বিদ্রোহীদের দখলে সিরিয়ার আলেপ্পো, সেনা প্রত্যাহার

সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেপ্পোর নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে যুদ্ধরত একটি বিদ্রোহী গোষ্ঠী। গত বুধবার থেকে সরকারবিরোধী বৃহত্তম এ অভিযানের নেতৃত্ব দেয় ইসলামপন্থি বিদ্রোহী গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল-শাম। গতকাল রবিবার পর্যন্ত শহরের বড় একটি অংশ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে দক্ষিণের হামা শহরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী এইচটিএস। সিরিয়ার সংঘাতে দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে এ গোষ্ঠীর। এ আকস্মিক হামলার জেরে ২০১৬ সালের পর প্রথমবারের মতো আলেপ্পোতে বিমান হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। মস্কোর দাবি, তাদের হামলায় বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির তিন শতাধিক যোদ্ধা নিহত হয়েছে। উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর আলেপ্পো থেকে অস্থায়ীভাবে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে সিরিয়ার সেনাবাহিনী।

দেশটির সেনাবাহিনী বলছে, বিদ্রোহীদের হামলায় শনিবার কয়েক ডজন সেনা নিহত হয়েছে। তাই অনেকটা বাধ্য হয়ে নিজেদের সেনা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। ২০১১ সাল থেকে গৃহযুদ্ধ চলছে সিরিয়ায়। আনুষ্ঠানিকভাবে সেই গৃহযুদ্ধের এখনো অবসান হয়নি। তবে কয়েক বছর ধরেই দেশটির বেশিরভাগ অংশে সংঘর্ষ স্তিমিত হয়েছিল অনেকাংশেই। মিত্র ইরান ও রাশিয়ায় সহায়তায় আসাদ বাহিনী সিরিয়ার বেশিরভাগ অংশ এবং সব বড় বড় নগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল। ২০১৬ সাল থেকে সিরিয়ার সরকারি বাহিনীর দখলে ছিল আলেপ্পোর নিয়ন্ত্রণ।

বিদ্রোহীদের আলেপ্পোর পুনরায় নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিয়ষটি প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের জন্য কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তবে সম্প্রতি বিদ্রোহীদের অগ্রগতির কথা স্বীকার করে সিরিয়ার সেনাবাহিনী জানিয়েছিল, বিদ্রোহীরা আলেপ্পোর অনেক অংশে প্রবেশ করেছে। তারা আলেপ্পো বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এ ছাড়া তারা ইদলিব প্রদেশের মারাত আল-নুমান শহর দখল করেছে বলে দাবি করেছে দুটি নিরাপত্তা সূত্র। এদিকে, আলেপ্পোর দখল নেওয়া বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে বাশার আল আসাদের মিত্র রাশিয়া। রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সিরিয়ার সেনাবাহিনীকে সহায়তা করতে তাদের বিমানবাহিনী বিদ্রোহীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। হামলায় বিদ্রোহীদের অবস্থান, কমান্ড পোস্ট ও অস্ত্রাগার লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এতে তিন শতাধিক বিদ্রোহী নিহত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সিরিয়ান অবজারভেটরি ফর হিউম্যান রাইটসের বরাত দিয়ে এএফপির খবরে বলা হয়েছে, সর্বশেষ এ লড়াইয়ে অন্তত ৩২৭ জন নিহত হয়েছে। নিহত ব্যক্তিদের বেশিরভাগই যোদ্ধা। তবে ৪৪ জন বেসামরিক নাগরিকও রয়েছে। এ হামলা সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের স্থবির হয়ে থাকা পরিস্থিতিকে নতুন করে উত্তপ্ত করে তুলেছে। ২০২০ সাল থেকে রণক্ষেত্র অনেকটাই স্থিতিশীল ছিল।

এদিকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সংকট সমাধানে সিরিয়া সরকারের অনীহা, রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠতার ফলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন হোয়াইট হাউজের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মুখপাত্র শন সাভেট। তিনি বলেন, জাতিসংঘের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে সিরিয়ার অস্বীকৃতি এবং রাশিয়া-ইরানের ওপর অতি নির্ভরতা এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। যার ফলে উত্তর-পশ্চিম সিরিয়ায় আসাদ বাহিনীর পতন ঘটেছে।

২০১১ সালে শুরু হওয়া সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে প্রাণ হারায় কয়েক লাখ মানুষ। বাস্তুচ্যুত হয় অনেকে। তবে রাশিয়া ও তুরস্কের মধ্যে উত্তেজনা হ্রাস চুক্তি হওয়ার পর থেকে উত্তর পশ্চিম সিরিয়ায় কয়েক বছর ধরে বড় ধরনের যুদ্ধ থেমে গিয়েছিল। লেবাননে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সিরিয়ায় সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের হামলায় ষড়যন্ত্রের আভাস পাচ্ছে ইরান ও রাশিয়া। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে এ বিষয়ে ফোনালাপ করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। বিদ্রোহী গোষ্ঠীর হামলার মুখে সিরিয়ার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন দুই দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তারা ইরান, রাশিয়া ও সিরিয়ার মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়ার প্রতি জোর দেন।

আব্বাস আরাঘচি বলেন, এ অঞ্চলকে অস্থিতিশীল রাখতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পরিকল্পনার অংশ বিদ্রোহীদের আকস্মিক এ হামলা। ইরানের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, সিরিয়ার বিদ্রোহীদের হামলা জঙ্গিবাদের অশুভ নিদর্শন। রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে জানানো হয়, উভয়পক্ষ আলেপ্পো ও ইদলিব প্রদেশে সশস্ত্র গোষ্ঠীর জঙ্গি কার্যক্রমের ফলে উদ্ভূত আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন।