কোনো এক কালজয়ী মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়ে এসেও প্রধান দুই চরিত্রের প্রভাব কোনো অংশেই কমে না, বরং প্রতিটি পাতা উল্টানোর সাথে সাথে তাঁদের উপস্থিতি আরও বেশি অনবদ্য হয়ে ওঠে—গত দেড় দশক ধরে ফুটবল দুনিয়ায় ঠিক সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায়ে এসেও যেন এক একটি অমর চরিত্রের মতো বিশ্বমঞ্চে রোজ নতুন আখ্যান লিখে চলেছেন এই দুই কিংবদন্তি।
চলমান ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে আর্জেন্টিনার হয়ে শুরু থেকেই মাঠ মাতাচ্ছেন মেসি। এদিকে রোনালদো শুরুটা বেশ সমালোচনার মধ্যে দিয়ে হলেও তার প্রত্যাবর্তনের দারুণ গল্পে এবার প্রশংসা কুড়াচ্ছে সবার। এই দুই মহাতারকার এই রাজকীয় প্রভাব ও দ্যুতি দেখে আর সবার মতো বিস্মিত লিভারপুলের সাবেক বস ইয়ুর্গেন ক্লপও। তার মতে, সম্ভবত নিজেদের শেষ বিশ্বকাপে খেলতে নামা এই দুই তারকার বিদায়ের করুণ সুর নয়, বরং ফুটবলপ্রেমীদের উচিত এই স্বর্ণালী মুহূর্তগুলোকে মন ভরে উদযাপনে রাখা। সঙ্গে তাদের প্রজন্মের ফুটবলের নান্দনিক প্রদর্শনী যেন পরম সৌভাগ্যের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়।
চলতি আসরে ডালাস স্টেডিয়ামে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আলবিসেলেস্তেদের ২-০ ব্যবধানের জয়ের রাতে জোড়া গোল করে বিশ্বমঞ্চে মিরোস্লাভ ক্লোসার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ভেঙে দেন মেসি। বর্তমানে বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোল সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৮-তে। অন্যদিকে, প্রথম ম্যাচে তীব্র সমালোচনার শিকার হওয়া ৪১ বছর বয়সী রোনালদো পরের ম্যাচেই উজবেকিস্তানের বিপক্ষে জোড়া গোল করে জবাব দিয়েছেন নিজের চেনা ছন্দে। একই সাথে প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা ছয়টি বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য ইতিহাস গড়েছেন এই পর্তুগিজ ফরোয়ার্ড।
গাণিতিক সমীকরণের বাইরে গিয়ে এই দুই তারকার অদম্য মানসিকতা ছুঁয়ে গেছে ক্লপকে। একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে এই যুগলবন্দির লড়াইয়ে বুঁদ হয়ে থাকা ক্লপ বিশেষ করে রোনালদোর ঘুরে দাঁড়ানো নিয়ে বলেন, “প্রথম ম্যাচের পর ক্রিশ্চিয়ানোকে নিয়ে যখন চারদিকে সমালোচনা হচ্ছিল, যা আমারও চোখে পড়েছে; সেখান থেকে ৪১ বছর বয়সে এসে এমন এক প্রাণবন্ত ও দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে তার জবাব দেওয়াটা আমাকে ভীষণ আনন্দ দিয়েছে। এই বয়সে এসেও মাঠে কোনো কিছু মনমতো না হলে তিনি যেভাবে বিচলিত হন, তা সত্যিই অসাধারণ।”
তবে রোনালদোর লড়াকু মানসিকতার পাশাপাশি অস্ট্রিয়ার বিপক্ষের ম্যাচের ডাগআউটে লিওনেল মেসির সাথে কাটানো একটি সংক্ষিপ্ত মুহূর্তকে নিজের জীবনের অন্যতম বিশেষ স্মৃতি হিসেবে দেখছেন ৫৯ বছর বয়সী এই জার্মান কোচ। সাবেক শিষ্য আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের সাথে কথা বলার সময় মেসির সেই জাদুকরী উপস্থিতি ক্লপকে নাড়া দিয়েছে দারুণভাবে।
নিজের সেই ভালোলাগার কথা জানিয়ে ক্লপ বলেন, “আমরা যে এই দুর্দান্ত মেসি-রোনালদো প্রজন্মকে একই সাথে দেখার সুযোগ পাচ্ছি, তা এক পরম সৌভাগ্য। ডাগআউটে যখন মেসির সাথে আমাদের সংক্ষিপ্ত দেখা হলো এবং ও অত্যন্ত বিনয়ের সাথে শুভেচ্ছা বিনিময় করল, তখন ৫৯ বছর বয়সে এসেও আমি নতুন করে উপলব্ধি করেছি যে এমন মুহূর্ত কতটা বিশেষ হতে পারে। আমার সাবেক ফুটবলার ম্যাক অ্যালিস্টারের সাথে দেখা হওয়া এবং অল্প কিছু কথা বলতে পেরেও আমি খুব খুশি হয়েছিলাম। তবে এরপর যখন স্বয়ং মেসি সেখানে এলেন—সেটির অনুভূতি ও রোমাঞ্চ ছিল সম্পূর্ণ অন্য স্তরের।”
বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের বাধা পেরিয়ে আর্জেন্টিনা ও পর্তুগাল দুই দলই এখন পরবর্তী রাউন্ডের টিকিট কাটার মিশনে অবিচল। আর বিশ্বজুড়ে কোটি ফুটবল ভক্তের প্রার্থনা, ইতিহাসের পাতা ওল্টানোর এই গল্পটা যেন আরও দীর্ঘ আর রঙিন হয়।