পটুয়াখালীতে আন্ধারমানিক নদে আট কিলোমিটারের মধ্যে তিনটি সেতু নির্মাণে বাধাগ্রস্ত হয়েছে এর পানিপ্রবাহ, জমছে পলির আস্তরণ। ধ্বংসের মুখে পড়েছে ইলিশসহ ৪৫০ প্রজাতির জীববৈচিত্র্যের বিশাল অভয়াশ্রম। আর সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতায় অল্প জায়গার মধ্যে তিনটি সেতুর কারণে সরকারি অতিরিক্ত ব্যয় বড়েছে প্রায় ৯৫০ কোটি টাকা।
পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় আন্ধারমানিক নদে পটুয়াখালী-কুয়াকাটা মহাসড়কের সলিমপুর-নাচনাপাড়া এলাকায় ২০১১ সালে ৬৫ কোটি ১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা ব্যয়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর নির্মাণ করেছে শেখ কামাল সেতু। ১৯টি স্প্যানসহ এ সেতুর দৈর্ঘ্য ৮৯১.৭৬ কিলোমিটার এবং প্রস্থ ১০ মিটার। সেতুর দুই প্রান্তে রয়েছে মোট ৫৫৫ মিটার সংযোগ সড়ক। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আরবিএল ও এমবিএল যৌথভাবে এ সেতুর নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে।
এ সেতুর মাত্র পাঁচ কিলোমিটার দূরে নদের বালিয়াতলী পয়েন্টে ১২০ কোটি ব্যয়ে স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর নির্মাণ করেছে সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতু। ১৩টি স্প্যানের ওপর ফুটপাতসহ ৯.৮ মিটার প্রস্থ ও ৬৭৭ মিটার দৈর্ঘ্যরে এ সেতুটি বিকল্প পথে কুয়াকাটা সৈকতে যাওয়ার জন্য নির্মাণ করা হয়।
আর নজরুল ইসলাম সেতুর ঠিক তিন কিলোমিটার দূরত্বে পায়রা বন্দরের পাশে আন্ধারমানিক নদের ওপর ৯৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে পায়রা সমুদ্রবন্দর কর্র্তৃপক্ষ শুরু করছে চার লেনের এক্সট্রা ডোজ কেবল সেতুর নির্মাণকাজ। বন্দরের ছয় লেন সড়কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন, ঢাকা-কুয়াকাটা মহাসড়কের সঙ্গে পায়রাবন্দরের সরাসরি সংযোগ স্থাপন এবং বন্দরের আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম দ্রুত ও সহজতর করতে বন্দর কর্র্তৃপক্ষ এ সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ব্রিজ কনস্টাকশন গ্রুপ এবং চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন এ সেতুর নির্মাণকাজ করছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১২ সালে কলাপাড়ায় আন্ধারমানিক ও রাবনাবাদ নদের তীরে পায়রা সমুদ্রবন্দর এবং বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ার পরিকল্পনা গ্রহণ করে সরকার। এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বন্দর ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভারী যন্ত্রপাতি পরিবহনের জন্য একটি সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। একই সময়ে স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) বালিয়াতলী পয়েন্টে ১২০ কোটি ব্যয়ে কুয়াকাটাগামী বিকল্প সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নেয়। পায়রা বন্দর কর্র্তৃপক্ষ তখন ৪০ টন ক্ষমতার কনটেইনার বহন সক্ষমতা উপযোগী সেতু নির্মাণের জন্য অনুরোধ জানায় এলজিইডিকে। অভিযোগ রয়েছে, এলজিইডি কৌশলে এ প্রস্তাবনা এড়িয়ে যায়।
প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুটি ভারী যন্ত্রপাতি চলাচলের উপযোগী করে তৈরি করা হলে নতুন করে আরেকটি সেতু নির্মাণের প্রয়োজন হতো না। তাতে করে সরকারের গচ্চা যেত না ৯৫০ কোটি টাকা। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর এমন সমন্বয়হীনতায় নদ হারাচ্ছে নাব্য, ধ্বংস হচ্ছে মাছের অভয়াশ্রম, জীবিকা হারাতে বসেছেন অন্তত এক হাজার জেলে, দিতে হচ্ছে সরকারকে অর্থনৈতিক গচ্চা। এমন অভিমত পরিবেশ আন্দোলনকর্মীদের।
