অনিশ্চয়তায় জলবায়ু তহবিল

জাতিসংঘের জলবায়ু সংস্থার সম্মেলন কপ২৯-এর পর্দা নামছে আজ। জলবায়ু পরিবর্তন এবং এর প্রভাব মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে এবারের সম্মেলনের ২৯তম আসর অনুষ্ঠিত হয়। গত ১১ নভেম্বর বাকুর অলিম্পিক স্টেডিয়ামে এই জলবায়ু সম্মেলন শুরু হয়। এবারের সম্মেলনের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল জলবায়ু সংকট সমাধানে দরিদ্র দেশগুলোকে অর্থসহায়তার পথ খুঁজে বের করা। কিন্তু দুই সপ্তাহব্যাপী এই সম্মেলন থেকে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি। গতকাল বৃহস্পতিবার জলবায়ু সংকট নিরসনে অর্থের জোগানবিষয়ক নতুন একটি প্রস্তাব প্রকাশ করা হয়েছে। দরিদ্র দেশগুলোর জন্য জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ধনী দেশের সহায়তার পরিমাণ নির্ধারণের একটি পথ খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে এ প্রস্তাবের মাধ্যমে।

কনফারেন্স অব দ্য পার্টিসের সংক্ষিপ্ত রূপ কপ। এটি বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনসংক্রান্ত বিপর্যয় মোকাবিলায় জাতিসংঘের একটি উদ্যোগ। ১৯৯৫ সালে প্রথম কপ সম্মেলন হয়। ১৯৯৯ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরিওতে অনুষ্ঠিত ধরিত্রী সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুটি প্রথমবারের মতো সামনে আসে। আজ শুক্রবার এবারের সম্মেলন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, বার্ষিক অর্থসহায়তা ও এই অর্থের উৎস কী হবে এরকম গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি। এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের জলবায়ু কূটনীতিক বিশেষজ্ঞ লি শুও বলেছেন, আমরা এখনো সমাধান থেকে অনেক দূরে আছি। নতুন অর্থনৈতিক খসড়া জলবায়ুর মারাত্মক অবস্থা তুলে ধরেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সমঝোতার কোনো সুযোগ নেই। গত সপ্তাহে জাতিসংঘের আলোচনায় অর্থনীতিবিদরা জানিয়েছেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ২০৩০ সালের মধ্যে বছরে অন্তত ১ ট্রিলিয়ন ডলার প্রয়োজন। ১০ পৃষ্ঠার খসড়া নথিতে এসব ইস্যুতে আগে থেকেই বিদ্যমান উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশের বিরোধপূর্ণ অবস্থানগুলো তুলে ধরা হয়েছে। তবে, কোনো পক্ষই বছরে মোট কত অর্থ বরাদ্দ করা হবে, তা নির্ধারণ করতে পারেনি। লি বলেছেন, খসড়াটি নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা উল্লেখ করেনি, যা ভবিষ্যতের জলবায়ু অর্থায়নের পরিমাণ নির্ধারণের জন্য খুবই প্রয়োজন। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ দাতাদেশগুলো জানিয়েছে, তারা অর্থের কাঠামো ও অন্যান্য ইস্যু সুস্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত কতটা অর্থ দেওয়া সম্ভব, তা প্রকাশ করতে চায় না। প্রস্তাবের একটি অংশে বলা হয়েছে, এই অর্থসহায়তা মূলত অনুদান বা অনুদান-সমতুল্য হওয়া উচিত। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বণ্টনকৃত সব অর্থ আনুষ্ঠানিকভাবে এই জলবায়ু অর্থায়নের অংশ হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়। বিশ্ব বর্তমানে জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় তীব্র অর্থ সংকটে ভুগছে। উন্নত দেশগুলো তাদের প্রতিশ্রুত অর্থ দিচ্ছে না। অথচ প্রতি বছরই এই অর্থের চাহিদা বেড়েই চলেছে। ১৯০০ নাগরিক সংগঠনের মোর্চা ক্লাইমেট অ্যাকশন নেটওয়ার্কের তথ্য অনুযায়ী, গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোর কাছে গ্লোবাল নর্থের দেশগুলোর জলবায়ু ঋণের বোঝা ক্রমেই বাড়ছে। উন্নত দেশগুলো জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে বিশ্বব্যাপী যে জলবায়ু বিপর্যয়ের সৃষ্টি করেছে, তার দায় গরিব দেশগুলোকে বহন করতে হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ধনী ও দরিদ্র দেশগুলোর মধ্যে তহবিল নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে। এই তহবিলের প্রকৃতি, পরিমাণ ও উৎস নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ কপ২৯ সম্মেলনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল। ২০২৩ সালে দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত ২৮তম জলবায়ু সম্মেলন ক্রমান্বয়ে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গত এক বছরে এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে তেমন অগ্রগতি দেখা যায়নি। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্ব জুড়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘটনা বাড়ছে। ফলস্বরূপ ২০২৪ সাল হতে যাচ্ছে এই শতাব্দীর সবচেয়ে উষ্ণ বছর। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, প্রাক-শিল্প যুগের চেয়ে এ বছরের বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাবে। প্রাক-শিল্প যুগের চেয়ে বর্তমানে বায়ুম-লে ৫০ শতাংশ বেশি কার্বন অবস্থান করছে। ফলে বৈশি^ক কার্বন নির্গমন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে চলতি বছর।