সাকিবের নকশায় এবার শুরু মিরাজের

আবার ক্যারিবিয়ান, আবার নতুন অধিনায়ক এক অলরাউন্ডার। পার্থক্য সামান্যই। দেড় দশক আগের সেই ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে নিয়মিত অধিনায়ক জ্যামাইকায় পৌঁছে বোলিং করার সময় চোট পেয়ে টেস্ট সিরিজ থেকে ছিটকে গিয়েছিলেন। এবার দেশ থেকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের উদ্দেশে বের হলেও মাঝপথে আরব আমিরাতে ওয়ানডে সিরিজ খেলতে গিয়ে চোট পেয়ে দেশে ফিরেছেন নিয়মিত অধিনায়ক।

২০০৯-এর পর ২০২৪, দুই অলরাউন্ডারের হঠাৎই অধিনায়ক হয়ে ওঠার এই সমাপতন একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেয়, মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার চোটে সাকিব আল হাসানের অধিনায়ক হয়ে ওঠার সেই সিরিজটাই ক্যারিবিয়ানে বাংলাদেশের একমাত্র জয়ের নিশান। এরপর তিনবার ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে গেছে বাংলাদেশ। জয়ের দেখা তো মেলেইনি, বরং ঘাড়ে চেপেছে বিশাল ব্যবধানের হার আর অল্পতেই গুটিয়ে যাওয়ার লজ্জা। এবার বাস্তবতা এমন যে, বড় স্বপ্ন দেখাটাও ভয়ের। নাকি হারাবার কিছু নেই বলেই এবার সাফল্যের সম্ভাবনা জোরালো!

ওয়েস্ট ইন্ডিজের ক্রিকেট বোর্ডের ওয়েবসাইট কিংবা ফেসবুক পাতায় ঢু মারলে মনে হতেই পারে, টেস্ট ম্যাচটা বোধহয় অন্য কোথাও। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ শেষ হয়েছে রবিবার, ঘরোয়া ওয়ানডে প্রতিযোগিতা সিজি কাপের সেমিফাইনাল ও ফাইনাল বাকি। ওয়েবসাইট আর ফেসবুক পাতার বেশিরভাগ ছবি আর কনটেন্টই এসব আয়োজনকে ঘিরে। টেস্ট অধিনায়ক ক্রেইফ ব্র্যাথওয়েটের ছোট্ট একটা ভিডিও আছে, যেখানে তিনি অ্যান্টিগাবাসীকে মাঠে এসে খেলা দেখার আহ্বান জানাচ্ছেন। তবে অ্যান্টিগার পর্যটন মৌসুম শুরু হচ্ছে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়টা থেকে, ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্র থেকে কাতারে কাতারে পর্যটকরা আসবেন এই সময়টায়, আর ঘুরে বেড়াবেন সৈকতে সৈকতে। তাই স্থানীয় ব্যবসায়ী, মাছ ধরার জাহাজের কর্মী, স্কুবা প্রশিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষরা দিনভর খেলা দেখতে মাঠে পড়ে থাকবেন, এমনটা আশা করাটাও বাড়াবাড়ি। তার ওপর খেলাটা যখন টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের পয়েন্ট তালিকার সবচেয়ে নিচের দুটো দলের।

