দেশে-সিনেমায় মার্শাল আর্ট আমিই নিয়ে আসি

তার নাম আমরা ভুলে যাই। সবাই বলি ‘ওস্তাদ’। একাধারে প্রযোজক, পরিচালক ও অভিনেতা। ঢাকাই চলচ্চিত্রে মার্শাল আর্টের জনক ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম। হেলেদুলে সময়মতো এলেন দেশ রূপান্তর অফিসে। তখনো সূর্য ডোবেনি। কিছু কথার পর গেলেন ছবি তুলতে। এরপর ডিজিটাল রুমে শুরু হলো তুমুল আড্ডা। ছিলেন সহকারী সম্পাদক তাপস রায়হান, আলোকচিত্র সম্পাদক সাহাদাত পারভেজ, সহ-সম্পাদক ইন্দ্রজিত কুমার দেব এবং কনটেন্ট এডিটর গণেশ চন্দ্র রাজবংশী। ক্যামেরায় ছিলেন কনটেন্ট এডিটর নুরুস সাফা।

তখনো ক্যামেরা রোলিং হয়নি। এলোমেলো কথা হচ্ছে। আড্ডার কোনো বিষয় নয়, এমন কথার পর সমবেত সশব্দ হাসি। একসময় ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম টাই, স্যুটে একটু টান দিয়ে সটান হয়ে বসলেন। মুচকি হেসে বললেন শুরু হইছে! আগে আমি বলুম? ইশারায় তাকে ‘না’ বলে আড্ডার ভূমিকা দিলেন তাপস রায়হান। কিন্তু প্রথমেই কে প্রশ্ন করবে? একদিকে সাহাদাত পারভেজ মনোযোগ দিয়ে প্রশ্ন দেখছেন। অন্যদিকে গণেশ চন্দ্র রাজবংশীও মনোযোগী প্রশ্ন নিয়ে। তিনি মাথা নিচু করে আছেন। কিন্তু ক্যামেরা রোলিং। এমন সময় দ্রুত একটি প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন তাপস রায়হান। 

তাপস রায়হান : আপনিই বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে ‘মার্শাল আর্ট’ নিয়ে এলেন? কোন প্রেক্ষিতে এমন চিন্তা মাথায় এলো?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : শুধু বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র না। বাংলাদেশেই মার্শাল আর্টের কোনো ধারণা ছিল না। এই হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশের জনক। হাহাহাহাহা। আমিই প্রথম জাতীয় প্রশিক্ষক। আমার শিষ্য, প্রথম চ্যাম্পিয়ন চিত্রাভিনেতা রুবেল। আমি কিন্তু প্রথম ছবিই করেছি মার্শাল আর্টের ওপর। সেই ‘মার্শাল হিরো’, ‘মার্শাল সামুরাই’, ‘কারাটি মাস্টার’, ‘কুংফু কন্যা’সহ অনেক ছবি। এসব ছবির প্রযোজক, পরিচালক ছিলাম। আসলে আমি চলচ্চিত্রে এটাকে এনেছি, তাকে জনপ্রিয় করার জন্য। তখন তো আমাদের দেশে চায়নিজ ছবি, ইংরেজি ছবির দাপট। সেসব ছবিতে দারুণ জনপ্রিয় ছিল মার্শাল আর্ট। যখন দেখলাম, দর্শকরা এই বিষয়টি আগ্রহ নিয়ে উপভোগ করছে, সেই থেকেই মাসুদ পারভেজ সোহেল রানাসহ এমন চিন্তা। এখন তো আর আগের পরিবেশ নেই। সিনেমা হল নেই। আমরাও ওই ধরনের ছবি বানাতে সাহস পাই না।

