দলের শাস্তির বিধান বাদ রেখেই ট্রাইব্যুনাল অধ্যাদেশ

মানবতাবিরোধী অপরাধে রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশের বিধান বাদ দিয়েই ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৪’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

খসড়ায় সংরক্ষণের প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) বিচার প্রক্রিয়া অডিও ও ভিডিও ধারণ এবং অন্তর্বর্তী আপিলের সুযোগসহ কমপক্ষে ২০টি ধারায় সংশোধন আনা হয়েছে।

গতকাল বুধবার সচিবালয়ে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অধ্যাদেশের খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেন, ‘আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের সংশোধনী উপদেষ্টা পরিষদের সভায় উত্থাপন করা হয়েছিল, এটা গৃহীত হয়েছে। তবে উপদেষ্টা পরিষদ মনে করেছে, আমরা যে সংশোধন করেছিলাম, সেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধে সংগঠনকে শাস্তি দেওয়ার বিধান ছিল। আমাদের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বলা হয়েছিল, কোনো সংগঠনকে যদি শাস্তি দেওয়া দরকার মনে করে, তাহলে ট্রাইব্যুনাল উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করতে পারবে। আজকের (গতকাল) উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে বলা হয়েছে, আমরা এ বিচারকে অন্য কোনো বিষয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত করতে চাই না। রাজনৈতিক দল বা কোনো সংগঠনকে নিষিদ্ধ করার প্রশ্ন এলে এ আইনকে অযথাই প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ সৃষ্টি হবে। আমরা সেই সুযোগ দিতে চাই না।’

রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে সংবাদ সম্মেলনে আসিফ নজরুল বলেন, ‘আমরা একদম ডিসেন্ট ওয়েতে, ফেয়ার ওয়েতে বিচারটা করতে চাই। এজন্য এই প্রভিশনটা বাতিল করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা অনুভব করেছি, কোনো রাজনৈতিক দল বা অন্য কোনো সংগঠন তাদের অপরাধমূলক কার্যক্রমের জন্য নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন হয় বা দাবি ওঠে সমাজে, তাহলে আমাদের অন্যান্য আইন রয়েছে, সেসব আইনে নিষিদ্ধ করার বিধান রয়েছে। সন্ত্রাস দমন আইন রয়েছে, নির্বাচনী আইন রয়েছে, কাজেই এখানে এ বিধান নেই দেখে আমাদের সেই সুযোগ আর থাকল না, সেটা না। যুদ্ধাপরাধ বিচার আইনে থাকল না, তবে অন্যান্য আইনে রয়েছে। সেটা আমরা রাজনৈতিক ঐকমত্য হলে, জনদাবি এলে পরে বিবেচনা করা হবে।’

উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক শেষে সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে খসড়া অধ্যাদেশের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদ। তিনি বলেন, ‘কিছু কিছু অপরাধের স্থল ঠিক করা ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। এখন বাংলাদেশের বাইরেও যদি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আমলযোগ্য কোনো অপরাধ সংঘটিত হয়, সেগুলোও নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে বিবেচনায় নেওয়া যাবে।’ তিনি বলেন, ‘একটি বিষয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে পাবলিক হিয়ারিং হবে কি না। অনেক সময় দেখা যায়, কেউ কেউ ছবি নিতে চান, কোর্ট প্রসিডিংয়ের ভিডিও-অডিও এগুলো রেকর্ড করতে চান। আমরা মডার্ন হয়েছি, প্রগ্রেসিভ হয়েছি, আলাপ-আলোচনা হয়েছে যে, কোর্টের ডিসকাশনে ছেড়ে দিতে পারি। পরে রেকর্ড হিসেবে সংরক্ষণের জন্য তারা অডিও-ভিডিও রেকর্ডিং করতে পারে। আইনে সেই প্রভিশনটা রাখা হয়েছে।’

আব্দুর রশীদ আরও বলেন, ‘একটা মামলার প্রসিডিং চলছে, এটা চলা অবস্থায় কোনো একটা পয়েন্টে বা ছোট্ট একটা অর্ডারের বিপক্ষে সংক্ষুব্ধ কেউ আপিল করতে চাইতে পারে যে, এ অর্ডারটা বা অংশটুকু আমরা মানি না। সেই অন্তর্র্বর্তী আপিল তারা করতে পারবেন, সেই প্রভিশন অধ্যাদেশে যুক্ত হয়েছে। ৩০ দিনের মধ্যে সেটা নিষ্পত্তি করতে হবে।’ তিনি বলেন, বিচারকাজ পর্যবেক্ষণে বিদেশ থেকে পর্যবেক্ষক আনা যাবে। আগের আইনে এটি ছিল না।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং আন্তর্জাতিক আইনের আওতাধীন অন্যান্য অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারের লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন, ১৯৭৩ প্রণয়ন করা হয়। রোম স্ট্যাটিউট অব দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের সঙ্গে সামঞ্জস্য আনা, আন্তর্জাতিক আইনের প্রচলিত বিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবং এই আইনের বিচারকাজ নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের উত্থাপিত বিভিন্ন সুপারিশের আলোকে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইনের অধিক সংশোধন সমীচীন ও আবশ্যক।

