চিন্ময় দাসকে জামিন না দেওয়ায় আদালতে অনুসারীদের সংঘর্ষ-ভাঙচুর, আইনজীবী নিহত

বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র ও আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) সাবেক নেতা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিন নামঞ্জুর আদেশের পর আজ মঙ্গলবার (২৬ নভেম্বর) আদালত চত্বরে হামলা চালায় তার কয়েক’শ অনুসারী। এ সময় সাইফুল ইসলাম আলিফ নামে এক আইনজীবী নিহত হয়েছেন। তার মাথা ইট দিয়ে থেঁতলে দেওয়া হয়েছে। আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন। 

নিহত ওই আইনজীবী চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি এলাকার জামাল উদ্দিনের ছেলে। ২০১৮ সালে জেলা আইনজীবী সমিতির সদস্য হন। পরে তিনি হাইকোর্টের আইনজীবী হিসেবেও নিবন্ধন পান। সম্প্রতি তিনি চট্টগ্রাম আদালতের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।

গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা আলিফকে মৃত ঘোষণা করেন। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে আদালত ভবনের প্রবেশমুখে রঙ্গম কনভেনশন হলের সামনে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রাম  মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্তব্যরত চিকিৎসক নিবেদিতা ঘোষ বিষয়টি দেশ রূপান্তরকে নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে মঙ্গলবার ১২টায় রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগের মামলায় চট্টগ্রাম ৬ষ্ঠ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট কাজী শরীফুল ইসলামের আদালতে জামিন আবেদন নামঞ্জুর হলে চিন্ময় কৃষ্ণর অনুসারীরা আদালত প্রাঙ্গণে তাকে বহন করা প্রিজন ভ্যান আটকে দিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। অনুসারীরা প্রিজন ভ্যানের আশপাশে অবস্থান নেয়। অনেকে মাটিতে শুয়ে পড়ে।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বোঝানোর পরও সরে না দাঁড়ানোর কারণে বেলা ২টা ৫০ মিনিটের দিকে অনুসারীদের পুলিশ ও বিজিবি লাঠিপেটা শুরু করে। পরপর কয়েকটি সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হয়। এতে ছত্রভঙ্গ হয়ে যায় অবস্থানকারীরা। এরই মধ্যে পুলিশ প্রিজন ভ্যানে করে নিয়ে যেতে চাইলে সেটির চাকার হাওয়া ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে পুলিশের গাড়িতে করে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে চট্টগ্রাম কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।

এদিকে চিন্ময় দাসের অনুসারীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে আদালত চত্বর ত্যাগ করার সময় জেলা পরিষদের সামনে দাঁড়ানো সেনাবাহিনীর জিপ, সরকারি গাড়ি, গণমাধ্যমকর্মীদের মোটরসাইকেলসহ অন্তত ২০টি গাড়ি এবং আদালত চত্বরের বিভিন্ন স্থাপনা ভাঙচুর করে। অনুসারীদের ছোড়া ইটের আঘাতে আহত হন কোতোয়ালি থানার ওসি কাজী রফিক। পুলিশের সঙ্গে চিন্ময় অনুসারীদের সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে রঙ্গম টাওয়ার, লালদিঘি, আন্দরকিল্লা এলাকায়। 

বেলা সাড়ে তিনটার দিকেও তাদের ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করে। এ সময় লালদিঘি, আন্দরকিল্লা ও কোতোয়ালি এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তবে বেলা ১১টা থেকে আদালত প্রাঙ্গণে পুলিশ-বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সদস্য মোতায়েন থাকলেও শুরুতে তাদের হস্তক্ষেপ  দেখা যায়নি।  

এদিকে চিন্ময় অনুসারী কর্তৃক ব্যাপক ভাঙচুরের প্রতিবাদে আইনজীবী ও সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করতে থাকেন। অনুসারীদের ছত্রভঙ্গ করার সময় পুলিশের সঙ্গে যোগ দেন মহল মার্কেট, জেলা পরিষদ মার্কেট, টেরিবাজার এলাকার ব্যবসায়ীরাও। 

নগর পুলিশের উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) হুমায়ুন কবীর বলেন, প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চিন্ময় অনুসারীরা প্রিজন ভ্যান আটকে রাখে। তাদের দাবি, আবার শুনানি হতে হবে। তবে আসামিপক্ষের আবেদন সাপেক্ষে কাল বুধবার (২৭ নভেম্বর) মহানগর দায়রা জজ আদালতে চিন্ময় কৃষ্ণের জামিন শুনানি হবে বলে তিনি জানান।

জানা গেছে, সনাতন ধর্মবিশ্বাসী সংগঠন আন্তর্জাতিক শ্রীকৃষ্ণ ভাবনামৃত সংঘের (ইসকন) আলোচিত সংগঠক ছিলেন চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী। তবে সম্প্রতি সংগঠনটি তাকে বহিষ্কারের ঘোষণা দেয়। চিন্ময় কৃষ্ণ বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র ও চট্টগ্রামের হাটহাজারীর পুন্ডরীক ধামের অধ্যক্ষের দায়িত্বে আছেন। গত ২৫ অক্টোবর চট্টগ্রামের লালদিঘী মাঠে জনসভার পর ৩০ অক্টোবর রাতে তাকেসহ ১৯ জনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালী থানায় রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা করা হয়।

সোমবার (২৫ নভেম্বর) চিন্ময় কৃষ্ণ দাশ ব্রহ্মচারীকে ঢাকা থেকে গোয়েন্দা পুলিশ আটকের পর ওই মামলায় গ্রেপ্তার  দেখানো হয়। মঙ্গলবার সকালে তাকে চট্টগ্রামে এনে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় তার আইনজীবীরা জামিনের আবেদন করেন। তবে আদালত জামিন নামঞ্জুর করে চিন্ময় দাসকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।