নাহিদের গতিতেই জয়ের গতিপথ

নাহিদ রানা যখন ইয়র্কারে শামার জোসেফের স্টাম্প ভাঙলেন তখন জ্যামাইকায় স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা বেজে ৪২ মিনিট, বাংলাদেশে ভোর পৌনে ৪টা। ১১ ঘণ্টার পার্থক্য। এ রকম সময় নৈশপ্রহরীরাও বোধহয় একটু হাই তোলে, অনিদ্রা রোগীরাও ঘড়ির কাঁটা দেখে। আমাকে এবং আমার মতো অনেককে জাগিয়ে রেখেছিল ক্রিকেট। এক অসাধারণ জয়ের সাক্ষী হতে ডিসেম্বরের ঠান্ডা রাতেও ঘুমের আয়েশ আমাদের টানেনি।

বাংলাদেশ দলকে টেস্ট জিততে দেখার মুহূর্ত নিয়মিত কোনো দৃশ্য নয়। ১৫০টা টেস্ট খেলে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ জিতেছে মাত্র ২২টি টেস্ট, সাফল্যের হার মাত্র ১৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয় বাংলাদেশের টেস্ট জয় কতখানি বিরল। এই বছর দেশে এবং বিদেশে মিলিয়ে বাংলাদেশ দলের গোটা চারেক ম্যাচ মাঠে বসে দেখেছি, একটিতেও জিততে দেখিনি। বরং অসহায় আত্মসমর্পণে নুয়ে পড়তে দেখেছি। ভারত সফরে ধবলধোলাই, দেশে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে আরেক দফা ধবলধোলাইয়ের পর ক্যারিবিয়ানে গিয়ে অভিশপ্ত অ্যান্টিগায় যখন ব্যাটিং বিপর্যয়, তখনো মনে হয়েছে আরেক দফা ধবলধোলাই অপেক্ষা করে আছে। তবে সাহস জোগাল অ্যান্টিগার দ্বিতীয় ইনিংসে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ১৫২ রানে অলআউট করে দেওয়া। তাসকিন আহমেদের ছয় উইকেট নেওয়া। জ্যামাইকায় নাহিদ রানা একাদশে এলেন শরিফুল ইসলামের জায়গায়। তারপর পাশা পাল্টে গেল।

পেস বোলিং আর ক্যালিপসো, এই দুই হচ্ছে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সংস্কৃতি। অগ্রজদের মুখে শুনেছি, ক্যারিবীয় পেস তারকারা নাকি এক সময় গর্ব করে বলতেন যে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের নারকেল গাছে ঝাঁকি দিলে পেস বোলার ঝরে পড়ে! রূপক হলেও একেবারে মিথ্যে নয়। শামার জোসেফের কথাই ধরুন না, লেবু দিয়ে নাকি বোলিং করতে শিখেছিলেন, আর কাজ করতেন কাঠের চেরাই কলে। সেখান থেকে উঠে এসে অস্ট্রেলিয়াতে গিয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে জিতিয়ে দিলেন! বাংলাদেশের অবশ্য পেস বোলিং নিয়ে এমন কোনো রূপকথার গল্প নেই বা বলা ভালো ছিল না। যেটা লিখেছেন নাহিদ রানা। কোচ আলমগীর কবির যাকে আবিষ্কার করেন ঘটনাচক্রে। সিনিয়র-জুনিয়র ভাগ হয়ে খেলার ম্যাচে একদিকে ক্রিকেটার কম থাকায় নাহিদকে নিয়েছিলেন দলে, শুনেছিলেন ঢ্যাঙ্গা ছেলেটা অনেক জোরে বল করে। কোনো ক্রিকেট একাডেমিতে না যাওয়া, প্রতিষ্ঠিত কোচের কাছে তালিম না নেওয়া ছেলেটাই পেস বোলিংয়ের তীর্থক্ষেত্রে, ম্যালকম মার্শাল-জোয়েল গার্নার-কার্টলি অ্যামব্রোস-কোর্টনি ওয়ালশদের দেশে এসে স্রেফ গতির জোরে পরাস্ত করছেন ব্যাটসম্যানদের। বল হেলমেটে লাগছে। ব্যাটসম্যান খেলতে গিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছেন। এমন ভয়ংকর সুন্দর সব দৃশ্যের জন্ম দিয়ে নাহিদ রানা ক্যারিয়ারে প্রথমবার নিলেন পাঁচ উইকেট। মাইক্রোফোনে তখন উদাত্ত প্রশংসায় ইয়ান বিশপ।

