জাতীয়তাবাদই জাতিকে সংঘবদ্ধ করে

‘জাতীয়তাবাদ’ একটি আধুনিক রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় শক্তি, যা জনগণের মধ্যে একতা ও স্বাতন্ত্র্যের অনুভূতি গড়ে তোলে। এটি একটি জাতিকে তার নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, এবং ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে সামগ্রিকভাবে সংগঠিত করে। আধুনিক রাষ্ট্রের উদ্ভবের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয়তাবাদ হয়ে উঠেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনা, যা জাতির অভ্যন্তরীণ সংহতি ও বহিরাগত শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। জাতীয়তাবাদ মূলত একটি জাতিকে তার নিজস্ব সত্তা সম্পর্কে সচেতন করার ফলে এটি ভাষা, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের মাধ্যমে জনগণের মধ্যে একটি অভিন্ন চেতনা তৈরি করে। বিশেষ করে ঔপনিবেশিক শাসনের সময় জাতীয়তাবাদ আন্দোলন বিভিন্ন দেশের স্বাধীনতার প্রধান চালিকাশক্তি ছিল। বাংলাদেশেও জাতীয়তাবাদের চেতনা ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে জাতিকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। এই চেতনাই জনগণের মধ্যে স্বাতন্ত্র্যবোধ জাগিয়ে তোলে এবং তাদের একটি অভিন্ন লক্ষ্যে একত্র করে। ভাষা আন্দোলন বাঙালির প্রথম জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রকাশ হলেও মুক্তিযুদ্ধে তা পূর্ণতা লাভ করে। এই চেতনা শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের জন্য নয়, বরং একটি স্বতন্ত্র জাতিসত্তার আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় জাতীয়তাবাদ প্রতিটি মানুষের মধ্যে ত্যাগ, সাহস এবং ঐক্যের মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এই চেতনাই বাঙালি জাতিকে বিশ্বে একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে পরিচিত করেছে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদ দেশের পুনর্গঠন, সংস্কৃতি সংরক্ষণ এবং আর্থসামাজিক উন্নয়নের প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে।

আধুনিক রাষ্ট্রের কাঠামোতে জাতীয়তাবাদের গুরুত্ব অপরিসীম। এটি শুধু রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সীমারেখার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং জনগণের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। জাতীয়তাবাদ একদিকে যেমন জনগণের মধ্যে একাত্মতার চেতনাকে শক্তিশালী করে, অন্যদিকে এটি একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় মনোভাব গড়ে তোলে। উদাহরণস্বরূপ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাতীয়তাবাদ ইউরোপের বিভিন্ন দেশকে সংঘবদ্ধ করেছিল এবং তাদের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য একতাবদ্ধ লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করেছিল। জাতীয়তাবাদের এই শক্তিই রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের পাশাপাশি বহিরাগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। এটি শুধু ভৌগোলিক সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য নিশ্চিত করতে বিশ্বব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আধুনিক বিশ্বে যেখানে বৈশ্বিকীকরণের ফলে রাষ্ট্রগুলো পারস্পরিক নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, সেখানে জাতীয়তাবাদ একটি রাষ্ট্রকে তার নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করতে এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলতে সহায়তা করে। শুধু সামরিক শক্তি নয়, বরং নীতিনির্ধারণী ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। জাতীয়তাবাদই একটি জাতিকে তার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং ভাষার প্রতি গর্ববোধ করতে শেখায়, যা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের পরিচিতি এবং স্বতন্ত্র অবস্থানকে আরও সুসংহত করে।

