ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের (আইবিবিএল) ১ হাজার ৫৪ কোটি টাকা ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ব্যাংকটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ (এমডি) ১৭ জনকে তলব করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৭ জনকে তলব করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দুদকের উপপরিচালক ইয়াসির আরাফাতের স্বাক্ষরিত নোটিসে ব্যাংক দুটির ৩৪ জনকে তলব করা হয়। নোটিসে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ ১৭ জনকে ২৪ ও ২৫ নভেম্বর এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৭ জনকে আগামী ৮ ও ৯ ডিসেম্বর দুদকের প্রধান কার্যালয়ে হাজির হয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করতে বলা হয়।
দুদকের টেবিলে থাকা অভিযোগে বলা হয়েছে, ঋণ জালিয়াতির কারণে আলোচনায় থাকা ইসলামী ব্যাংকে ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসেও ব্যাপক ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ঘটে। নিয়ম না মেনে তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংকটির চট্টগ্রামের তিন শাখা থেকে ৩ হাজার ২৫৭ কোটি ঋণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে মেসার্স মুরাদ এন্টারপ্রাইজের নামে ১ হাজার ৫৪ কোটি, ইউনাইটেড সুপার ট্রেডার্সের নামে ১ হাজার ৮৪ কোটি এবং সেঞ্চুরি ফুড প্রোডাক্টসের নামে ১ হাজার ১১৯ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। দুদকে এ অভিযোগ জমা হওয়ার পর কমিশন অভিযোগটি অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দুদকের উপপরিচালক ইয়াসির আরাফাতকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি দল গঠন করেন। দুদকের অনুসন্ধান দল অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে ব্যাংকটির চট্টগ্রামের চাক্তাই শাখার গ্রাহক মো. গোলাম সরওয়ার চৌধুরীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মেসার্স মুরাদ এন্টারপ্রাইজের নামে ১ হাজার ৫৪ কোটি টাকা ঋণ কেলেঙ্কারির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৩ জন কর্মকর্তার নামে তলবি নোটিস পাঠায়। নোটিসে তাদের ২০ ও ২১ নভেম্বর হাজির হয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করতে বলা হয়। কিন্তু তারা দুদকে হাজির না হওয়ায় তাদেরসহ ১৭ জনকে আগামী ৮ ও ৯ ডিসেম্বর হাজির হয়ে বক্তব্য উপস্থাপন করতে নোটিস দেওয়া হয়। এর আগে ২৪ ও ২৫ নভেম্বর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান ও এমডিসহ ১৭ জনকে তলব করা হয়।
ইসলামী ব্যাংকের যাদের তলব করা হয়েছে তারা হলেন ব্যাংকটির চেয়ারম্যান আহসানুল আলম, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও সিইও মনিরুল মাওলা, এমডি ও সিইও মো. মাহবুব আলম, পরিচালনা পর্ষদের সদস্য সৈয়দ আবু আসাদ, মো. কামরুল হাসান, প্রফেসর ড. মোহাম্মদ সালেহ জহুর, মো. জয়নুল আবেদন, আবু সাঈদ মো. কাশেম, জামাল মোস্তফা চৌধুরী, প্রফেসর ড. নাজমুল হাসান, প্রফেসর ড. মো. সিরাজুল করিম, প্রফেসর ড. কাজী শহীদুল আলম, প্রফেসর মো. ফসিউল আলম, খুরশীদ-উল-আলম, ডা. তানভীর আহমেদ, প্রফেসর ড. মো. সেলিম উদ্দীন ও স্বতন্ত্র পরিচালক মোহাম্মদ সোলাইমান।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন চট্টগ্রাম কার্যালয়ের ব্যাংক পরিদর্শন শাখার উপপরিচালক মো. জুবাইর হোসেন, খোরশেদ আলম, দেবাশীষ বিশ্বাস, জিয়াউদ্দিন বাবলু, রুবেল চৌধুরী, যুগ্ম পরিচালক সুনির্বান বড়–য়া, অনিক তালুকদার, বেলাল হোসেন, সৈয়দ মো. আরিফ-উন-নবী, অতিরিক্ত পরিচালক ছলিমা বেগম, শংকর কান্তি ঘোষ, মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন, মো. শোয়াইব চৌধুরী। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন পরিচালক মো. সরোয়ার হোসাইন, পরিদর্শন দলের প্রধান অতিরিক্ত পরিচালক মো. মঞ্জুর হোসেন, অতিরিক্ত পরিচালক মো. আব্দুর রউফ ও উপরিচালক লেনিন আজাদ পলাশ।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ইসলামী ব্যাংকের চট্টগ্রামের তিনটি শাখা থেকে ৩ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে মেসার্স মুরাদ এন্টারপ্রাইজের নামে ১ হাজার ৫৪ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে। নথিপত্র অনুযায়ী, ব্যাংকটির চট্টগ্রামের চাক্তাই শাখার গ্রাহক মেসার্স মুরাদ এন্টারপ্রাইজের ঠিকানা চট্টগ্রামের ১৫০০/১ আসাদগঞ্জ। এই গ্রাহককে ২০২৩ সালের ৬ ডিসেম্বর ২৪০ কোটি, ৭ ডিসেম্বর ১১০ কোটি, ১১ ডিসেম্বর ১৩০ কোটি, ১২ ডিসেম্বর ১২০ কোটি, ১৩ ডিসেম্বর ১৩০ কোটি, ১৪ ডিসেম্বর ১২০ কোটি এবং ১৫ ডিসেম্বর ১১৮ কোটি টাকা দেওয়া হয়। মুনাফাসহ এ ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৫৪ কোটি টাকা দেখানো হয়। এ ছাড়া ইউনাইটেড সুপার ট্রেডার্সের নামে ১ হাজার ৮৪ কোটি এবং সেঞ্চুরি ফুড প্রোডাক্টসের নামে ১ হাজার ১১৯ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। চট্টগ্রামের জুবিলি রোড শাখার গ্রাহক ইউনাইটেড সুপার ট্রেডার্সের নামে ২০২৩ সালের ১৮ থেকে ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যে ৯৫৯ কোটি টাকা দেওয়া হয়। মুনাফাসহ প্রতিষ্ঠানটির ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৮৪ কোটি টাকা। আর চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ করপোরেট শাখার গ্রাহক সেঞ্চুরি ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের নামে ১ হাজার ১১৯ কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়। এর মধ্যে জানুয়ারি-অক্টোবর সময়ে ঋণ ও ঋণ সুবিধা মিলিয়ে ৫৭৪ কোটি টাকা দেওয়া হয়। আর বাকি টাকা দেওয়া হয় ডিসেম্বরে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে এ ঋণ জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়ে। এসব ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি। ব্যাংকটি এমন এসব ঋণ দিয়েছে যখন তারল্য সংকটের কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পাশাপাশি বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছ থেকে টাকা ধার করতে হয়েছে। এসব ঋণের সুপারিশকারী, অনুমোদনকারী ও যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিতে ব্যর্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালককে নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপরই এ অভিযোগের অনুসন্ধানে নামে দুদক।