গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিদ্বেষপূর্ণ এবং উসকানিমূলক বক্তব্য গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার এবং প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই সঙ্গে ইতিমধ্যে তার যেসব বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য ও বিবৃতি গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশ হয়েছে, তা তাৎক্ষণিক অপসারণেরও নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন শাখার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল বৃহস্পতিবার বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত দুই বিচারপতির ট্রাইব্যুনাল এ আদেশ দেয়। আদেশে তথ্য ও সম্প্রচার সচিব, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি সচিব এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে (বিটিআরসি) এ নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে আদেশ হয়েছে।
আদালতে প্রসিকিউশনপক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামিম। তিনি শুনানিতে তিনটি দৈনিকে প্রকাশিত শেখ হাসিনার বক্তব্য আদালতে পড়ে শোনান। তিনি বলেন, ‘একটি কনভারসেশনে উনি (শেখ হাসিনা) বলেছেন, “আমার (শেখ হাসিনা) নামে ২২৭টি হত্যা মামলা হয়েছে। তার মানে ২২৭ জনকে মার্ডার করার সার্টিফিকেট পেয়েছি।” উনি একজনকে আরও বলেছেন, “তোমাদের বাড়িঘর পোড়াচ্ছে। তাদের কী বাড়িঘর নেই।” এ ধরনের বক্তব্যে সাক্ষী ও ভুক্তভোগীরা আতঙ্কে আছেন।’
একপর্যায়ে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান প্রসিকিউটরকে প্রশ্ন করেন, ‘যেসব বক্তব্য উল্লেখ করেছেন, সেগুলো শেখ হাসিনার বক্তব্য কি না?’ প্রসিকিউটর তামিম বলেন, ‘গণমাধ্যমে তার এসব বক্তব্য এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব বক্তব্য আছে। তার (শেখ হাসিনা) ভয়েস অনলাইনে আছে। ভয়েসটা তার। সারা দুনিয়ার মানুষ দেখেছে ও শুনেছে। তার এই ভয়েস শুনে সাক্ষী ও ভুক্তভোগীরা আতঙ্কে আছেন।’ ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘প্রচার ও প্রকাশিত এসব বক্তব্যের বিষয়ে তিনি (শেখ হাসিনা) বা তার দলের পক্ষ থেকে কেউ কি আপত্তি তুলেছেন?’ জবাবে প্রসিকিউটর বলেন, না, কেউ আপত্তি তোলেননি।
প্রসিকিউটর তামিম শুনানিতে বলেন, ‘সরকারের (আওয়ামী লীগ) পতনের পর তিনি (শেখ হাসিনা) দেশের বাইরে গিয়ে টেলি কনফারেন্স করছেন। এটা তিনি করতেই পারেন। এটা তার স্বাধীন মতপ্রকাশের অধিকার। কিন্তু তিনি যেভাবে বক্তব্য দিচ্ছেন, গণহত্যায় যারা ভুক্তভোগী তাদের অনেকেই ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেছেন। দুই হাজার মানুষ হত্যা ও ৩০ হাজার আহতের ঘটনায় যারা ভুক্তভোগী, অভিযোগকারী, সাক্ষী তাদের জন্য এগুলো হুমকি। এভাবে চলতে থাকলে সাক্ষীরা ট্রাইব্যুনালে এসে সাক্ষ্য দিতে ভয় পাবেন এবং এটি বিচার প্রক্রিয়ায় বাধাগ্রস্ত হতে পারে।’ এ সময় তিনি উল্লেখ করেন, শেখ হাসিনার বক্তব্যগুলো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন (সংশোধিত), ১৯৭৩, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০০১, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ, রোম সংবিধি এবং নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের আন্তর্জাতিক চুক্তির (আইসিসিপিআর) সংশ্লিষ্ট ধারাসহ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী হেইট স্পিচ এবং এটি ফৌজদারি অপরাধ বলে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, ‘সংবিধানে ফ্রিডম অব স্পিচের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে কিছু যৌক্তিক বিধিনিষেধও আছে।’ শুনানি নিয়ে ট্রাইব্যুনাল আদেশ দেয়।
আদেশের পর প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম সাংবাদিকদের বলেন, এই ট্রাইব্যুনালে যেসব মামলা এবং তদন্ত চলমান অবস্থায় আছে, তা চলমান থাকাবস্থায় কোনো আসামি এমন কোনো হেইট স্পিচ বা বক্তব্য দিতে পারবেন না, যাতে করে মামলার তদন্ত বাধাগ্রস্ত হয়। মামলার কোনো সাক্ষী অথবা ভুক্তভোগী ভীতিগ্রস্ত হন। ইতিমধ্যে কিছু গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মামলার আসামি শেখ হাসিনার কিছু বক্তব্য এবং ফোনালাপ ফাঁস হয়েছে। তার বক্তব্যের মাধ্যমে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের এক ধরনের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। এখন এ ধরনের বক্তব্য যদি প্রচার হয়, তাহলে আমরা বিচারের সময় সাক্ষীদের আনতে পারব না। তদন্তকারী কর্মকর্তারাও সাক্ষীদের জবানবন্দি আনতে পারবেন না। তিনি বলেন, ‘যেটি (হেইট স্পিচ) করা হচ্ছে, সেটি বন্ধের জন্য এবং ইতিমধ্যে যেসব বক্তব্য প্রচার প্রকাশ হয়েছে, তা অপসারণের জন্য আবেদন করেছিলাম। সবকিছু শুনে ট্রাইব্যুনাল আমাদের আবেদন মঞ্জুর করেছে।’ অন্য প্রসিকিউটর আব্দুল্লাহ আল নোমান সাংবাদিকদের বলেন, ফেসবুক, টুইটারসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শেখ হাসিনার হেইট স্পিচ অপসারণ এবং ভবিষ্যতে যাতে, তা প্রচার ও প্রকাশ করা না হয়, সেজন্য সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কর্তৃপক্ষকে ট্রাইব্যুনালের আদেশের অনুলিপিসংবলিত চিঠি দেওয়া হবে।