কথার আঘাতে মানুষ মানসিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়। কথার আঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়। এ ছাড়া অনিয়ন্ত্রিত কথাবার্তা মানুষের জন্য বিভিন্ন ধরনের অকল্যাণ ডেকে আনে। যা দুনিয়ার দিক থেকেও ক্ষতিকর এবং আখেরাতের দিক থেকেও ক্ষতিকর। তাই অনর্থক কথাবার্তা থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। এতে রয়েছে প্রভূত কল্যাণ। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ন্যায়সংগত হওয়া সত্ত্বেও ঝগড়া পরিহার করবে আমি তার জন্য জান্নাতের বেষ্টনীর মধ্যে একটি ঘরের জিম্মাদার হব। যে ব্যক্তি তামাশার ছলেও মিথ্যা বলে না আমি তার জন্য জান্নাতের মধ্যখানে একটি ঘরের জিম্মাদার হব। আর যে ব্যি ক্ত তার চরিত্রকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করেছে আমি তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ স্থানে অবস্থিত একটি ঘরের জিম্মাদার হব।’ (সুনানে আবু দাউদ)
এই হাদিসে রাসুল (সা.) মুমিনদের বাক-সংযমে উদ্বুদ্ধ করেছেন। বিশেষ করে তিনি ঝগড়া পরিহার এবং হাসির ছলে মিথ্যা বলা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন। মুমিন ভালো কথা ও জিকিরের মাধ্যমে তার জিহ্বাকে সজীব রাখে। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) বলেন, ‘আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে তোমার জিহ্বাকে সজীব রাখো।’ (তিরমিজি)
অনিয়ন্ত্রিত কথায় যত বিপদ : অসংযত ও অনিয়ন্ত্রিত কথা মানুষকে পৃথিবীতে লাঞ্ছিত এবং পরকালে ক্ষতিগ্রস্ত করে। কোরআন ও হাদিসে সব ধরনের অসংযত বাক্য ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে, সেগুলোর কয়েকটি তুলে ধরা হলো।
জিহ্বার উপার্জন জাহান্নাম : মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) রাসুল (সা.)-কে প্রশ্ন করেন, ‘হে আল্লাহর নবী, আমরা যে কথাবার্তা বলি, এগুলো সম্পর্কেও কি পাকড়াও করা হবে? তিনি বললেন, হে মুয়াজ, তোমার মা তোমাকে হারিয়ে ফেলুক! মানুষকে শুধু জিহ্বার উপার্জনের কারণেই অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’ (তিরমিজি)
অধিক শপথকারী লাঞ্ছিত হয় : যারা কথায় কথায় শপথ করে তারা লাঞ্ছিত হয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘অনুসরণ করো না তার, যে কথায় কথায় শপথ করে, যে লাঞ্ছিত। যে পেছনে মানুষের নিন্দাকারী, যে একের কথা অন্যকে লাগিয়ে বেড়ায়।’ (সুরা কালাম ১০-১১)
অভিশাপ নিন্দনীয় : মানুষকে অভিশাপ করা নিন্দনীয়। যে ব্যক্তি মানুষকে বেশি বেশি অভিশাপ করে আল্লাহ পরকালে তার সুপারিশ ও সাক্ষ্য গ্রহণ করবেন না। রাসুল (সা.) বলেন, ‘বেশি বেশি অভিশাপকারী কিয়ামতের দিন সুপারিশকারী ও সাক্ষ্যদাতা হবে না।’ (সহিহ মুসলিম)
বিবাদ পথভ্রষ্টতার কারণ : বিতর্ক ও বিবাদ মানুষকে সত্য ও সুপথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। রাসুল (সা.) বলেন, ‘কোনো সম্প্রদায় সুপথ পাওয়ার পর আবার পথভোলা হয়ে থাকলে তা শুধু তাদের বিবাদ ও বাগ্বিতণ্ডায় জড়িত হওয়ার কারণেই হয়েছে।’ তারপর তিনি এ আয়াত তেলাওয়াত করেন, ‘তারা শুধু বাগ্বিতণ্ডার উদ্দেশেই আপনাকে এ কথা বলে। বস্তুত তারা এক ঝগড়াটে সম্প্রদায়।’ (তিরমিজি)
কথাবার্তায় সংযত হওয়া : অর্থহীন কথাবার্তা পরিহার মুমিনের বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘মুমিনরা সফলকাম হয়েছে, যারা তাদের নামাজে বিনয়ী, যারা অর্থহীন কথা-কাজ থেকে বিরত থাকে।’ (সুরা মুমিনুন ১-৩) আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।’ (সহিহ মুসলিম)
মন্দ কথা না বলা : মুমিন মুসলমান কথার মাধ্যমে কাউকে আহত করে না। রাসুল (সা.) বলেন, ‘প্রকৃত মুসলিম সে, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।’ (সহিহ বুখারি)
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ কল্যাণকর কথার কিছু দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তাদের বেশির ভাগ গোপন পরামর্শে কোনো কল্যাণ নেই। তবে কল্যাণ আছে যে নির্দেশ দেয় দান-খয়রাত, সৎকাজ ও মানুষের মধ্যে শান্তি স্থাপনের, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আকাক্সক্ষায় কেউ তা করলে আল্লাহ তাকে অবশ্যই মহা পুরস্কার দেবেন।’ (সুরা নিসা ১১৪)