। শতভাগ স্বচ্ছতার ভিত্তিতেই পুরো কাজ করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কূপ খনন কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন করতে কেসিংয়ের আকার ও গভীরতা নির্বাচন, কেসিং গ্রেড নির্বাচন, ড্রিলিং স্ট্রিং ডিজাইন, ড্রিল মাড ডিজাইন, ড্রিল বিট ডিজাইন, হাইড্রোলিক্স ডিজাইনসহ আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খেয়াল রাখতে হয়। তবেই ড্রিলিং এ শতভাগ সফলতা অর্জন করা সম্ভব।
এ প্রসঙ্গে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, একই সঙ্গে ডিপিপি অনুমোদন এবং দরপত্র প্রক্রিয়ার এ উদ্যোগটি ইতিবাচক। এতে সময়ের অপচয় রোধ হবে। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের জ্বালানি বিভাগের বিভিন্ন দায়িত্বে যারা আছেন তাদের সততা নিয়ে প্রশ্ন নেই। এটা আগের সরকারের আমলে হলে প্রশ্ন থাকত। তবে সততা নিয়ে প্রশ্ন না থাকলেও দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।
এদিকে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডও (বাপেক্স) চারটি কূপ খননের প্রস্তুতি নিয়েছে। এসব কূপ খননের দরপত্র বিজ্ঞপ্তিও তৈরি হয়েছে ইতিমধ্যে।
জানতে চাইলে বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শোয়েব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওই দরপত্র আহ্বানের সময় পেছাবে। কারণ চারটি কূপ খনন প্রকল্পের ডিপিপি একনেকে জমা দেওয়া হয়েছে। অনুমোদনের পরই দরপত্র আহ্বান করা হবে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের সাবেক সদস্য (গ্যাস) মো. মকবুল-ই-ইলাহী চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিপিপি অনুমোদন পাওয়া পর্যন্ত ছয় মাস সময় লেগে যায়। পাশাপাশি দরপত্র প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া ভালো উদ্যোগ। এর আগেও এ ধরনের কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। তবে প্রতিটি কূপের জন্য আলাদা আলাদা দরপত্র আহ্বান না করে একসঙ্গে একাধিক কূপ খননের দরপত্র আহ্বান করলে ব্যয় ও সময় কমে আসার পাশাপাশি লোকবলও কম লাগে। ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোও এতে আগ্রহী হয়।
এ বিষয়ে বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমজাদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ডিপিপি পাস হওয়ার পরই দরপত্র আহ্বান করা উচিত। না হলে বিভিন্ন জটিলতা তৈরির আশঙ্কা তৈরি হয়। তবে বিশেষ প্রয়োজনে মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা কমিশন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতে ডিপিপি অনুমোদন এবং দরপত্র প্রক্রিয়া একই সঙ্গে চালিয়ে নেওয়া যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য কিছু সুবিধাও আছে। যেমন ডিপিপি অনুমোদনের পর দরপত্র আহ্বান করা হলে আগ্রহী ঠিকাদাররা প্রকল্পের বাজেট এবং অনেক সময় গোপনীয় অনেক বিষয় জেনে যায় তখন নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তবে দরপত্র আহ্বান করা হলেও ডিপিপি অনুমোদন ছাড়া ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া যাবে না।
বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা অন্তত ৪০০ কোটি ঘনফুট। বিপরীতে দেশীয় কূপ থেকে উৎপাদিত গ্যাস এবং আমদানি করা উচ্চমূল্যেও এলএনজিসহ গড়ে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। গ্যাসের সংকট কাটাতে সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে পেট্রোবাংলার অধীনে ২০২৮ সালের মধ্যে ১০০টি কূপ খননের পরিকল্পনা রয়েছে।