গ্যাস পেতে প্রতিমন্ত্রীর বাড়ির সামনে বৃষ্টিতে ভিজেছি

ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শিল্পকারখানায় গ্যাস সংযোগের সীমাহীন দুর্ভোগের চিত্র আর তিক্ত অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বাণিজ্য উপদেষ্টা সেখ বশির উদ্দিন বলেছেন, ‘শিল্পপ্রতিষ্ঠান তৈরিতে অনেক বিনিয়োগের পর গ্যাস সংযোগ পাচ্ছিলাম না। গ্যাস পেতে সাবেক জ্বালানিমন্ত্রীর (প্রতিমন্ত্রীর) কাছে গিয়েছিলাম। ওই সময় ওনার বাসার সামনে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলাম, যেন আমি কোনো চাকরি চাইতে গিয়েছি।’

গতকাল শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে শিল্প খাতে জ্বালানি সংকট নিয়ে বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির এক আলোচনা সভায় উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।

অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বাণিজ্য উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘গ্যাস সংযোগ পাওয়া আমার কাছে মনে হতো ব্যাংকের নিবন্ধন পাওয়ার মতো। যা হোক, বৃষ্টিতে ভিজে বাসার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হয়। এরপর ওনার সঙ্গে বসে অনেক লেকচার শুনেছি। কিন্তু সেসব কথা মানতে পারিনি; নিজের জ্ঞানের সঙ্গে মেলাতে পারিনি। তারপরও চেষ্টা করেছি শুনে যেতে। কারণ, কিছুই করার ছিল না। ব্যবসায়ী হিসেবে ন্যূনতম যে মর্যাদা প্রত্যাশা করি, তা তখন পাইনি। তারপরও জি স্যার, জি স্যার বলতে হয়েছে।’

বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘শিল্পকারখানায় বিনিয়োগের পর গ্যাস পেতে নিজের টাকায় ৪০ কিলোমিটার পাইপলাইন স্থাপন করতে হয়েছে। এই পাইপলাইন নির্মাণে রাস্তা কাটা বাবদ ২০ কোটি ফি দিয়েছি। এর বাইরে আরও অতিরিক্ত অনেক টাকা দিতে হয়েছে আমাকে।’

প্রসঙ্গত, একটা নির্দিষ্ট দূরত্বের বাইরে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে এই ফিস দিতে হয়। তবে অতিরিক্ত এই ফিস নিয়েও ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের আপত্তি রয়েছে।

অনুষ্ঠানে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি জ্বালানি উপদেষ্টাকে এক মিটিংয়ে বলতে শুনেছি যে জ্বালানি খাত দুর্নীতির অন্যতম স্তম্ভ। সেখান থেকে আমাদের বের হতে হবে।’

সেখ বশির উদ্দিন বলেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও জ্বালানি খাতে দেশ নৈরাজ্যের চরম সীমায় পৌঁছেছিল। ওই সময় ব্যবসায়ীদেরও কোনো মর্যাদা ছিল না। তবে এখন সে পরিস্থিতি বদলেছে।

ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘এখন আপনাদের যথাযথ মর্যাদার পরিবেশ রয়েছে। আপনারা এগিয়ে আসুন। সব কাজ সরকার একা করে দিতে পারবে না। নিজেদের টাকা নিজেদের জন্য নিজেরা ব্যয় করুন। অতীতে (প্রভাবশালীদের) এত টাকা দিয়েছি, তার হিসাবও করতে পারব না। এখন আর কাউকে তো টাকা দিতে হবে না। নিজেরাই নিজেদের কাজে ব্যবহার করতে পারবেন। এখন সুযোগ এসেছে, এ সুযোগ ব্যবহার করুন।’

সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দেশ নৈরাজ্যের চরম সীমায় পৌঁছেছিল বলেও মন্তব্য করে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘বিগত সময়ে এ দেশে এমন এক বিচারহীনতা, ক্রনিক্যাপিটালিস্ট (স্বজনতোষী) ও একপেশে পরিবেশের মধ্য দিয়ে আমরা গিয়েছিলাম, যেখানে আমাদের সন্তানদের নিরাপত্তা ছিল না। আমাদের মেপে কথা বলতে হয়েছে, অনিচ্ছা সত্ত্বেও নিজের মস্তিষ্ককে অসম্ভব চাপ দিয়ে (প্রভাবশালীদের) স্তুতি করতে হয়েছে। এমন সব ন্যারেটিভ (বর্ণনা) শুনতে হয়েছে এবং বিশ্বাস করতে হয়েছে, যা শোনার পরে নিজেকে আহত করতে ইচ্ছা হয়েছে। নিজের অর্জিত জ্ঞানকে অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে।’

জ্বালানি খাতকে দুর্নীতির অন্যতম জায়গা উল্লেখ করে বাণিজ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘অন্তর্র্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার পরে কিছু আর্থিক অপরাধী সম্পর্কে জানতে পারছি। এসব জেনে আমার কিছু কিছু মানুষের ব্রেন স্ক্যান করে দেখতে ইচ্ছা করে যে এরা এতটা ক্রিমিনাল কী করে হতে পারে?’