সাহাদাত পারভেজ : প্রযোজক, পরিচালক থেকে অভিনেতা হলেন কীভাবে?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : আমি তো ফিল্মেই আসতে চাইনি। বিন্দুমাত্র ইচ্ছা ছিল না, অভিনয় করার। যখন আমি মাসুদ পারভেজকে প্রশিক্ষণ দিই, তিনি আমাকে ভীষণ পটাইছে। বলছেন ফিল্মে আসেন। নতুন ফাইট-টাইট করি। আমি বলছিলাম, না । চলচ্চিত্রে যাব না।  এসব আমাকে দিয়ে হবে না। তারপর ক্যামনে ক্যামনে যেন আসলাম। তিনি আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। প্রথমে আসলাম, ফাইট ডিরেক্টর হিসেবে। এরপর তো আগ্রহ বেড়ে গেল। তারপর ‘মার্শাল হিরো’ ছবির প্রযোজক হলাম। এটা ১৯৮১ সালের কথা। এরপর হলো, ‘মাস্টার সামুরাই’। আমিই ছিলাম ছবির নায়ক। আর নায়িকা ছিল জুলিয়া। না না, সুচরিতা আর দোয়েল ছিল। আমার বিপরীতে ছিল দোয়েল। এরপর তো একটার পর একটা ছবি নির্মাণ শুরু হলো। এর মানে হচ্ছে আমি ফাইট ডিরেক্টর থেকে প্রযোজক, নায়ক এবং পরিচালক। এ রকম ২০-২৫টা ছবি বানিয়েছি। সবার শেষ হচ্ছে ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ আর ‘সাহসী সন্তান’।

সাহাদাত পারভেজ : মোট কতগুলো ছবি হলো?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : ৩২টা ছবি প্রযোজনা করেছি। আর অভিনয় করেছি প্রায় ২০০ ছবিতে।

সাহাদাত পারভেজ : কেন আপনি ফাইট নিয়েই ছবিতে এলেন?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : এটা চায়নিজ ফাইট। আমি শিখেছি বার্মা থেকে। যেহেতু আমার বাড়ি কক্সবাজারের উখিয়া, সেখান থেকে খুব দূরে না। অনেকেই আসা-যাওয়া করত। সেখানে এই ফাইট দেখার পরই আগ্রহ হয় শেখার। ওস্তাদ ছিলেন বার্মার মিয়ং অন মিওন কিং। 

বার্মা থেকে আসার পর প্রথম ক্লাব করি ’৭১ সালে, কক্সবাজার কলেজে। সেখানে অনেককে প্রশিক্ষণ দিলাম। কারও তো এ সম্পর্কে ধারণা নেই। ওদের বিস্তারিত বুঝালাম। এরপর চট্টগ্রাম ক্লাব করলাম ’৭৪ সালে। ’৭৯ সালে বাংলাদেশের জাতীয় প্রশিক্ষক হলাম। এটাকে জনপ্রিয় করার জন্যই চলচ্চিত্রে আসা। এরপরই তো সবাই জানল, আমাকে চিনল।

সাহাদাত পারভেজ : আপনার আগে দেশে মার্র্শাল আর্ট ছিল না?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : না, শুধু জুডো ছিল। আমরা যাকে বলি কুস্তি।

তাপস রায়হান : কারাতে আর মার্শাল আর্ট কি একই?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : না। মার্শাল আর্ট হচ্ছে মিক্সড কারাতে। এখানে কারাতে, কুংফু, আখেরি, বেঙ্গুসহ অনেক কৌশলের মিশ্রণ রয়েছে।

তাপস রায়হান : সম্ভবত, চলচ্চিত্রে আপনার একটি ফাইটিং গ্রুপ ছিল?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : হ্যাঁ। ওস্তাদ জাহাঙ্গীর ফাইটিং গ্রুপ।

তাপস রায়হান : এখনো আছে?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : থাকবে না কেন? (হাসতে হাসতে) কিন্তু ফিল্ম তো হয় না।

সাহাদাত পারভেজ : এটা একটু বলেন, কক্সবাজার থেকে এটা দেশব্যাপী ছড়াল কীভাবে?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : যখন কক্সবাজারের সবাই দেখলেন, তখন অনেকেই ছিলেন অন্য জেলার। তারা আগ্রহী হলেন। যোগাযোগ হলো চট্টগ্রাম আর ঢাকার সঙ্গে। তারাই আমাকে অফার দিলেন। ’৭৪ সালে চট্টগ্রাম স্টেডিয়ামে মার্শাল আর্ট করি। তখন একটি কারাতে ক্লাব হয়। তখন তো সবাই জুডো খেলত। এরপর এক হলো, জুডো-কারাতে। অসংখ্য ছেলেমেয়ে এটা শিখেছে। দেশে আমার অনেক সাগরেদ আছে।  ক্লাবও তো প্রচুর। এখান তো বলতে গেলে, ঘরে ঘরে।