দুই দলের ক্রিকেটাররাই যেখানে টেস্ট খেলতে অনাগ্রহী, তাদের নিয়ে দর্শকের অনাগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক। ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন হলেও ফল একই। দুই দলেরই ব্যাটিংটা চোখের জন্য পীড়াদায়ক। ওয়েস্ট ইন্ডিজের যারাই একটু ভালো ব্যাট করতে পারেন, চার ছক্কা মারতে পারেন তারাই বিভিন্ন ফ্র্যাঞ্চাইজির হয়ে ক্রিকেট খেলাটাকেই বেছে নেন। শিমরন হেটমায়ার, শেই হোপ এমনকি টেস্ট অভিষেকে ডাবল সেঞ্চুরি করা কাইল মেয়ার্সও ওয়েস্ট ইন্ডিজের টেস্ট চুক্তি থেকে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন। কারণ ক্রিকেট ওয়েস্ট ইন্ডিজ কেন্দ্রীয় চুক্তিতে বছরে একজন ক্রিকেটারকে দেয় এক থেকে দেড় লাখ মার্কিন ডলার। ম্যাচ ফি প্রতি টেস্টের জন্য ৫ হাজার ডলার, বছরে ছয়টা টেস্ট ম্যাচ খেললে আয় হবে মাত্র ৩০ হাজার ডলার। মেয়ার্স এসএ ২০ থেকে পেয়েছেন আড়াই লাখ ডলার, তার আইপিএলের সবশেষ মৌসুমের আয় ছিল ৬০ হাজার ডলারের কাছাকাছি। এসব কারণেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেরা ক্রিকেটাররা টেস্ট খেলতে চান না। তাই দলে আসেন পরের স্তরের ক্রিকেটারা, তারাও অবশ্য ফেলনা নন। জাস্টিন গ্রিভস সিজি কাপের সেরা খেলোয়াড়, এই মৌসুমে তিনটি সেঞ্চুরি করেছেন। ব্যাটিংটা দুশ্চিন্তা বাংলাদেশেরও, এবার অবশ্য ব্যাটিং কোচ বদলেছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে ধীরগতির অসমান বাউন্সের উইকেটে খেলতে খেলতে ব্যাটিংটাই বিগড়ে গেছে বাংলাদেশের বেশিরভাগ ব্যাটসম্যানের। সামর্থ্য নেই ভালো মানের বোলিং সামলাবার, কৌশলেও আছে ত্রুটি। তার ওপর এবার মুশফিকুর রহিমের মতো অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান নেই, অবশ্য বিগত সফরগুলোয় তার উপস্থিতিও খুব একটা সুফল বয়ে আনেনি।

তবে দুই দলেরই পেস আক্রমণটা ধারাল। ওয়েস্ট ইন্ডিজের নারকেল গাছ ঝাঁকি দিলে পেসার পড়ে, এমন সব গল্পগাথা শোনা গেলেও মাঝে বেশ শোচনীয় ছিল পেসারদের অবস্থা। হালফিলে শামার জোসেফের আগমন, আলজারি জোসেফ, জেডেন সিলসের সঙ্গে বাংলাদেশের আতঙ্ক কেমার রোচকে নিয়ে দুর্দান্ত পেস আক্রমণ। বাংলাদেশেরও হাসান মাহমুদ, তাসকিন আহমেদ, শরিফুল ইসলাম আর হালের সেনসেশন নাহিদ রানা, এই চারজনকে নিয়ে ক্যারিবিয়ান সফরে একটু আশাবাদী হওয়াই যায়। তবে ভয় ধরাচ্ছে অ্যান্টিগার স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডস স্টেডিয়াম। ক্যারিবীয় কিংবদন্তি ব্যাটসম্যানের নামের এই স্টেডিয়ামে নামলেই বোধহয় হাত-পা কাঁপে বা বুক ধড়ফড় করে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের। এখানে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ অলআউট হয়েছিল ৪৩ রানে! এই মাঠে খেলা দুই টেস্টের চার ইনিংসে বাংলাদেশের রান যথাক্রমে ৪৩, ১৪৪ ও ১০৩ ও ২৪৫। ব্যাটসম্যানরা যদি এত অল্প রানেই গুটিয়ে যান, তাহলে পেসারদের আর কীবা করার থাকে!

ময়দানের ভাষায় বলা হয়, যারা ভালো খেলে, তারাই যেতে। ওয়েস্ট ইন্ডিজ-বাংলাদেশ টেস্ট সিরিজের পূর্বাভাসে বলতে হচ্ছে, যে দলের ব্যাটসম্যানরা কম খারাপ, তাদেরই জয়ের সম্ভাবনা বেশি। এই বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজ এখন পর্যন্ত ঘরের মাঠে খেলেছে দুই টেস্ট, দুটোই দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে। প্রথমটিতে ড্র আর পরেরটিতে হার। এই বছর টেস্টে এখনো আড়াইশ রানও করতে পারেনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ, অলআউট হওয়া তিন ইনিংস যথাক্রমে ২৩৩, ১৪৪ ও ২২২ রানের। তাই নিজেদের সামর্থ্যে না হলেও প্রতিপক্ষের ওপর খানিকটা ভরসা করতেই পারে বাংলাদেশ। তাতে করে মিরাজের হাতে ফের ক্যারিবিয়ানে সিরিজ জয়ও অসম্ভব নয়। কারণ ২০০৯ সালেও তো ক্যারিবীয়রাই এক রকম সিরিজটা তুলে দিয়েছিল বাংলাদেশের হাতে, ধর্মঘটে থাকা শীর্ষ খেলোয়াড়দের বদলে কুড়িয়ে পাওয়া ক্রিকেটারদের নিয়ে দল বানিয়ে!