প্রথম শ্রেণিতে স্নাতক ৩৬ ইঞ্চির আসমা

অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে স্নাতকে প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হলেন ৩৬ ইঞ্চি দৈহিক উচ্চতার সাইকা আসমা সানমুন (২৫)। সম্প্রতি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক সমাপনী বর্ষের ফলাফল প্রকাশিত হলে তার এ সাফল্যের কথা জানাজানি হয়। এরপর সবাই তাকে নিয়ে প্রশংসায় ভাসাচ্ছেন।

আসমা চট্টগ্রাম নগরীর সরকারি মহিলা কলেজের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর মনের জোর থাকলে যে কতদূর যাওয়া যায় তা করে দেখিয়েছেন আসমা। তার সাফল্যে খুশি পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশীসহ কলেজের শিক্ষকরাও।

আসমার বাড়ি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলা পরিষদের পূর্ব পাশে প্রফুল্ল ডাক্তার বাড়িতে। বাবা আবু সালেহ চৌধুরী পেশায় একজন ব্যবসায়ী। মা মাজেদা বেগম তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী। মেয়ের সাফল্যের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওর এই যাত্রা মোটেও সহজ ছিল না। আর পাঁচজনের মতো স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠেনি সে। তার লড়াইয়ে শামিল হতে হয়েছে আমাদের পরিবারের সবাইকে।’

সাইকা আসমা সানমুন বলেন, ‘এই অনার্স ডিগ্রি অর্জনের পেছনে আমার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন আম্মু-আব্বু। তারা আমার বেঁচে থাকার শক্তি। শত প্রতিবন্ধকতাকে উপেক্ষা করে আম্মু-আব্বুর অনুপ্রেরণায় আমার এতদূর আসা সম্ভব হয়েছে।’

আসমা আরও বলেন, ‘জীবিকার তাগিদে আব্বু সঙ্গে থাকতে না পারলেও তার পূর্ণ সমর্থনই আমার শক্তি। আম্মু আমার সঙ্গে সবসময় থাকতেন। কলেজে আসা-যাওয়ায় আমাদের প্রায়ই ১২ ঘণ্টা লেগে যেত। সকাল ৬টায় বের হলে রাত ৯টায় বাসায় ফিরতাম। আমি ক্লাস এবং পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও আম্মু ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমার জন্য বাইরে অপেক্ষা করতেন। আমার সহপাঠীরা আমাকে বলতেন, আন্টি যে তোমাকে নিয়ে এভাবে সারা দিনের জন্য চলে আসেন বাসার কাজ কে করে? আসল বিষয়টা হলো, বাসার সব কাজ শেষ করে আম্মু আমাকে নিয়ে কলেজে আসতেন, আবার বাসায় ফিরে বাকি সব কাজ সারতেন। শত পরিশ্রমের পরও আমার আম্মুর চোখে বিন্দুমাত্র ক্লান্তি ছিল না। আমার এ সাফল্য আমার নয়, আমার আম্মু-আব্বুর।’

আসমা দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘আমাদের মতো শারীরিক প্রতিবন্ধীদের সমাজে নিচু চোখে দেখা হয়। শিক্ষিত মানুষরা এটি আরও বেশি করে। শত কষ্ট সয়ে আমরা যারা শিক্ষিত হয়েছি, সরকার তাদের জন্য চাকরির ব্যবস্থা করুক। যারা শয্যাশায়ী শারীরিক প্রতিবন্ধী আছে তাদের ভাতা দেওয়া হোক। আমি বলছি না যে, আমাকে ক্যাডার হতে হবে, আমার যে সীমাবদ্ধতা আছে তার ভেতরে থেকেই তো কাজ করতে পারি।’

প্রতিবেশী ফারহানা বলেন, ‘আমরা দেখেছি কী পরিমাণ কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে আসমার বাবা-মা তাকে বড় করেছেন। আজ এ পর্যন্ত আসার পেছনে তাদের বড় অবদান। নিজের শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তো আছে, তাকে এ সাফল্য লাভের জন্য অগ্রাহ্য করতে হয়েছে সমাজের নানা রকম প্রতিবন্ধকতাকেও। আমরা অনেক সময় তাকে নিয়ে বের হলে লোকজনকে নানা রকম কটু মন্তব্য করতে দেখেছি। এটা দেখে মানুষ হিসেবে আমরাও লজ্জিত হতাম। আসমা স্নাতক পাস করেছে, এখন আমাদের আশা তার যেন একটা ভালো চাকরি হয়।’