আইসিসির সিদ্ধান্ত মানবে বহুদেশ

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। বৃহস্পতিবার এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। আইসিসি বলছে, ক্ষুধাকে ব্যবহার করে যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের জন্য এই দুজনকে দায়ী করার যৌক্তিকভিত্তি রয়েছে। গাজায় আগ্রাসনের কারণে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে সমালোচনা চলছে দীর্ঘদিন ধরেই। কিন্তু এই প্রথম ইসরায়েলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হলো। আইসিসির এই সিদ্ধান্তে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে নেতানিয়াহু। আন্তর্জাতিক আদালতের এই পদক্ষেপকে ইহুদিবিদ্বেষী বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। একইসঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগকে অযৌক্তিক এবং মিথ্যা উল্লেখ করে তা প্রত্যাখ্যানও করেন নেতানিয়াহু। আর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আইসিসির গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বিশ্ব সম্প্রদায়।

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়ে আইসিসি বলছে, নেতানিয়াহু ও গ্যালান্ট দুজনেরই মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ফৌজদারি দায়বদ্ধতা রয়েছে। যুদ্ধের পদ্ধতি হিসাবে ক্ষুধার ব্যবহার এবং হত্যা, নিপীড়ন এবং অন্যান্য অমানবিক কাজের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিস্তার ঘটিয়েছেন তারা। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছাড়াও হামাসের সামরিক কমান্ডার মোহাম্মদ দেইফের বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আদালত। যদিও গত জুলাইয়ে নিজেদের বিমান হামলায় দেইফের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করে আসছে ইসরায়েল। তবে হামাস এখন পর্যন্ত এই তথ্য নিশ্চিত করেনি।

নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, ইসরায়েল আইসিসির এই অবৈধ সিদ্ধান্ত নাকচ করেছে। নিজের প্রতিক্রিয়ায় গ্যালান্ট বলেছেন, আইসিসি ইসরায়েল রাষ্ট্র এবং হামাসের খুনি নেতাদের একই কাতারে দাঁড় করিয়েছে। তারা হামাসকে খুন, ধর্ষণ আর অপহরণের বৈধতা দিয়ে দিয়েছে। ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট বলেন, হামাসের সঙ্গে সংঘাত মোকাবিলায় নেতানিয়াহুর সমালোচনা করলেও আইসিসির সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত নন তিনি। তবে গাজাবাসী এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেছে অবশেষে পৃথিবী তাদের দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। নেতানিয়াহু ও গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাকে ঐতিহাসিক এবং নজিরবিহীন ঘটনা বলে অভিহিত করেছে হামাস। তবে সংগঠনটির নেতা দেইফের বিষয়ে কোন মন্তব্য করেনি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠনটি।

২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত। আইসিসির প্রতিষ্ঠা চুক্তি রোম সংবিধির আওতায় ১২৪টি দেশ রয়েছে। এসব দেশ আদালতের এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করতে পারবে। আইসিসির নিজস্ব কোনো বাহিনী নেই। ফলে জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর করার জন্য তারা তাদের সদস্যভুক্ত দেশগুলোর ওপর নির্ভর করে। নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত এই আদালতের উদ্দেশ্য ছিল, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং যুদ্ধাপরাধের মতো নৃশংসতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহির আওতায় আনা। ফলে সামনের দিনগুলোতে নেতানিয়াহু ও গ্যালান্টের বিদেশ ভ্রমণের বিষয়টি সংকুচিত হয়ে পড়বে।

এদিকে, নেতানিয়াহু ও গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে বিশ্ব সম্প্রদায়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও ইতালির কর্মকর্তারা আদালতের সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। খোলাখুলিভাবেই নিজেদের ভূখণ্ডে এলে নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছে ইতালি এবং নেদারল্যান্ডস। ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান জোসেপ বোরেল বলেছেন, ইইউ’র সব সদস্য রাষ্ট্রের জন্য আইসিসির সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। তবে এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা নাকচ করে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এটিকে আপত্তিজনক বলে মন্তব্য করেছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। আইসিসির এই পদক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করেছে আর্জেন্টিনা ও হাঙ্গেরি। শুক্রবার হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান বলেছেন, তিনি নেতানিয়াহুকে হাঙ্গেরি সফরে আমন্ত্রণ জানাবেন। আইসিসি জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা হাঙ্গেরিতে মানা হবে না। এমন দৃষ্টান্ত অতীতেও দেখা গেছে।