দ্বিগুণ দামে আলুবীজ বিক্রি

দেশের অন্যতম শীর্ষ আলু উৎপাদনকারী জেলা মুন্সীগঞ্জে বীজ আলুর দাম আকাশচুম্বী। রাজধানীর কাছের এ জেলায় অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে চলতি মৌসুমে সর্বোচ্চ দামে বিক্রি হচ্ছে বীজ আলু। আমদানিকারকের কাছ থেকে ডিলারের হাত হয়ে কৃষক পর্যায়ে পৌঁছতেই এর দাম হাতের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ডিলারদের অভিযোগ, এবার বাক্স বীজ আলুর সংকট রয়েছে। কিন্তু তারা বিক্রয় রশিদে দাম কম দেখিয়ে কৃষকের কাছ থেকে নিচ্ছেন চড়া দাম। আবার কোনো ডিলার রশিদ ছাড়াই বাক্স বীজ আলু বিক্রি করছেন। ডিলারদের কারসাজিতে সাড়ে ১১ হাজার টাকার এক বাক্স বীজ আলু কৃষকের কাছে বিক্রি হচ্ছে ২৬ হাজার টাকায়। অথচ গত বছর বাক্সপ্রতি বিদেশি বীজ আলু বিক্রি হয়েছে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকায়। 

কথা বলে জানা গেছে, এ জেলার কৃষকদের বিএডিসি ও হিমাগারে সংরক্ষিত বীজ আলুর প্রতি আগ্রহ নেই। বছরের পর বছর ধরে এখানকার কৃষক বিদেশি তথা বিশেষ করে হল্যান্ডের বাক্স বীজ আলু আবাদ করে আসছেন। বরাবরের মতো এবারও আলু আবাদে বাক্স বীজের প্রতি কৃষকের বাড়তি ঝোঁক দেখা গেছে। কৃষকের এমন মানসিক ঝোঁকের কারণেই বাক্স বীজ আলু বিক্রিতে চড়া দাম হাঁকাতে সুযোগ পাচ্ছেন ডিলাররা।

এদিকে, ডিলারের কাছ থেকে বাক্স বীজ আলু কিনে বাড়ি ফিরছিলেন জেলার টঙ্গীবাড়ি উপজেলার কৃষক আলমাস শেখ। এ সময় কথা হলে ওই কৃষক জানান, টঙ্গীবাড়ি বাজারের মেসার্স মাহিন এন্টারপ্রাইজ থেকে হল্যান্ডের আটটি বাক্স বীজ আলু কিনেছেন। বাক্স প্রতি তার কেনা পড়েছে ২৬ হাজার টাকা। তবে তার হাতে থাকা বিক্রয় রশিদ দেখতেই চোখ ছানাবড়া। সেখানে একেক বাক্স বীজ আলুর দাম সাড়ে ১৩ হাজার টাকার কথা উল্লেখ রয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে কৃষক আলমাস শেখ বলেন, ‘আমি মূর্খ মানুষ। লেখাপড়া করি নাই। রশিদে কত দাম লিখেছে, তা জানি না। আমি ২৬ হাজার টাকা দিয়েই একেক বাক্স বীজ আলু কিনেছি। এটাই সত্যি।’ তবে মেসার্স মাহিন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আলমগীর কবীর বিক্রয় রশিদে কম দাম উল্লেখ করার কথা অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমি ১৪ হাজার থেকে ১৫ হাজার করে বাক্স প্রতি বীজ আলু বিক্রি করছি।’

জেলার টঙ্গীবাড়ি উপজেলার ধামারন গ্রামের আলু চাষি মামুন শেখ বলেন, ‘এ বছর বাক্স বীজ আলু আগাম বিক্রি হয়েছে ১৬ হাজার থেকে ১৮ হাজার টাকা করে। আর এখনতো দাম আরও বেড়েছে। বিএডিসির বীজ আলুর দাম কেজিপ্রতি ৫৭ টাকা নির্ধারণ করা হলেও তা বাজারে পাওয়া যাচ্ছে না। ব্র্যাক, কিষাণ সিডসহ কিছু কোম্পানির বীজ আলু বাজারে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।’ 

বীজ আলু আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান অরিত্র এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী রনি শেখ জানিয়েছেন, এ জেলায় ৪ থেকে ৫ জন বাক্স বীজ আলু আমদানি করে থাকে। টঙ্গীবাড়ি উপজেলার সোনারং গ্রামের এ আমদানিকারক বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ সাড়ে ১১ হাজার টাকা দরে বাক্স প্রতি বীজ বিক্রি করেছি ডিলারদের কাছে। এখন কৃষক পর্যায়ে সেই বীজ আলু অতিরিক্ত দাম বিক্রি করছে বলে শুনেছি। আমরা আলু আমদানির জন্য যখন এলসি করি, তখন অল্প পরিমাণ লাভে ডিলারদের কাছে বীজ আলু বিক্রি করে দেই। পরে অবশ্যই ডিলাররা কারসাজি করে দাম বাড়ান।’

এ প্রসঙ্গে জেলার টঙ্গীবাড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘সম্প্রতি বীজ আলুর ডিলারদের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে। সেখানে কৃষকের কাছে প্রতি বাক্স হল্যান্ডের বীজ আলু ১৫ হাজার টাকা করে বিক্রি করার কথা জানিয়েছেন ডিলাররা। তারপরও তারা বেশি মূল্যে বীজ আলু বিক্রি করে থাকেন, সেক্ষেত্রে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

জেলা কৃষি সম্পসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বিপ্লব কুমার মোহন্ত জানান, চলতি বছর এ জেলায় ৩৪ হাজার ৫৫৫ হেক্টর জমিতে আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বীজ আলুর চাহিদা রয়েছে ৭৬ হাজার টন। এর মধ্যে জেলার ৫৮টি হিমাগারে ৪৪ হাজার টন বীজ আলু মজুদ রয়েছে। তিনি বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এ বছর অর্ধেক বাক্স আলু আমদানি হয়েছে। তাই হয়তো দাম একটু বেশি। তবে আমরা প্রতিদিন বীজ আলুর দাম মনিটরিং করছি। এ ছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের টিম কাজ করছে।’

জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সামির হোসাইন সিয়াম বলেন, ‘জেলায় খুচরা পর্যায়ে কতজন ডিলার আছে, সেই তালিকা জানা নেই। আর এ জেলায় তিনটি আমদানিকারক এজেন্ট রয়েছে। এর মধ্যে এয়ার মালিক এজেন্টের আলু জেলায় এসেছে। বাকি দুটি এজেন্টের আলু এখনো আসেনি। তাদের বাক্স আলু আমদানির হিসাব বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে রয়েছে।’