তবে এলজিইডি কর্মকর্তাদের দাবি, গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগের জন্য সেতু নির্মাণ করেছে সংস্থাটি। এসব সেতু দিয়ে সর্বোচ্চ ২০ টন পরিবহন সক্ষমতার যানবাহন চলতে পারে। বন্দর কর্র্তৃপক্ষ যখন তাদের অনুরোধ করেছিল, তার অনেক আগেই সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা হয়ে যায়। তখন আর কিছু করার ছিল না।
সরেজমিন দেখা যায়, একই নদীর আট কিলোমিটারে পরপর তিনটি সেতু নির্মাণে নদের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে পলির আস্তরণ জমে ইতিমধ্যে কমেছে নদের প্রস্থতা। অনেক জায়গায় জেগে উঠেছে ছোট-বড় চর। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে প্রায় ৪৫০ প্রজাতির মাছ এবং সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের ৪০ কিলোমিটর দীর্ঘ এ অভয়াশ্রম। অন্যদিকে জীবিকা নিয়ে চরম সংকটে পড়েছে প্রায় এক হাজার জেলে পরিবার।
আন্ধারমানিক নদকে উপজীব্য করে জীবিকা নির্বাহ করা জেলে মনির, মানিক, সেরাজসহ আরও কয়েকজন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরে লতাচাপলী এলাকায় বঙ্গোপসাগরের মোহনায় জেগে ওঠে বিশাল চর। দিন দিন বাড়ছে এ চরের বিশালতা। আর এতে করে সাগর থেকে মাছের অবাধ প্রবেশ হচ্ছে বাধাগ্রস্ত। নদীতে কমতে শুরু করে মাছের আনাগোনা। এরপর আবার দুটি সেতু নির্মাণের নেতিবাচক প্রভাবে একসময়ের প্রমত্তা আন্ধারমানিক নদ জৌলুস হারাচ্ছে। সারা দিন জাল ফেলে চাল কেনার পয়সা মেলে না জেলেদের। ইলিশের জন্য পরিচিতি থাকলেও গত চার বছরে কোনো ইলিশ ধরা পরেনি। মোহনায় জেগে ওঠা চরের ড্রেজিংয়ের দাবি জানান তারা।
ইলিশসহ স্বাদু পানির মাছের অভয়াশ্রম আন্ধারমানিক নদের নাব্য, পানিপ্রবাহ ও মাছের স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়ে পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনকর্মী কমরেড নাসির তালুকদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সারা বিশ্ব যখন নদী রক্ষায় নানা উদ্যোগ নিচ্ছে, কৃত্রিম নতুন নদী তৈরি করছে, সেখানে আমরা প্রতিনিয়ত রাষ্ট্রীয়ভাবে নদী হত্যার উৎসব করছি। স্বাধীন নদী কমিশন থাকলেও তাদের নির্দেশনা মানছে না কেউই।’
তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের নির্দেশনা রয়েছে, একই নদীতে একাধিক সেতু নির্মাণ না করতে। সেতু তৈরি করে নদীর পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত না করতে। নদী ও খালের নৌযান চলাচলসহ পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত না হয়, সেজন্য সেতুর উচ্চতা নিশ্চিত করারও নির্দেশ রয়েছে। অথচ কোনো দপ্তরই সরকারের এমন নির্দেশনা মানছে না।’
নতুন সেতু নির্মাণের বিষয়ে জানতে চাইলে পায়রা বন্দরের ট্রাফিক বিভাগের উপপরিচালক আজিজুর রহমান বলেন, ‘আন্ধারমানিক নদের নাব্য এবং সার্বক্ষণিক জাহাজ ও লঞ্চ চলাচলের কথা বিবেচনা করে সেতুটি মাত্র দুটি পিলার স্থাপনের মাধ্যমে নির্মাণ করা হবে।’
যদিও এ সেতু নির্মাণে মৎস্য অধিদপ্তর বা নদীরক্ষা কমিশনের অনুমতি কিংবা পরামর্শ নেওয়া হয়নি। নেওয়া হয়নি পানিপ্রবাহ কিংবা নাব্য রক্ষার দীর্ঘ বা স্বল্পমেয়াদি কোনো পরিকল্পনা। এমন তথ্য তুলে ধরে কলাপাড়ার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অপু সাহা বলেন, ‘কোনো নদী কিংবা খালে সেতু নির্মাণের আগে নদীরক্ষা কমিশনের পাশাপাশি মৎস্য অধিদপ্তরের মতামতসহ অনাপত্তিপত্র নেওয়া উচিত। মৎস্য সম্পদসহ নদীরক্ষায় এর কোনো বিকল্প নেই।’