পাবনায় আত্মসমর্পণ করা সাবেক এক চরমপন্থি সদস্য বাকুল মিয়াকে (৪৫) কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। গত রবিবার রাতে জেলার সাঁথিয়া উপজেলার ধুলাউড়ি ইউনিয়নের রাউতি উত্তরপাড়া স্কুলের পাশে এ ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে গত দেড় মাসে জেলায় ঘটেছে আটটি হত্যাকাণ্ড; যার মধ্যে নভেম্বর মাসের ২৫ দিনেই ছয়টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। আর ১৬ নভেম্বর থেকে নয়দিনে খুন হয়েছেন চারজন।
জেলা পুলিশ ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ নভেম্বর পাবনা সদর উপজেলা মৎস্যজীবি দলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক জালাল উদ্দিনকে (৪৫) পিটিয়ে ও ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। পরদিন ১৭ নভেম্বর রাতে পাবনা শহরে তুষার হোসেন (১৬) নামের এক কিশোরকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তারপর দিন ১৮ নভেম্বর সকালে ঈশ্বরদীর রূপপুরে প্রকাশ্যে দিবালোকে ওয়ালিফ হোসেন মানিক (৩৫) নামের এক যুবলীগ কর্মীকে গুলি ও কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
এ ছাড়া গত ৮ নভেম্বর সকালে আতাইকুলা থানার গঙ্গারামপুর এলাকা থেকে আসিফ হোসেন (৩২) নামের মানসিক ভারসাম্যহীন যুবকের গলা কাটা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এর আগে ২৯ অক্টোবর আতাইকুলার ভ্যানচালক রবিউল ইসলাম (৪৫) ও তার আগে ১০ অক্টোবর ঈশ্বরদীতে নয়ন হোসেন (২৮) নামের এক যুবককে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। আলোচ্য সময়ে এসব হত্যাকাণ্ড ছাড়াও বেড়েছে ছিনতাই, সংঘর্ষ, ভাঙচুর, লুটপাট, অপহরণসহ নানা অপরাধ। বেড়েছে কিশোর গ্যাংয়র দৌরাত্ম্য ও মাদক কারবার। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবনতিতে জনমনে ভর করছে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা।
সচেতন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, গত ৫ আগস্টের পর পুলিশ এখনো পুরোপুরি সক্রিয় না থাকার সুযোগে অপরাধ বাড়ছে। পাবনা প্রেস ক্লাব সভাপতি এবিএম ফজলুর রহমান বলেন, ‘৫ আগস্টের পর পুলিশ প্রশাসন এখনো মাঠে পুরোপুরি সক্রিয় না থাকার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। যখন অপরাধীর বিচার হবে না, তখন অন্য অপরাধীরা আরও উৎসাহী হবে। প্রশাসন এখনই লাগাম টেনে না ধরলে আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।’
পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) রেজিনূর রহমান বলেন, পাবনা জেলায় প্রতিমাসে সাধারণত চার থেকে পাঁচটি হত্যা মামলা হয়ে থাকে। চলতি নভেম্বর পাঁচটি হত্যা মামলা হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় সবগুলো মামলার রহস্য উদঘাটন হয়েছে এবং অনেক আসামিকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।
রেজিনূর রহমান আরও বলেন, ‘প্রতিমাসে পাবনা জেলার মামলা পর্যালোচনায় এগুলো স্বাভাবিক একটি বিষয়। এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। পুলিশের ওপর আস্থা রাখুন, ৫ আগস্ট পরবর্তী সঙ্কট কাটিয়ে পুলিশ আরও বেশি সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
তবে বাকুল মিয়ার ওপর যেভাবে হামলা চলানো হয়েছে তাতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন তার স্বজন ও গ্রামবাসী। তিনি জানান, নিহত বাকুল মিয়া উপজেলার রাউতি গ্রামের মো. রওশন আলীর ছেলে। সংসারে তার স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে। বাকুলের ওপর হামলার সময় তার ভাতিজা আলেপ হোসেনকে (২৫) কুপিয়ে আহত করে দুর্বৃত্তরা। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
বাকুলের ছেলে রাসেল মিয়া জানান, ‘চরমপন্থি জীবন থেকে ফিরে পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন আমার আব্বা। তারপর গ্রামে থেকে ঘোড়ার গাড়ি চালিয়ে সংসার চালাতেন। রবিবার রাতে গ্রামের একটি চায়ের দোকানে বসেছিলেন তিনি। এ সময় একই গ্রামের জালাল মাস্টার এসে তাকে জানায় তার ধান নিয়ে বাড়িতে পৌঁছে দিতে। আব্বা ঘোড়ার গাড়িতে ধান নিয়ে জলিল মাস্টারের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে বাড়ি ফেরার পথে কে বা কারা তাকে কুপিয়ে ও গলাকেটে হত্যা করে। আমার এক চাচাতো ভাইকেও কুপিয়ে আহত করেছে। বিষয়টি নিয়ে আমরা উদ্বেগের মধ্যে আছি।’