অবশেষে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন স্ত্রী মাহমুদা খানম (মিতু) হত্যা মামলায় বাদী থেকে প্রধান আসামি বনে যাওয়া সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) বাবুল আক্তার। বুধবার (৪ ডিসেম্বর) বিকেল ৫টা ৩৫ মিনিটে পুলিশ পাহারায় একটি সাদা রঙের প্রাইভেটকারে করে কারাগার ত্যাগ করেন।
তবে এ সময় বাবুল আক্তার গণমাধ্যমকর্মীসহ কারা ফটকে উপস্থিত কারো সঙ্গে কথা বলেননি। স্ত্রী মিতু হত্যা মামলায় ২০২১ সালের ১২মে গ্রেপ্তার হন বাবুল আক্তার। প্রায় ৩ বছর ৭ মাস শেষে তিনি মুক্তি পান। গত ২৭ নভেম্বর বাবুল আক্তারকে জামিন দেন হাইকোর্ট। ১ ডিসেম্বর তার জামিননামা চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে আসে। কিন্তু সেদিন বিকেলেই হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বাতিল করতে বাবুল আক্তারের শ্বশুর মিতুর বাবা মোশাররফ হোসেন আপিল বিভাগে আবেদন করেন। আজ বুধবার বাবুল আক্তারকে দেওয়া হাইকোর্টের দেওয়া জামিন বহাল রাখেন আপিল বিভাগ।
তবে বাবুল আক্তারকে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া নিয়ে নানা নাটকীয়তায় ভরা ছিল গেল তিনদিন। হাইকোর্টের জামিননামা গত ১ ডিসেম্বর পৌঁছানোর পরও কারা কর্তৃপক্ষ বাবুলকে তিনদিন বেআইনিভাবে আটকে রাখেন বলে অভিযোগ করেছেন বাবুল আক্তারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট কফিল উদ্দিন।
তিনি বলেন,‘হাইকোর্টের জামিন আদেশ এবং আদালতের জামিন পরোয়ানা পাঠানোর পরেও তাকে মুক্তি দেওয়া হয়নি তিনদিন ধরে। এ বিষয়ে আমি ২ ডিসেম্বর কারা কর্তৃপক্ষের কাছে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছিলাম। কিন্তু তারা গ্রহণ করেনি। পরে ডাকযোগে এবং ই-মেইলের মাধ্যমে পাঠিয়েছি। সেখানে বাবুল আক্তারকে বেআইনি আটক করে রাখার বিষয়টি উল্লেখ করেছি। একইসাথে এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধও বলেছি। কিন্তু উত্তর পাইনি। আইনের ধারা অনুযায়ী, প্রতিটি ঘণ্টা হিসেবে বেআইনিভাবে আটক করে রাখার শাস্তি এক বছরের কারাদণ্ড। এ ছাড়া আদালতের আদেশ অমান্য করে কর্তৃপক্ষ আদালত অবমাননা করছে। আদালতের মুক্তি পরোয়ানা পেয়েছেও কার হুকুমে কারা কর্তৃপক্ষ বন্দি করে রেখেছে তা একমাত্র তারাই জানেন।’
বাবুল আক্তারকে বেআইনিভাবে তিনদিন আটক রাখার বিষয়ে তার আইনজীবী কফিল উদ্দিনের অভিযোগ প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ইকবাল হোসেনের মোবাইলে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
বাবুল আক্তারকে বেআইনীভাবে তিনদিন আটকে রাখার বিষয়ে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারা কর্তৃপক্ষর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেবেন কিনা- এমন প্রশ্নের উত্তরে অ্যাডভোকেট কফিল উদ্দিন বলেন, ‘এই সিদ্ধান্ত বাবুলই নেবেন।’
গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে কথা না বলা প্রসঙ্গে কফিল উদ্দিন বলেন, ‘ওনি (বাবুল) সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে না পারায় আমার মাধমে দুঃখ প্রকাশ করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতাও জানিয়েছেন।’
এ দিকে আপিল বিভাগে বাবুলের জামিন আদেশ বহাল রাখার খবর প্রচারের পর বুধবার বিকাল ৪টা থেকে গণমাধ্যমকর্মীরা কারা ফটকে ভিড় করতে থাকেন। বাবুলকে আজই মুক্তি দেওয়া হবে এমন খবর পেয়ে বিকাল চারটার দিকে কারা সীমানার মূল ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকেন বাবুলের স্ত্রী ইশরাত জাহান মুক্তা (মিতুর মৃত্যুর পর বিয়ে করেন) খালাতো ভাই আবদুল মাজেদসহ আরও কয়েকজন আত্মীয় অভ্যর্থনা কক্ষে বাবুলের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন।
আবদুল মাজেদ জানান, গত তিনদিন ধরে তিনি এবং বাবুল স্ত্রীসহ আরও অনেক আত্মীয় চট্টগ্রাম শহরের একটি আবাসিক হোটেলেই থাকছিলেন।
জানা গেছে, ২৭ নভেম্বর বাবুল আক্তারকে জামিন দেন হাইকোর্ট। বিচারপতি মো. আতোয়ার রহমান ও বিচারপতি আলী রেজার হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে বাবুলের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। জামিন পেলেও গত বৃহস্পতিবার বাবুলের জামিন স্থগিত চেয়ে হাইকোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করেন তার শ্বশুর ও মামলার বাদী মোশাররফ হোসেন। শুনানি শেষে গতকাল (মঙ্গলবার) আদেশের জন্য দিন ধার্য্য করা হলেও আদেশের তারিখ পিছিয়ে যায়। বুধবার শুনানি শেষে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হকের আদালত তার জামিন বহালের আদেশ দেন। ১৪ আগস্ট চট্টগ্রামের তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জসিম উদ্দিনের আদালতে জামিন আবেদন করেছিলেন বাবুল আক্তার। ১৮ আগস্ট চট্টগ্রাম তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. জসিম উদ্দিন জামিন নামঞ্জুর করেন।
২০১৬ সালের ৫ জুন ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার পথে চট্টগ্রাম নগরের জিইসি এলাকায় মাহমুদাকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয়। পরদিন ৬ জুন বাবুল বাদী হয়ে নগরের পাঁচলাইশ থানায় হত্যা মামলা করেন। তদন্ত শেষে পিবিআই ২০২১ সালের ১২ মে এই মামলায় আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। একইদিন (১২ মে) বাবুল আক্তারকে প্রধান আসামি করে নগরের পাঁচলাইশ থানায় দ্বিতীয় মামলাটি দায়ের করেন মিতুর বাবা সাবেক পুলিশ পরিদর্শক মোশাররফ হোসেন। সেইসঙ্গে অভিযোগ করা হয়, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের জের ধরে বাবুল তার স্ত্রীকে হত্যা করেছে। ওইদিনই মামলাটিতে বাবুল আক্তারকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করে পিবিআই। সেই থেকে কারাগারে ছিলেন বাবুল আক্তার। বর্তমানে চট্টগ্রামের তৃতীয় অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতে মামলাটি বিচারাধীন। এ মামলায় মোট ৯৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ৫২ জন সাক্ষ্য দিয়েছেন।