এই প্রেক্ষাপটে আইন ও বিচার বিভাগ আন্তর্জাতিক অপরাধগুলোর সংজ্ঞা যুগোপযোগীকরণ, অপরাধের দায় নির্ধারণ, অডিও ও ভিডিওর মাধ্যমে বিচারকাজ ধারণ এবং সম্প্রচার, বিদেশি কাউন্সেলরের বিধান, বিচারকালে অভিযুক্তের অধিকার, অন্তর্র্বর্তী আপিল, সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা ও প্রাসঙ্গিকতা-সংক্রান্ত বিধান, তদন্তকারী কর্মকর্তা কর্তৃক তল্লাশি এবং জব্দ করার বিধান, পর্যবেক্ষক, সাক্ষীর সুরক্ষা, ভিকটিমের অংশগ্রহণ ও সুরক্ষার বিধান সংযোজন করে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৪’-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়।

বিদ্যুৎ-জ্বালানির বিশেষ বিধান আইন বাতিল : আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে প্রণীত ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’ বাতিল করার চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয় উপদেষ্টা পরিষদের ওই বৈঠকে। আইনটি বাতিল করে অধ্যাদেশ জারির নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়।

এর আগে ৫ আগস্ট শাসনক্ষমতা পরিবর্তনের পর অন্তর্র্বর্তী সরকার এ আইনের অধীনে সব আলোচনা এবং ক্রয় প্রক্রিয়া স্থগিত করেছিল।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে পাঠানো এ-সংক্রান্ত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘আইনের ধারা-৬-এর অধীনে বিদ্যুৎ উৎপাদন চুক্তি সম্পাদন বিষয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে ব্যাপক দুর্নীতি এবং অব্যবস্থাপনা বিষয়ে জনমনে প্রবল বিরূপ ধারণা তৈরি হয়েছে।’

এর আগে এক রিট আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৪ নভেম্বর বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০-এর ৬(২) ও ৯ ধারায় দেওয়া দায়মুক্তি অবৈধ ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করে হাইকোর্ট।

রায়ে আদালত বলে, দায়মুক্তি দিয়ে করা আইন অবৈধ এবং ক্রয়-সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো ব্যক্তির একক ক্ষমতা গণতান্ত্রিক দেশে থাকতে পারে না। এটি সংবিধানের পরিপন্থী।

এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে জনস্বার্থে স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতামূলক পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ক্রয় এবং সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে উপদেষ্টা পরিষদ বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ রহিতকরণের নীতিগত এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে পরে সরকার প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে ওই অধ্যাদেশের খসড়া লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন করা হয়েছে।

১৪ নভেম্বর আদালতের রায়ের পর রিটের পক্ষে থাকা আইনজীবী শাহদীন মালিক সাংবাদিকদের বলেন, বিশেষ বিধান আইনটির ৬-এর ধারায় বলা আছে, জ্বালানিমন্ত্রী তার একক বিবেচনায় কোনো একক ব্যক্তি বা কোম্পানির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে তার সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চুক্তি সই করতে পারবেন। এখানে মন্ত্রীর একক বিবেচনায় যাকে ইচ্ছা, যত টাকায় ইচ্ছা চুক্তি করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

অন্যান্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত : প্রতিবছর ১৮ ডিসেম্বর ‘আন্তর্জাতিক অভিবাসী দিবস’ এবং ৩০ ডিসেম্বর ‘জাতীয় প্রবাসী দিবস’ উদযাপন করা হয়। দিবস দুটি উদযাপনের উদ্দেশ্য একই ধরনের এবং ব্যবধান মাত্র ১২ দিন। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে দিবস দুটি পৃথকভাবে উদযাপনের ফলে অনেক শ্রমঘণ্টা এবং অতিরিক্ত সরকারি অর্থের প্রয়োজন হয়। এসব বিষয় বিবেচনা করে দিবস দুটি একই দিনে অর্থাৎ প্রতিবছর ১৮ ডিসেম্বর উদযাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে।

এ ছাড়া উপদেষ্টা পরিষদ-বৈঠকে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৪’-এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন করা হয়েছে।