রবীন্দ্রনাথের জীবনে যারা আলো জ্বেলেছেন

রবীন্দ্রনাথ প্রথাগত শিক্ষাগ্রহণ করেননি। স্কুলে যত না গিয়েছেন তার থেকে স্কুল কামাই করেছেন ঢের বেশি। বিদ্যালয়ে রবির এমন অনাগ্রহ দেখে বাড়িতেই গৃহশিক্ষক রেখে শিক্ষাদানের চেষ্টা করেছেন অভিভাবকরা। আর নিজেরা দেখভাল তো করেছেনই। স্কুলে যাননি বলে কিন্তু রবির জীবনে শিক্ষকদের অবদান কম নয়। বরং তার জীবনী থেকে জানা যায় বেশ কয়েকজন অসাধারণ শিক্ষকের পরশে জ¦লে উঠেছিলেন রবি।

এই শিক্ষকদের মধ্যে প্রথমেই আসেন নীলকমল ঘোষাল। তিনি ছিলেন নর্মাল স্কুলের শিক্ষক। সকাল ছয়টা থেকে সাড়ে নয়টা পর্যন্ত পড়ানোর ভার ছিল তার ওপর। তিনি বাংলা ভাষায় পড়াতেন পাটিগণিত, বীজগণিত, রেখাগণিত, সাহিত্য, প্রাকৃত বিজ্ঞান। সাহিত্যের সিলেবাসে ছিল না কোনো সীমা পরিসীমা। সীতার বনবাস থেকে মেঘনাদবধ কাব্য। ছেলেবেলায় রবির স্বাস্থ্য ছিল বেশ ভালো। কখনো অসুস্থ হতেন না। তার শিক্ষকও তাই। সে কারণে তার মনে খেদ ছিল। শিক্ষক অসুস্থ না থাকায় হলে ছুটি পাওয়া অসম্ভব ছিল। ছোট্ট রবি একদম ভালো লাগত না নীলকমলের কাছে পড়তে। তাই যেদিন বাবা বললেন, ‘আজ হইতে তোমাদের আর বাংলা পড়িবার দরকার নেই’ সেদিন খুব খুশি হলেও পরে তিনি স্বীকার করেছেন, ‘ছেলেবেলায় বাংলা পড়িয়াছিলাম বলিয়াই সমস্ত মনটার চালনা সম্ভব হইয়াছিল’।

রবির জীবনের দ্বিতীয় আলো জ্বালানিয়া শিক্ষক হলেন জ্যোতিঃপ্রকাশ গঙ্গোপাধ্যায়। বয়সে বড় কিন্তু সম্পর্কে তিনি ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নে। তিনি রবিকে বললেন, ‘তোমাকে পদ্য লিখিতে হইবে’। তারপর রবিকে শেখালেন পয়ারছন্দের চৌদ্দ অক্ষরের নিয়মকানুন। তারপর স্লেট দিয়ে বললেন, পদ্মের ওপর একটি কবিতা লেখ। রনি তখনই লিখলেন। এটিই রবীন্দ্রনাথের লেখা প্রথম কবিতা। কবিতায় মনের কথা লেখার আনন্দ পেয়ে যাওয়ার পর শিশু রবি ক্রমাগত কবিতা লেখা শুরু করেন। সে সব তার পকেটেই থাক। আর স্কুলের শিক্ষকরাও জেনে গিয়েছিলেন শিশু রবি কবিতা লেখে। এখানেই পরিচয় হয় কবির জীবনে প্রভাব বিস্তারকারী তৃতীয় শিক্ষকের সঙ্গে। তিনি সাতকড়ি দত্ত। তিনি মাঝে মাঝে রবির খাতায় পদ লিখে তাকে বললেন পূরণ করতে। একবার রবির খাতায় লিখেছিলেন, ‘রবি করে জ্বলাতন আছিল সবাই/বরষা ভরসা দিল আর ভয় নাই।’ রবি তার নিচে লিখেছিলেন, ‘মীনগণ হীন হয়ে ছিল সরোবরে,/এখন তাহারা সুখে জলক্রীড়া করে।’

কাব্যচর্চার আরেক ধাপে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে গিয়েছিলেন জ্ঞানচন্দ্র ভট্টাচার্য।  তিনি স্কুলের পড়ায় রবির মন নেই দেখে বাংলায় অনুবাদ করে ‘কুমারসম্ভব’ পড়াতে শুরু করেন। এ ছাড়াও তিনি রবিকে বাংলায় ম্যাকবেথ পড়ে শোনাতেন। এই বাংলা অংশটি যতক্ষণ না রবি ছন্দে প্রকাশ না করতেন ততক্ষণ তাকে ঘরে বন্দি করে রাখতেন। এমন জোরাজুরি করে ছয়-সাত মাসে শেষ হয় ম্যাকবেথের বাংলা কাব্যানুবাদ। এই ম্যাকবেথের অনুবাদ দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন তার পরের শিক্ষক রামগোপাল বিদ্যাবাগীশ। তিনি এই বিস্ময়বালককে নিয়ে যান বিদ্যাসাগরের কাছে। রবীন্দ্রনাথ প্রথম দেখায় বিদ্যাসাগরকে ভয়ই পেয়েছিলেন। কিন্তু ফিরে এসেছিলেন বুকে সাহস আর খুশি নিয়ে। এমন গভীর মনোযোগী শ্রোতা তিনি আগে পাননি। বিদ্যাসাগরের উৎসাহব্যঞ্জক মন্তব্য তার সাহস বাড়িয়ে দিয়েছিল বহুগুণে।

পরে এমন মনোযোগী শ্রোতা পেয়েছিলেন সংগীত শিক্ষক শ্রীকণ্ঠ সিংহকে। তিনি ছিলেন রবির গায়কির মুগ্ধ শ্রোতা। তার একটি গান ছিল ‘ময় ছোড়ো ব্রজকি বাসরী’। এই গানটি কবির কণ্ঠে সবাইকে শোনাতেন তিনি। কবি গাইতেন আর তিনি সেতার বাজাতেন।

এমন শিক্ষক আরও কয়েকজন ছিলেন। লক্ষণীয় যে, এই শিক্ষকরা প্রত্যেকেই ছিলেন স্ব স্ব ক্ষেত্রে কীর্তিমান এবং তারা ঠাকুরবাড়িতে সম্মানিতও হতেন দারুণভাবে। শুধু সম্মানীতে নয়, সম্মান প্রদর্শনেও। শিক্ষার্থীরা প্রতিদিন শিক্ষককে গুরুপ্রণামের মাধ্যমে তাদের পাঠাভ্যাস শুরু করত। একবার ঠিক হলো, ছেলেরা লাঠিখেলা শিখবে। শেখাবেন যিনি তিনি ছিলেন পেশায় একজন মুচি। বালক রবির ধারণা ছিল না তাকে কীভাবে সম্মান জানাবেন। বাবার কাছে জিজ্ঞাসা করলেন দেবেন্দ্রনাথ বললেন, ‘যেভাবে আর পাঁচজন শিক্ষকের পায়ের ধুলা গ্রহণ করো, তেমনভাবেই প্রচলিত রীতিতে এই শিক্ষককেও গুরুপ্রণাম করবে’। শিক্ষকের প্রতি এমন শ্রদ্ধাবোধ অনন্য মানবিকবোধের জন্ম দেবে তাতে আর আশ্চর্য কী!

তথ্যসূত্র : রবীন্দ্রজীবনে শিক্ষাগুরু পীতম সেনগুপ্ত

সুলতানা রাজিয়া