তাপস রায়হান : দীর্ঘ ক্যারিয়ার আপনার বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে। সেই আশির দশক থেকে আজ পর্যন্ত যদি দেখি, তাহলে কী মনে হয় বর্তমানে বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র নতুন ধারায় চলছে?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : ‘সময়’ বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। তখন গণমানুষের একমাত্র বিনোদন ছিল বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র। আর এখন তো অসংখ্য মিডিয়া। আপনি হাতের কাছেই সব পাচ্ছেন। সবার কাছে মোবাইল। মানুষের সুস্থ বিনোদনের তো অভাব নেই।  এই বিষয়টি মাথায় রেখে, প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে বাংলা ছবিকে টিকে থাকতে হবে। মার্কেটকে ওপেন করতে হবে। আমাদের সেন্সর সিস্টেমে পরিবর্তন নিয়ে আসতে হবে। ক্যাটাগরি করতে হবে এ, বি, সি, ডি। সব ছবিকে একই পাল্লায় মাপা যাবে না। যে, যেমন ছবি বানাবে, তাদের সেই ক্যাটাগরিতে ফেলতে হবে। তাহলেই তো হয়। এই কারণেই ছবিতে তেমন কোনো পরিবর্তন আসছে না। হ্যাঁ, এটা দেখুক সেখানে দেশবিরোধী কিছু আছে কি না, ভিন্ন রাজনৈতিক কোনো বক্তব্য রয়েছে কি না? বিনোদনের ছবি ইচ্ছামতো কাটাকাটি করলে, গল্পের ধারাবাহিকতাই তো থাকে না। একটা ছবি বানাতে কত পরিশ্রম, কত অর্থ ব্যয় হয় এটা না বুঝলে তো হবে না।

ইন্দ্রজিত কুমার দেব : সেন্সর বোর্ডের এটা তো জানার কথা?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : সেন্সর বোর্ডের নিয়ম কী? তারা দেখবেন, অবৈধ বা রাষ্ট্রবিরোধী কিছু আছে কি না। সবকিছু তো লেখাই আছে। কোনো দৃশ্য আপনার পছন্দ না হলেই তো, আপনি কেটে দেওয়ার কথা বলতে পারেন না। এখানে প্রযোজক এবং পরিচালকের কিছু করার নেই। প্রতিবাদ করার অধিকারও আপনার নেই। কোনো সমস্যা থাকলে, আপানি আগেই সার্কুলার দেন। তাহলেই তো কেউ সেই দৃশ্য রাখবে না। আপনি সার্কুলার দিচ্ছেন না কেন? আমি আমার চিন্তা, স্বপ্ন, ভালোবাসা দিয়ে একটি ছবি বানাব আর আপনি ইচ্ছামতো কাটবেন এটা কীভাবে হয়? আসলে সেন্সর বোর্ড থাকবে, তাদের জন্য যারা ছবি বোঝে।

গণেশ চন্দ্র রাজবংশী : বাণিজ্যিক ধারার অনেক ছবিতে মারামারির যে দৃশ্য দেখা যায়, বাস্তবের সঙ্গে তার সাদৃশ্য কম। বলতে গেলে নেই-ই। এটা মার্শাল আর্টের সঙ্গে যায় না...

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : আপনি আমার কোন ছবিটা দেখেছেন?

গণেশ চন্দ্র রাজবংশী : আপনার ছবি না। সামগ্রিক অর্থে বলছি?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : এ ক্ষেত্রে আপনার সঙ্গে আমি একমত। যারা মার্শাল আর্ট না বোঝে, এ রকম তো হবেই। আমরা কিন্তু কোনো ‘ডামি’ ব্যবহার করি না। বিশেষ করে, আমি আর রুবেল। যারা মার্শাল আর্ট না জানবে, তারা কীভাবে করবে? জ্যাকি চেন, ব্রুসলির ছবি দেখেননি? যারা জানে, তাদের ফর্মই আলাদা। প্র্যাকটিক্যালি তারা জানে।

তাপস রায়হান : আমাদের বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের পরিণতি কী?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : খুব খারাপ। আমাদের ছবির মার্কেট কোথায়?

