দেশের নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কারে একগুচ্ছ সুপারিশ করেছেন দেশের গণমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকরা। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদ ও স্থানীয় সরকার নির্বাচন, ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব নির্বাচন, রাষ্ট্রীয় খরচে নির্বাচনী প্রচারের ব্যবস্থা এবং গণমাধ্যমের প্রবেশাধিকার নিশ্চিতসহ বেশ কিছু সুপারিশ করেছেন তারা। গতকাল বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন ভবনে গণমাধ্যমের সম্পাদক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকদের সঙ্গে নির্বাচন সংস্কার কমিশনের মতবিনিময়ে এসব প্রস্তাব উঠে আসে।
সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমরা খোলামেলা আলোচনা করেছি। ওনারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছেন।
নারীর ক্ষমতায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছেন। তত্ত্বাবধায়ক থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ এই কথা বলেছেন। স্থানীয় নির্বাচনের কথা বলেছেন। প্রবাসীদের কীভাবে সহজে ভোট দিতে পারেন সে বিষয়গুলোও উঠে এসেছে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা যে বিষয়গুলো ভাবছি, যে বিষয়গুলো চিন্তা করছি, ওনারা সেগুলোর ওপর জোর দিয়েছেন। মনে হয় আমরা সঠিক পথেই আছি। ওনারাও আমাদের ব্যাপকভাবে প্রশংসা করেছেন।’
বৈঠক শেষে প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসান বলেন, ‘যিনি যে এলাকার বাসিন্দা, তিনি ওই এলাকার প্রতিনিধিত্ব করবেন। ঢাকা শহরে থেকে খাগড়াছড়ি অথবা দিনাজপুরের প্রতিনিধিত্ব করবেন, এটি আমি মনে করি ন্যায়সংগত নয়। ওই এলাকার ভোটারদের বঞ্চিত করা হয়। দ্বিতীয়ত হচ্ছে, টাকার খেলা বন্ধ করতে হলে রাষ্ট্রীয় খরচে নির্বাচনী প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে। নারী আসনের ব্যাপারে দুটি বিকল্প প্রস্তাব আমরা করেছি, একটি সরাসরি ভোট ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে ১০০ আসনে। অথবা ১০০ যদি নারী আসন হয়, তাহলে তিনটি মিলে একটি নারী আসনে ভোট হবে। যেখানে সরাসরি ভোট হবে। নির্বাচনটি অবশ্যই অন্তর্ভুক্তিমূলক হবে। সব শ্রেণি, পেশা, জাতি, ধর্ম, গোষ্ঠী, দল-নির্বিশেষে সব নাগরিক যাতে তার পছন্দের প্রার্থী বাছাই করতে পারেন, সেটি হচ্ছে আমাদের চাওয়া।’
আজকের পত্রিকা সম্পাদক গোলাম রহমান বলেন, ‘গণমাধ্যমকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে গণমাধ্যমের যে প্রবেশাধিকার, তা নিশ্চিত করার জন্য বলা হয়েছে। গণমাধ্যমের যে ভূমিকা প্রতিটি নির্বাচনে, বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচন দুই ক্ষেত্রেই যে প্রবেশাধিকার, সেটাকে নিশ্চিত করার গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রবাসী যারা ভোট দেবেন, তাদের ভোটের কার্যকারিতা যদি রক্ষা করতে হয়, তাহলে আগে থেকেই কার্যক্রম শুরু করতে হবে।’
দেশ রূপান্তর সম্পাদক মোস্তফা মামুন বলেন, ‘প্রধান নির্বাচন কমিশনার বা নির্বাচন কমিশন গ্রহণযোগ্য হলেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। সেটা করতে এমন ব্যবস্থা করা যেতে পারে যেখানে প্রধানমন্ত্রী ও সংসদের বিরোধী দলের নেতা একমত হয়ে চূড়ান্ত করবেন নির্বাচন কমিশনারদের নাম। যেমনটা হয়ে থাকে ভারত ও পাকিস্তানে। এমন উদাহরণ আরও কিছু দেশেও আছে।’
জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মাসুদ কামাল বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন যতই শক্তিশালী হোক না কেন, আমরা দেখছি যদি কোনো রাজনৈতিক দল সরকারে থাকে, তারা তাদের মতো করে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। আমার প্রস্তাব ছিল, তত্ত্বাবধায়ক সরকার তো আসবেই, তাহলে স্থানীয় সরকারটাও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হবে কি না? ওনারা বলেছেন, তারা এটা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন। আমি মনে করি, স্থানীয় সরকারটাও রাজনৈতিক সরকারের অধীনে না হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা যেতে পারে।’
প্রতিদিনের বাংলাদেশ সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি বলেন, নির্বাচন সংস্কার কমিশন যে প্রস্তাবনা অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে পৌঁছাবে, এর মধ্যে যে প্রস্তাবগুলো অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে যাবে, সেগুলো মিডিয়াতেও প্রকাশ করতে হবে। আমরা বলতে চাই, অন্তর্বর্তী সরকার কতটুকু করল। রাজনৈতিক দলগুলো কতটুকু মেনে নিল, তার চেয়ে বলতে চাই, বদিউল আলম মজুমদার এটা করে গিয়েছেন।
ডেইলি স্টার বাংলার সম্পাদক গোলাম মোর্তোজা বলেন, ‘আগামী নির্বাচন ভালো করতে চাই এবং যদি আগের অভিজ্ঞতা নিতে চাই, তাহলে আগের তিন কমিশনকে সুনির্দিষ্টভাবে প্রধানদের সঙ্গে বসে প্রকৃত তথ্যটা জানতে হবে। এ ছাড়া যেসব গণমাধ্যমের সম্পাদকরা, যারা বলেছিলেন যে নির্বাচন ভালো হয়েছিল, তাদের ডেকে জিজ্ঞেস করেন, কেন তারা বলেছেন যে নির্বাচন ভালো হয়েছে। অর্থাৎ আগে যারা অপকর্মকে বা দুর্বল নির্বাচন বা ভোটারবিহীন নির্বাচন, রাতের ভোটের নির্বাচনকে কেন তারা জাস্টিফাই করেছিলেন। এগুলো তাদের কাছ থেকে জানা দরকার। নির্বাচনী অপরাধের বড় শাস্তি সুপারিশ থাকা দরকার।’
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘আমরা সবকিছু বিবেচনায় নিচ্ছি। এনআইডির ভিত্তিতে যাতে ভোটার তালিকা হয়, সেটাও বিবেচনায় রেখেছি। স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাতে ভোটার হওয়া যায়, আমরা সেসব বিষয়ে বিবেচনা নিচ্ছি। অনেক সুপারিশ আসছে, ব্যতিক্রমধর্মী এমনকি সাংঘর্ষিকও। আমরা সবগুলো বিবেচনায় নিয়ে, আমাদের সর্বোচ্চ বিবেচনা শক্তি ব্যবহার করে আমরা প্রস্তাব করব।’
ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে নারী আসনে নির্বাচনের বিষয়ে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘ওনারা প্রস্তাব দিয়েছেন ১০০ আসনে নারীরা সরাসরি নির্বাচনে নিতে পারেন। এতে সংসদে ৪০০ আসন করতে হবে। লটারির মাধ্যমে প্রথমবার ১০০ আসনে, পরেরবার অন্য ১০০ আসনে, এভাবে চারবারে ৪০০ আসনে নারীরা সরাসরি অংশগ্রহণ করবেন। আর অন্য আসনগুলো নারী ও পুরুষ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, কেরালায় স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এই পদ্ধতি আছে। তবে বাস্তবে সেখানে নারীদের অংশগ্রহণ ছিল অনেক বেশি। আমরা মনে করি, এর মধ্য দিয়ে একঝাঁক নারী নেতৃত্ব গড়ে উঠবে। নারীদের প্রতি যে বঞ্চনা-বৈষম্য সেটার অবসান ঘটে।’
আওয়ামাী লীগ শাসনের সময়কালে যে তিন কমিশন গঠন হয়েছিল, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সাবেক তিন সিইসির বিষয়ে আলোচনা করেছি। নির্বাচনী অপরাধগুলো আবার পর্যালোচনা করছি। নির্বাচনী অপরাধগুলো কীভাবে তাদের ক্ষেত্রে পর্যালোচনা হতে পারে, আর এটা যাতে ভবিষ্যতে না হয়, এটাও পর্যালোচনা করছি। সেই সুপারিশ করার কথাও চিন্তাভাবনা করছে সংস্কার কমিশন।’
বৈঠকে আলোচনা করেন যুগান্তর সম্পাদক সাইফুল আলম, সমকালের সহকারী সম্পাদক সাইফুর রহমান তপন, কালের কণ্ঠ সম্পাদক হাসান হাফিজ, খবরের কাগজ সম্পাদক মোস্তফা কামাল, বাসসের প্রধান সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ, বাংলাদেশ প্রতিদিনের নির্বাহী সম্পাদক মনজুরুল ইসলাম প্রমুখ।