১৪ রানের লিড পেয়ে দ্বিতীয় ইনিংস শুরুর পর বাংলাদেশ আর টিকে থাকার জন্য নয়, খেলল জেতার জন্য। ব্যাটিংয়ে আগ্রাসী মেজাজ। ওপর থেকে নিচ সবারই একই প্রতিজ্ঞা। জাকের আলি অনিক লেজের লড়াইতে ৫ ছক্কায় ৯১ রান করে দ্বিতীয় ইনিংসের সংগ্রহটাকে নিয়ে গেলেন ২৬৮ রানে। সঙ্গে ১৮ রানের লিড মিলে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে ২৮৭ রানের লক্ষ্য। ম্যাচের লাগাম তখন বাংলাদেশের হাতে। এরপর মধ্যাহ্ন বিরতির আগের ওভারে তাইজুল ইসলাম এসে যখন মাত্র দুই বল করে মিকাইল লুই-এর উইকেট নিয়ে নেন, তখন মন বলে এই রাতে কিছু হতে চলেছে!

ক্যারিবিয়ান সাগরের পাড়ে যখন ভরদুপুর, গাঙ্গেয় ব-দ্বীপে তখন শীতের রাত জেঁকে বসেছে। মাঝবিরতিতে গিয়ে কফি বানিয়ে আনি, রাত জাগবার রসদ। ওদিকে পর্দায় ইয়ান বিশপ আর আতাহার আলি খান কথা বলছেন। বিশপ বলছেন, নাহিদ রানাকে যত্ন করার কথা, চোটের কারণে ক্যারিয়ারটা অকালে শেষ হওয়ার কষ্টটা তার চাইতে ভালো জানে কম মানুষই। আতাহার আলী গল্প শোনাচ্ছেন বাংলাদেশের পেস বোলিং বিপ্লবের, কীভাবে অ্যালান ডোনাল্ড এবং আন্দ্রে অ্যাডামস বদলে দিয়েছেন বাংলাদেশের বোলিংয়ের মানচিত্র। অপেক্ষার পালা শেষ হয়, ফের ব্যাট করতে নামে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ক্রেইগ ব্র্যাথওয়েটকে মাঠের আম্পায়ার কুমার ধর্মসেনা আউট দিলেও রিভিউ নিয়ে বেঁচে যান, একই ভাগ্য হয় কেভম হজেরও। আশঙ্কা উঁকি দেয়, অঘটন ঘটবে না তো? মনে পড়ে যায় চট্টগ্রাম, কাইল মেয়ার্স...আবার সেই দুঃস্বপ্ন।

তেমনটা হতে দেন না তাইজুল। তার বলে খেলতে গিয়ে ক্যাচ দেন ব্র্যাথওয়েট, হাফসেঞ্চুরির পর কেভম হজকেও ফাঁদে ফেলেন লেগ বিফোর উইকেটের। হাসান মাহমুদ ও তাসকিন আহমেদেরও মনে হয় তাদেরও কিছু একটা করা দরকার। তাসকিন বোল্ড করেন জাস্টিন গ্রিভসকে, হাসান মাহমুদ আলজারি জোসেফকে। জশুয়া ডি সিলভাকে আউট করে ক্যারিয়ারে ১৫তমবারের মতো ইনিংসে পাঁচ বা তার বেশি উইকেট নেওয়া হয়ে গেছে তাইজুলের। নাহিদ রানা দ্বিতীয় ইনিংসে একটু ম্রিয়মাণ ছিলেন। শামার জোসেফ তাকে অন্ধের মতো চালিয়ে পুল করে একটা চার মেরেছিলেন বটে, তবে শর্ট বলের পর ইয়র্কারের সূত্রে বোল্ড হয়ে যান পরের বলেই। ১৮৫ রানে অলআউট ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ১০১ রানে জয়ী বাংলাদেশ, সিরিজে ১-১ সমতা।

