৩০ ভাগ পানিরই দাম পায় না

উৎপাদিত পানির ৩০ ভাগেরই দাম পাচ্ছে না রাজশাহী ওয়াসা। ওয়াসার ভাষায় এটি কারিগরি অপচয় (সিস্টেম লস) নামে চিহ্নিত। মূলত সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি ওয়াসার অনুমতি ছাড়াই রাস্তা-ভবনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে পানি ব্যবহার করছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বস্তিবাসীদের মধ্যে বিল দিতে অনীহা আছে। এ ছাড়া পাইপ ফেটে যাওয়া বা লিকেজসহ নানা কারণে পানির সিস্টেম লস হয়। এ সিস্টেম লসে গত পাঁচ বছরে ওয়াসা রাজস্ব হারিয়েছে অন্তত ৪১ কোটি টাকা। অবশ্য ওয়াসা কর্র্তৃপক্ষ বলছে, গত কয়েক বছরে এ সিস্টেম লস তারা অনেকটাই কমাতে পেরেছে। আগামীতে এটি আরও কমে আসবে বলে আশা করছেন তারা।

২০১০ সালের যাত্রা শুরু করে রাজশাহী ওয়াসা। নগরীতে প্রতিদিন এখন পানির চাহিদা সাড়ে ১৩ কোটি লিটার। এর বিপরীতে ওয়াসা জোগান দেয় ৯ কোটি ৮০ লাখ লিটার আর প্রতিদিন পানির সিস্টেম লস হচ্ছে প্রায় তিন কোটি লিটার।

রাজশাহী ওয়াসার তথ্যমতে, ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে ওয়াসা যে পরিমাণ পানি উৎপাদন করেছে তার ৩৩ দশমিক ৫০ শতাংশই সিস্টেম লস তথা নন-রেভিনিউ হিসেবে হিসাবভুক্ত করা হয়েছে। এতে রাজস্ব হারিয়ে সংস্থাটির ক্ষতি হয়েছে ৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা। একইভাবে ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩২ দশমিক ৯০ শতাংশ নন-রেভিনিউ পানির ৮ কোটি ৮৮ লাখ ৩৩ হাজার টাকা; ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩১ দশমিক ৪০ শতাংশ নন-রেভিনিউ পানির ৭ কোটি ৫৩ লাখ ৬০ হাজার ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ নন-রেভিনিউ পানির রাজস্ব হারিয়ে ওয়াসার ক্ষতি হয় ৬ কোটি ১২ লাখ টাকা। সর্বশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে নন-রেভিনিউ পানি দেখানো হয়েছে ২৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যাতে প্রতিষ্ঠানটির ক্ষতি ৯ কোটি ৮৭ লাখ ৪২ হাজার টাকা।

ওয়াসা সূত্র জানা যায়, এক ইউনিট বা এক হাজার লিটার পানি উৎপাদন করতে ওয়াসার খরচ হয় ৮ টাকা। ওয়াসার সরবরাহকৃত এক হাজার লিটার সেই পানির দাম আবাসিক পর্যায়ে ৬ এবং বাণিজ্যিক পর্যায়ে তা ১২ টাকা রাখা হয়। নন-রেভিনিউ পানির কারণে প্রচুর টাকা গচ্চা যাচ্ছে।

অভিজ্ঞজনরা বলছেন, সিস্টেম লস কমাতে পুরো রাজশাহীকে ডিস্ট্রিক্ট মিটার এরিয়ার (ডিএমএ) আওতায় আনতে হবে। কেননা, ডিএমএ চালু হলে কত পানি উৎপাদিত হচ্ছে, কতটা ব্যবহৃত হচ্ছে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে সে হিসাব পাওয়া যাবে। এতে দুর্নীতি কমবে।

রাজশাহী ওয়াসার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সোহেল রানা বলেন, রাজশাহী ওয়াসার পানির বিশেষ পরিমাপযোগ্য মানদণ্ড নেই। তবে একটি সঠিক পরিমাপের মাধ্যমে নন-রেভিনিউ ওয়াটার বা সিস্টেম লস নির্ধারণ করা হয়। মূলত সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওয়াসার অনুমতি ছাড়াই রাস্তা-ভবনসহ বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে পানি ব্যবহার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বস্তিবাসীদের মধ্যে বিল দিতে অনীহা, পাইপ ফেটে যাওয়া বা লিকেজসহ নানা কারণে পানির সিস্টেম লস হয়। তাই সিস্টেম লসের স্ট্যান্ডার্ড মাপের মধ্যে (১০ শতাংশ) আনা যাচ্ছে না। তবে এগুলোর পরিমাণ দিন দিন কমছে বলে দাবি করেন তিনি।

রাজশাহী ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাকির হোসেন বলেন, সিস্টেম লস কমানোর লক্ষ্যে ইতিমধ্যে ডিস্ট্রিক্ট মিটার এরিয়ার (ডিএমএ) সিস্টেম চালু করার জন্য মাঠপর্যায়ে সমীক্ষা করা হয়েছে। গোদাগাড়ীতে ওয়াসার পানি শোধনের যে বড় প্রকল্পটি চলছে, সেটার সঙ্গে মার্চ করে ডিপিপি করে এটি করা হবে। ডিএমএ চালু করা সম্ভব হলে সিস্টেম লস কমে যাবে। তিনি বলেন, সিস্টেম লস রোধে এখনো আমরা অভিযান চালাচ্ছি। তবে অবৈধ সংযোগ ব্যবহারকারীদের খুঁজে বের করতে পারছি না। ফলে সিস্টেম লস হচ্ছে। তবে আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে।

জাকির হোসেন বলেন, সিস্টেম লস নানান কারণে হয়। পানি তো উৎপাদন করতেই হচ্ছে। আমরা পাম্প ১৬ ঘণ্টা না চালালে পানির প্রেশার হয় না। আধুনিক সিস্টেমে দিতে না পারার কারণে ম্যানুয়াল সিস্টেমে করতে হচ্ছে। মূলত পাম্প চালু না করলে পানি গ্রাহকের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। এটিও সিস্টেম লসের একটি কারণ।

তিনি বলেন, নানা কারণে অনেকেই আমাদের বৈধ গ্রাহক হতে পারবে না। অনেকে রাস্তার কাজ করছে, যারা ডেভেলপমেন্ট কাজ করছে তারাও পানি ব্যবহার করছে। এখন পানির লাইন নেওয়া এত সহজ যে, যেকোনো একটি মিস্ত্রিকে বললে তিনি এই লাইন দিয়ে দিতে পারেন। এটা দৃষ্টিগোচরে এনে বন্ধ করতে না পারা পর্যন্ত আমাদের সিস্টেম লস হচ্ছে।