‘জ্বালানি খাতের বর্তমানে যে দুর্বলতা রয়েছে তা কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি পরিকল্পনা (ডিজাইন) করে করা হয়েছে। তবে বর্তমান অন্তর্র্বর্তী সরকারের মধ্যে বাস্তবতাকে অস্বীকার করার প্রবণতা নেই। সুতরাং আমরা বিদ্যমান সমস্যার সম্ভাব্য সমাধানের দিকেও যেতে পারব বলে আশা করছি।’ এ জন্য ব্যবসায়ী মহলের সহযোগিতা চান উপদেষ্টা।

 সেমিনারে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, পাইপলাইন না থাকায় ভোলার গ্যাসক্ষেত্রে আবিষ্কৃত গ্যাস ঢাকায় বা শিল্প এলাকায় আনা যাচ্ছে না। এই গ্যাস সিএনজি ফরম্যাটে আনার জন্য আগামী ডিসেম্বরে দরপত্র আহ্বান করা হবে। এটি আনা গেলে শিল্পে গ্যাসের সংকট কিছুটা হলেও কমবে।

প্রসঙ্গত, মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ভোলায় যে গ্যাস রয়েছে তা পাইপলাইনের মাধ্যমে আনার সুযোগ নেই। কারণ বঙ্গোপসাগরে পাইপলাইন নির্মাণ ব্যয়বহুল। বর্তমানে ইন্ট্রাকো নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ভোলার গ্যাস সিএনজি আকারে রূপান্তর করে বিশেষ বাহনে শিল্পে সরবরাহ করছে। যদিও চুক্তি অনুযায়ী গ্যাস সররবাহ করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি। তাছাড়া ওই চুক্তি নিয়ে অভিযোগের পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে বাড়তি দামে গ্যাস বিক্রিরও অভিযোগ রয়েছে।

অনুষ্ঠানে ফাওজুল কবির বলেন, অন্তর্র্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের ৩ মাসে জ্বালানি খাতে ৩৭০ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। কারণ পরিবেশ ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে আমাদের সেই দিকেই এগিয়ে যেতে হবে। চলতি সপ্তাহে ৪০টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের দরপত্র দেওয়া হবে।

জ্বালানি উপদেষ্টা বলেন, পাবলিক সেক্টরে প্রতিযোগিতার অভাব রয়েছে। টিকে থাকতে হলে ঘুষ বাণিজ্য থেকে বের হতে হবে। সরকারি ক্রয়কে প্রতিযোগিতার মধ্যে আনার প্রয়োজন রয়েছে।

বিগত সরকারের সমালোচনা করে ফাওজুল কবির বলেন, গত ১৫ বছরে বিগত সরকারের মন্ত্রী এবং সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক থাকা নির্দিষ্ট ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর সঙ্গে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের চুক্তিগুলো হয়েছে। এতে এই খাতে সুস্থ ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতাকে ব্যাহত করেছে। যা দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। সেই অবস্থার পরিবর্তন হবে। তিনি বলেন, সরকারের সঙ্গে সখ্য করে আর ব্যবসা হবে না। যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে এই খাতে কাজ করার সুযোগ পাবেন ভালো ব্যবসায়ীরা। এতে বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতে ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা হবে এবং দেশের অর্থনীতিরও প্রবৃদ্ধি হবে।

এখন থেকে রাজনৈতিক বিবেচনায় কিংবা দলীয় সম্পর্কের ভিত্তিতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি খাতে কোনো চুক্তি করা হবে না বলেও আশ্বস্ত করেন তিনি।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জনেন্দ্র নাথ সরকার বলেন, আগামী ৯ ডিসেম্বর অফশোর বিডিং টেন্ডার ওপেন করা হবে। নতুন বছরের শুরুতেই বিশ্বের নাম করা জ্বালানি কোম্পানির সঙ্গে অফশোরের গ্যাস নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারবেন।

জনেন্দ্র নাথ বলেন, ‘পার্বত্য এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস পাওয়ার বিপুল সম্ভাবনা আছে। এসব এলাকার গ্যাস অনুসন্ধানে অনশোর বিডিং ওপেন করার প্রস্তুতি চলছে। আশা করছি আগামী মার্চের মধ্যে অনশোর বিডিং করা সম্ভব হবে।’

বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজের সভাপতিত্বে আয়োজিত সেমিনারে শিল্পে জ্বালানির অভাবে নানা সংকটের কথা তুলে ধরেন নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ী নেতারা। নারায়ণগঞ্জ, সাভার এবং গাজীপুরে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র ঘাটতির বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন তারা।

উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে আনোয়ার-উল-আলম বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে এই বছরের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ২০০টি শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, আরও ৩০০টি কারখানা ঝুঁকিতে রয়েছে।