আধুনিক রাষ্ট্রে জাতীয়তাবাদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি দেখা যায় সামাজিক উন্নয়নে। একটি জাতিকে তাদের স্বতন্ত্রতা সম্পর্কে সচেতন করে তোলে জাতীয়তাবাদ  এবং সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের মধ্যে দায়িত্ববোধ সৃষ্টি করে। এটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত উন্নতির চিন্তা থেকে জাতীয় উন্নয়নের ভাবনায় মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। শিক্ষা খাতে জাতীয়তাবাদী চেতনা নতুন প্রজন্মের মধ্যে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জাগিয়ে তোলে এবং তাদের সামাজিক দায়িত্ব পালনে অনুপ্রাণিত করে। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে জাতীয়তাবাদ জনগণকে সমান সুবিধা প্রদানের জন্য কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার প্রাপ্য সেবাটি পায়। অবকাঠামো উন্নয়নে এটি সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে একটি দেশের সম্ভাবনাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে সহায়তা করে। তবে, জাতীয়তাবাদ সবসময় ইতিবাচক ফলাফল নিয়ে আসে না। যখন এটি উগ্রতায় পরিণত হয়, তখন তা বিভেদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অতীতে দেখা গেছে, জাতীয়তাবাদের উগ্র চেহারা ফ্যাসিবাদ, বর্ণবাদ এবং সাম্প্রদায়িক সংঘাত, সমাজ ও রাজনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিশেষ করে আমরা বিভিন্নভাবে পিছিয়ে পড়েছি। যে কারণে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে জাতীয়তাবাদকে ভারসাম্যপূর্ণ এবং সহনশীলভাবে চর্চা করা অত্যন্ত জরুরি। এটি যেন জনগণের মধ্যে ঐক্যের পরিবর্তে বিভাজন তৈরি না করে, সে বিষয়ে বিশেষভাবে সচেতন হতে হবে। জাতীয়তাবাদ যদি সংহতির মাধ্যমে উন্নয়নের পথকে সুগম করে, তবে এটি একটি রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতার পথে নিয়ে যেতে পারে। এই ধারাকে অব্যাহত রাখতে, জাতীয় প্রশ্নে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। এখানে কোনো দলীয় রাজনৈতিক  রাজনৈতিক চিন্তা ও বিশ্বাসকে কোনোভাবেই অগ্রাধিকার দেওয়া ঠিক হবে না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে জাতীয়তাবাদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং ভাষা আন্দোলনের প্রেরণা জাতীয়তাবাদের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। কিন্তু বর্তমানে আমাদের সমাজে জাতীয়তাবাদকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা যায়, যা জনগণের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে। এই অবস্থায় প্রকৃত জাতীয়তাবাদের চেতনাকে পুনরুজ্জীবিত করা প্রয়োজন, যা দেশকে একত্র করে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাবে। মনে রাখতে হবে, জাতীয়তাবাদই আধুনিক রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য একটি শক্তি, যা একটি জাতিকে সংঘবদ্ধ করে তার স্বাতন্ত্র্য এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা করে। তবে, এটি যাতে বিভাজনের কারণ না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। জাতীয়তাবাদকে শুধু রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে নয় বরং সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের একটি ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। একমাত্র সঠিক রাজনৈতিক চর্চার মাধ্যমেই জাতীয়তাবাদ একটি আধুনিক রাষ্ট্রের অগ্রগতির পথকে সুগম করতে পারে। আমরা যদি এই চেতনা ও বিশ্বাস নিয়ে একতাবদ্ধ থাকি, তাহলে কোনোদিনই বাংলাদেশকে  পেছন ফিরে তাকাতে হবে না। দলীয় রাজনৈতিক চিন্তা-বিশ্বাস আমাদের বিচ্ছিন্ন করে। সম্মিলিত শক্তিকে দুর্বল করে। কিন্তু দেশের প্রশ্নে, জাতির প্রশ্নে, উন্নতি ও প্রগতির প্রশ্নে আমার যেন দলবদ্ধ থাকি। সুদীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত অর্জন যেন কোনোভাবেই বিসর্জিত না হয়। নিজেকে উন্নত করার চেতনা, প্রত্যেক নাগরিকের মধ্যে সুসংহত করে একমাত্র দৃঢ় জাতীয়তাবোধই।

লেখক : শিক্ষার্থী, মনোবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ

hridoypandey 333@gmail.com