তাপস রায়হান : বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রের মার্কেট নেই, তাহলে ছবি হচ্ছে কেন?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : আপনারা সাংবাদিক। বুইঝা লন। (ওস্তাদ জাহাঙ্গীর মুচকি হেসে চারদিকে মাথা ঘোরালেন।) এরপরও আমি বলব, এই অবস্থা

থাকবে না। চলচ্চিত্রে সুদিন ফিরে আসবেই। প্রযুক্তিগত দক্ষতাই চলচ্চিত্রকে বাঁচাবে। লক্ষ করবেন, বেশি দিন আগের কথা না। তখন সিনেমা হলের সাউন্ড সিস্টেম কেমন ছিল? আর এখন কেমন! আসলে ছবি ছাড়া আমাদের সত্যিকারের কোনো বিনোদন নেই। আবার পরিবারের সবাই একসঙ্গে সিনেমা হলে আসবেন। মোবাইল, টেলিভিশনে ছবি দেখা আর সিনেমা হলে বসে বড় পর্দায় ছবি দেখার মধ্যে অনেক পার্থক্য। তবে হলগুলোকে সেভাবে তৈরি করতে হবে।

সাহাদাত পারভেজ : এখন মানুষের হাতের নাগালে সব। তাহলে কেন সরকার এ সময় এসে সিনেমা হলের পেছনে অর্থ ব্যয় করবে?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : শোনেন, অনেকের ইচ্ছা আছে পরিবার নিয়ে বিনোদনের চাহিদা মেটানোর। না হলে তো, আমেরিকার মতো দেশে চলচ্চিত্রের এত উন্নতি সত্ত্বেও, হলের পেছনে অর্থ ব্যয় করত না? সেই দেশে কীভাবে ছবির মাধ্যমে কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা হচ্ছে?

সাহাদাত পারভেজ : এখন জেলা, উপজেলার সিনেমা হলগুলোর অবস্থা করুণ। অনেক সিনেমা হল ভেঙে মার্কেট, কোল্ড স্টোরেজ হয়েছে। বর্তমানে আমাদের দেশে কি সেই অবস্থা রয়েছে যে, পুনরায় সিনেমা হলকে জাগিয়ে তোলার? আমাদের কি আমেরিকার মতো সেই পরিস্থিতি আছে?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : আমি আপনার সঙ্গে একমত। বিভিন্ন কারণে বিগ বাজেটের ছবি হচ্ছে না। যে কারণে মার্কেটও পাচ্ছে না। মার্কেট ওপেন করে দিতে হবে। আমাদের ছবিও কিন্তু বিভিন্ন দেশে প্রদর্শিত হচ্ছে। আপনি যদি নতুন কিছু বানাতে পারেন, ছবি কিন্তু চলবেই। ‘ডিজিটাল প্রেম’ নামে একটি ছবির কাজ শুরু করব। অল মার্শাল আর্ট। এখন সবকিছু আপগ্রেড হয়েছে না? মার্শাল আর্টের অনেক দর্শক পাওয়া যাবে। অন্য কেউ সাহস পাবে না। এটা আমাকেই বানাতে হবে। বাজেট যত হয়, হবে। তাতে সমস্যা নেই। যারা মার্শাল আর্ট জানে, তারাই ছবিতে থাকবে। আর নতুন ছেলেমেয়েরা থাকবে। ছবিতে আমি অভিনয় করব ওস্তাদের।

গণেশ চন্দ্র রাজবংশী : আগে ছবির ফাইটে রিয়েলিটি থাকত। প্রযুক্তির কল্যাণে এই প্রজন্ম অনেক এগিয়ে গেছে। দুটো সময়ের মধ্যে কীভাবে সমন্বয় করবেন আপনার ছবিতে? আপনার পরিকল্পনা জানতে চাইছি?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : আগের শুটিং সিস্টেম, ক্যামেরার কাজ, এডিটিং সব কিছুই কিন্তু আধুনিক হয়েছে। তখন তো কম্পিউটারই ছিল না। প্রযুক্তি অনেক আধুনিক হয়েছে। এ কারণেই বলছি, অনেক আপগ্রেড হবে। দেখলে আপনি বুঝবেন। মোদ্দা কথা, সময় এবং দর্শকের রুচিকে মাথায় রেখে, এই ছবিটি হবে। দেখবেন, ফাইটিং কাকে বলে! এ সময়ের টেকনিশিয়ানরা অনেক দক্ষ। ওরা জানে, কোন কৌশলে কোন শট কাজে লাগাতে হবে।