জয়ের পর মাঠে সবাই গোল হয়ে দাঁড়ালেন। মিরাজ কী যেন বলছিলেন সবাইকে। তার আগে নাহিদ যে স্টাম্পটা উড়িয়ে জয়টা নিশ্চিত করেছেন, সেটাই তুলে নিতে চেয়েছিলেন স্মারক হিসেবে। উপড়ে নিতেই বোঝা গেল ওতে স্টাম্প মাইক, স্টাম্প ক্যামেরা, জিং বেলসসহ অনেক কিছুর তার লাগানো। পা দিয়ে কিছুক্ষণ ছোটানোর চেষ্টা করে হাল ছাড়লেন। লিটন ব্যাট হাতে বেশি কিছু না করলেও সেলফি তুলতে বেশ তৎপর। পুরস্কার বিতরণ শুরু হলো। জেডন সিলস আর তাসকিন যৌথভাবে সিরিজসেরা হলেন, তবে সিলস ক্রেস্টটা দিয়ে দিলেন তাসকিনকেই। এরপর বিশপ, বাংলাদেশের কোচ ফিল সিমন্স ও আরেক ধারাভাষ্যকার কোর্টনি ওয়ালশ মিলে যে আলাপটা জুড়েছেন, সেটা কোনো ‘মাস্টার ক্লাস’-এর চেয়ে কম নয়! তিনজনই উচ্ছ্বসিত নাহিদ রানাকে নিয়ে। সিমন্সের তো বিশ্বাসই হয় না যে, মাত্র পঞ্চম টেস্ট খেললেন নাহিদ, ‘তরুণ বলে তার ম্যাচ পরিস্থিতি বুঝতে পারার সামর্থ্যকে আমরা কিছুটা অবমূল্যায়ন করেছিলাম হয়তো। কারণ মাঠে নামার আগে যেসব কথা সে আমাকে বলেছে, তার দিকে তাকিয়ে আমি বলেছি, তুমি কি নিশ্চিত যে এটা তোমার চতুর্থ বা পঞ্চম টেস্ট ম্যাচ! তার গতি অবশ্যই দারুণ, তবে আরও বেশি মুগ্ধতা জাগানিয়া ব্যাপার তার শেখার তাড়না। সে উন্নতি করতে থাকবে এবং আমি নিশ্চিত, তার আরও অনেক কিছু আমরা দেখব।’

ওয়েস্ট ইন্ডিজে গিয়ে তাদের ব্যাটসম্যানদের গতিতে পরাস্ত করছে বাংলাদেশের কোনো পেসার এবং তাকে নিয়ে আলোচনা করছে ওয়ালশ-বিশপদের মতো কিংবদন্তিরা, এমনটা কিছুদিন আগেও ছিল স্বপ্নদৃশ্যের মতোই কল্পনা। তাই মানুষ যে সময়টায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে, সেই সময়ে টিভিতে সরাসরি দেখে সেই বাস্তবকেও মনে হচ্ছে স্বপ্নের মতোই ঘোরলাগা।

বাংলাদেশ ওয়েস্ট ইন্ডিজে আগেও টেস্ট জিতেছে, সিরিজও জিতেছে। তবে সেই জয়ে মিশে ছিল একটা ‘কিন্তু’। পারিশ্রমিক নিয়ে ধর্মঘটের কারণে শীর্ষ খেলোয়াড়রা মাঠে নামেননি, এখান ওখান থেকে কুড়িয়ে বাড়িয়ে আনা এক দল ক্রিকেটারকে নিয়েই দল দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন নির্বাচকরা। এবারে সেই ফুটনোট নেই। ওয়েস্ট ইন্ডিজের যারা খেলেছেন এরাই টেস্ট দলের নিয়মিত বরং বাংলাদেশই পায়নি মুশফিকুর রহিম, নাজমুল হোসেন শান্তকে। এই জয় তাই আরও গৌরবের। এমন জয়ের সাক্ষী হওয়ার জন্য ঘুমের আরাম হারাম হলেও আক্ষেপ নেই!