অবৈধ ক্রসিংয়ে ইজিবাইকে ট্রেনের ধাক্কা, নিহত ৭

রেলপথের ওপর পড়ে আছে পান, সুপারি, গরুর দুধ ও অটোরিকশার যন্ত্রাংশসহ টুকিটাকি বিভিন্ন জিনিসপত্র। তার সঙ্গে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে মানবদেহের বিচ্ছিন্ন অংশ। বাতাসে লাশের গন্ধ। আশপাশে হাজারো উৎসুক মানুষের ভিড়। এ দৃশ্য গতকাল মঙ্গলবার কুমিল্লার বুড়িচংয়ে অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ে অটোরিকশায় (ইজিবাইক) ট্রেনের ধাক্কায় সাতজন নিহত হওয়ার পরের। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার কালিকাপুর রেলক্রসিংয়ে এ ঘটনা ঘটে।

অবৈধ ওই রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় যাত্রীবাহী অটোরিকশাটির ধাক্কা লাগে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনের সঙ্গে। এতে ঘটনাস্থলেই অটোরিকশার চার যাত্রী নিহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান আহত আরও তিন যাত্রী। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন একজন। ট্রেনে কাটা পড়ে ও ধাক্কায় কয়েকজনের শরীর ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

দুর্ঘটনাস্থলে রেলওয়ের কোনো বৈধ লেভেল ক্রসিং নেই বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের কর্মকর্তারা। ঘটনা তদন্তে রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষ চার সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ের কুমিল্লার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (পথ) মো. লিয়াকত আলী। কুমিল্লা রেলওয়ের সিনিয়র সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসানকে এ কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। এ তদন্ত কমিটিকে সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনের সঙ্গে যাত্রীবাহী অটোরিকশাটির ধাক্কা লাগে। এতে অটোরিকশাটি ১০০ হাত দূরে ছিটকে পড়ে। এ দুর্ঘটনায় আহত দেলোয়ার হোসেন নামে একজন কুমিল্লা ট্রমা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

নিহতরা হলেন বুড়িচংয়ের বাকশিমূল পূর্বপাড়া গ্রামের মনির হেসেনের স্ত্রী শাহিনুর আক্তার (৩৩), মনসুর আলীর ছেলে আলী আহাম্মদ (৭৭), বাকশিমূল উঃপূর্বপাড়া গ্রামের আসমত আলীর ছেলে রফিজ আলী (৬৫), খেদাইধুলি গ্রামের আলী আশরাফের স্ত্রী সফর জান বেগম (৬৫), বাকশিমূল মির্জাপুকুরপাড় গ্রামের আবদুল মালেকের স্ত্রী লুৎফা বেগম (৬০), বাকশিমূল উত্তরপাড়া গ্রামের তৈয়ব আলীর ছেলে শাহজাহান (৪০) ও ফজলু মিয়ার স্ত্রী হোসনে আরা (৬০)।

এলাকার বাসিন্দারা জানান, বাকশিমূল ইউনিয়নসহ আশপাশের এলাকার সব মানুষের উপজেলা সদরে যাওয়ার প্রধান পথে পড়ে অবৈধ রেলক্রসিংটি। অনেক বছর আগে স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে রেললাইনের দুই পাশে মাটি ফেলে যাতায়াতের ব্যবস্থা করেন। তখন থেকে এখন পর্যন্ত এটি অরক্ষিত, অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ।

রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুমিল্লার ওপর দিয়ে যাওয়া রেলপথে আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত ৬১টি ক্রসিং রয়েছে। এর মধ্যে ৩৮টি ক্রসিংই অবৈধ। এসব অবৈধ রেলক্রসিংয়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটিতে গেটম্যান দেওয়া হলেও বাকিগুলো অরক্ষিতই রয়ে গেছে। গত তিন বছরে এসব ক্রসিংয়ে ট্রেনে কাটা পড়ে শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে।

বাকশিমূল গ্রামের বাসিন্দা জয়নাল আবেদিন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার বয়স ৫২ বছর। আমাদের পূর্বপুরুষদের যাতায়াতের পথও ছিল এটি (অবৈধ রেলক্রসিং)। এটি শতবছরের পুরনো পথ। কিন্তু এতদিনেও এখানে কোনো গেটম্যান দেয়নি কর্র্তৃপক্ষ, বিষয়টি দুঃখজনক। গেটম্যান থাকলে এমন দুর্ঘটনা ঘটত না।’

হুমায়ূন কবির নামে গ্রামটি আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষের গাফিলতির ফলে সাতটি তাজা প্রাণ ঝরে গেল। তারা একটু সচেতন হলে, গেটম্যান ও ব্যারিয়ার তৈরি করে দিলে এখানে অন্তত প্রাণহানি হতো না।’

লাকসাম রেলওয়ে থানা পুলিশের ওসি এমরান হোসেন বলেন, ‘ওই রেলক্রসিংটি অবৈধ। তাই সেখানে কোনো গেটম্যান নেই। যার ফলে আজকে (গতকাল) সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।’

এ বিষয়ে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (পথ) মো. লিয়াকত আলী বলেন, ‘দুর্ঘটনার ওই জায়গাটি এলজিইডির। এলজিইডি উদ্যোগ নিলে রেলক্রসিংটি বৈধ করা যেত। আমরা আজকে (গতকাল) সেখানে সতর্কতার জন্য সাইনবোর্ড লাগিয়েছি। সেখানে গেটম্যান এবং ব্যারিয়ার তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হবে।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কুমিল্লা এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মো. আশরাফ জামিল বলেন, ‘জায়গাটি এলজিইডির ঠিক আছে। কিন্তু রেলক্রসিংয়ে গেটম্যান বা ব্যারিয়ার তৈরি করার দায়িত্ব রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষের। কিছুদিন আগে রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষসহ আমরা যৌথভাবে অবৈধ রেলক্রসিংগুলো পরিদর্শন করেছি। একটা সার্ভে করে রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে। রেলওয়ে কর্র্তৃপক্ষ দায় এড়ানোর জন্য এলজিইডির ওপর দোষ চাপালে তো হবে না।’

বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাদিয়া আক্তার বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সরকারিভাবে সহায়তা দেওয়া হবে।