ইন্দ্রজিত কুমার দেব : নারীদের বিষয়ে মার্শাল আর্ট নিয়ে আপনার ভাবনা কী?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : আমি তো বলেছি, নারীদের আগে মার্শাল আর্ট শেখা দরকার। আপনি আমার প্রযোজনা ও পরিচালনায় ‘প্রেমিক রংবাজ’, ‘সাহসী সন্তান’, ‘ কুংফু কন্যা’ ছবিগুলো দেখলে টের পাবেন। তখন তো আধুনিক ইনস্ট্রুমেন্ট ছিল না। গায়ের জোরে যতটুকু করা গেছে। এখন অনেক বেশি করা যাবে। 

সাহাদাত পারভেজ : অন্যরকম একটা প্রশ্ন করি। এই যে মার্শাল আর্ট করেন, ছবিতে অভিনয় করতে গিয়ে কখনো দুঃখজনক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : হাহাহাহাহাহা। হইছিতো, বেশ কয়েকবার। আসলে যারা জানে, তাদের দুর্ঘটনা হওয়ার সম্ভাবনা কম। কিন্তু গায়ের জোরে করতে গেলে, দুর্ঘটনা হবেই। এই মুহূর্তে একটা ঘটনা মনে পড়ছে। শুটিং হচ্ছিল সিলেটে। একবার নায়ক ওয়াসিম আর ভিলেন আদিল ফাইট করছিল। আমি ছিলাম সেই ছবির ফাইট ডিরেক্টর। আমি যেভাবে দেখাচ্ছিলাম, ওরা তা পারছে না। তখন ওয়াসিম বলল, এটা কি ফাইট? আসো আদিল, আমরাই আমাদের মতো করি। ওরা দুজন বাঙালি ফাইট শুরু করল। আমি খুব অপমান বোধ করলাম। বললাম, আমি যেভাবে বলেছি সেভাবে যদি আপনারা না করেন, তাহলে ফিল্ম থেকে বিদায় নিতে হবে। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, শেষ পর্যন্ত ওরা হারিয়েই গেল। আসলে নতুনত্ব সবাই পছন্দ করে।

গণেশ চন্দ্র রাজবংশী : ছবির এমন কোনো গল্প আছে, যা এখনো মনে পড়ে?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : আমার ‘মাস্টার সামুরাই’। সেই ছবির দর্শক চাহিদা এখনো আপ্লুত করে। মুক্তির পর সিনেমা হলে গিয়ে দেখলাম, মানুষ আর মানুষ। তারা সিনেমার টিকিট পাচ্ছে না।

গণেশ চন্দ্র রাজবংশী : ‘লড়াকু’ ছবিতে আপনি একটা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন? নবাগত রুবেল ছিলেন সেই ছবির নায়ক...

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : ছবির গল্পটাই আমার। একদিন পারভেজ সাহেব বললেন, একটা মার্শাল আর্টের ছবি বানান। রুবেল আর আপনি থাকেন। ছবি বানাইলাম। তখন তো ২৫০০০ টাকা জামানত দিয়ে এফডিসিতে সাদাকালো ছবি বানানো যেত। ছবি যখন রিলিজ হলো, সে কি অবস্থা! ছবিতে মোট খরচ হয়েছিল ১২-১৫ লাখ টাকা। আর ব্যবসা করেছিল প্রায় ৫ কোটি টাকা। 

ইন্দ্রজিত কুমার দেব : সরকারের পক্ষ থেকে মার্শাল আর্টকে কখনো প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : না, মার্শাল আর্টের কোনো ছবিকে অনুদান দেওয়া হয়নি।

তাপস রায়হান : অনুদান দেওয়া হয়নি, নাকি জমা পড়েনি?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : জমা পড়বে কীভাবে? ওখানে কি পরিচয় ছাড়া কোনো ছবিকে অনুদান দেওয়া হয়? তাহলে জমা দিয়ে কী লাভ? মার্শাল আর্টের ওপর হংকংয়ের একটি ছবি, অস্কার পেয়েছে। তাহলে আমাদের দেশে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হবে না কেন? সেই ছবিতে একটা ফ্লাইং কিক ছিল। সেটা ফ্রিজ করে দেখার পর, সবাই অবাক! সেই কারণেই সেটি অস্কার পেয়ে যায়। আপনাকে ভাবতে হবে, মার্শাল আর্ট হচ্ছে একটা শিল্প। এটি আত্মরক্ষা করতে শিখায়। যারা মার্শাল আর্ট শিখে, তাদের কলিজা কিন্তু অনেক বড়।

ইন্দ্রজিত কুমার দেব : মার্শাল আর্ট শেখার আসল বয়স কখন? 

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : এর নির্দিষ্ট বয়স নেই। যেকোনো বয়সেই শেখা যায়। বয়স হলে আরও ভালো। শরীর ফিট থাকে।

গণেশ চন্দ্র রাজবংশী : মার্শাল আর্টে আপনার আইডল কে?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : আমি ব্রুসলির ভক্ত। ব্রুসলি-ব্রুসলাই দুজনকেই ভীষণ পছন্দ করি।

সাহাদাত পারভেজ : মার্শাল আর্টে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন, এ রকম মোট কতজন হবেন?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : কম করে হলেও, দুই-আড়াই লাখ তো হবেই। এর মধ্যে অনেক মেয়ে রয়েছে। আমাদের চিত্রনায়িকা ববিতাই তো আমার কাছে শিখেছে। এ ছাড়া ইলিয়াস কাঞ্চন, রুবেল রয়েছে। যারা বর্তমানে হা, হু করছে সবাই আমার সাগরেদের সাগরেদ।

সাহাদাত পারভেজ : জীবিতদের মধ্যে সবচেয়ে ভালো কে মার্শাল আর্ট পারদর্শী?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : রুবেল। ওর ওপরে কেউ নেই।

সাহাদাত পারভেজ : নতুনদের মধ্যে?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : কেউ তো শিখেই আসে নাই। থাকবে কীভাবে?

তাপস রায়হান : কক্সবাজারের কলাতলীতে ‘ওস্তাদ জাহাঙ্গীর রিসোর্ট’ করেছেন। আপনি হঠাৎ করে রিসোর্ট ব্যবসায় এলেন কেন?

আপনার সঙ্গে আমাদের রাকা ভাবি আছেন। যিনি একসময় ‘মিস বাংলাদেশ’ হয়েছিলেন। আপনার ছোট ভাই রয়েছেন। সবাই একসঙ্গে রিসোর্ট ব্যবসায় নেমেছেন?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : আমি যেহেতু ফিল্মের সঙ্গে জড়িত, তাই সে রকম একটা পরিবেশ চাইছিলাম। আর কক্সবাজারের সন্তান হিসেবে অন্যরকম টান তো আছেই। এখন তো আমার ছবি হচ্ছে না। বর্তমানে নাটকের লোকজনই যাচ্ছে। তাদের জন্য ৫০% ডিসকাউন্ট আছে। শুধু নাটক না, মিডিয়ার সবার জন্যই এ ব্যবস্থা। এটা আসলেই দেখার মতো। আমার বলে বলছি না। আপনার ভালো লাগবে। একদিকে হিলভিউ, আরেকদিকে সমুদ্র।

সাহাদাত পারভেজ : আপনি ব্যবসায়ী না চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : যখন যা নিয়ে ব্যস্ত, তাই। যার জায়গা যেখানে। আমি মূলত তিনটা বিষয় নিয়ে ব্যস্ত। চলচ্চিত্র, মার্শাল আর্ট আর ব্যবসা।

তাপস রায়হান : আপনার পরিবার নিয়ে জানা হলো না?

ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম : আমার চার ছেলে। আর এক বউ। হাহাহহাহহা। তাদের নিয়েই আছি। চলছে...।

ততক্ষণে রাত অনেক। নিউজ রুমের ব্যস্ততা প্রায় শেষ। সবাই ডিজিটাল রুম থেকে বের হলেন। ওস্তাদ জাহাঙ্গীর আলম, নিউজ ফ্লোর থেকে বের হয়ে চারদিকে চোখ ঘুরিয়ে বললেন ওই ফ্লোরে কী? একজন বললেন, ওপাশে কমার্শিয়াল ফ্লোর। তিনি বললেন বাহ্, অনেক বড় তো! মুচকি হেসে পা বাড়ালেন লিফটের দিকে।

গ্রন্থনা : অনিন্দিতা আচার্য

ছবি : আবুল কালাম আজাদ

লোকেশন : গ্রিন লাউঞ্জ