জাতীয় ঐক্যে এক জাতীয় সরকারে নয়

দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে হঠাৎ ‘জাতীয় সরকার’ গঠনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সাম্প্রতিক অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানান। এই লক্ষ্যে তিনি রাজনৈতিক দল, ছাত্র ও ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে সবাই প্রধান উপদেষ্টার আহ্বানে সাড়া দিয়েছেন। এই ঐক্যের আহ্বানকে বিভিন্ন মহলে জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তুতি হিসেবে গুঞ্জন তুলেছে। তবে এ ধরনের সরকার গঠনের সাংগঠনিক কাঠামো নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কোনো আলোচনা হয়নি বলে দাবি করছেন রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা।

জানা গেছে, বিএনপি ত্রয়োদশ নির্বাচনে জয়ী হতে পারলে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের পক্ষে। তার আগে এ ধরনের জাতীয় সরকার গঠনের পক্ষে দলটির সায় নেই। বরং দলটি ন্যূনতম সংস্কার শেষে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছে। তবে দেশের চলমান পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐক্যের অংশ হিসেবে ‘সংকট মোকাবিলায়’ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের পরামর্শ নিতে ‘জাতীয় কাউন্সিল বা নিরাপত্তা কাউন্সিলে’র যে প্রস্তাব এসেছে, সেটি ভেবে দেখা যায় বলে বিএনপি ও তার জোটসঙ্গীদের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানিয়েছেন।

দলগুলোর নেতাদের মত হচ্ছে, গত বুধবার প্রধান উপদেষ্টা জাতীয় সংকটে যেভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেছেন, সেটিকেই সাংগঠনিক ভিত্তি দিয়ে ‘জাতীয় কাউন্সিল’ বা ‘নিরাপত্তা কাউন্সিল’ বা অন্য যেকোনো নামই দেওয়া যেতে পারে। কোনোভাবেই সেটি বর্তমান সরকারের অংশ হয়ে কাজ করার সুযোগ নেই।

জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের চলমান পরিস্থিতিতে জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করতে অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপির মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে। জাতীয় প্রয়োজনে যখনই বিএনপিকে ডাকা হবে, বিএনপি তাতে সাড়া দেবে। এজন্য জাতীয় সরকার গঠনের প্রয়োজন রয়েছে বলে আমরা মনে করি না। সরকারের উচিত, জনগণের অধিকারকে ফিরিয়ে দিতে অতিদ্রুত সংস্কার করে নির্বাচনের জন্য একটি রোডম্যাপ ঘোষণা করা। এই রোডম্যাপ ঘোষণা হয়ে গেলে জনগণ নির্বাচনমুখী হবে। তখন যেসব ষড়যন্ত্রের কথা বলা হচ্ছে, সেটি কেউ করতে সাহস পাবে না।’

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খানও জাতীয় সরকার গঠনে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে বলেছেন, ‘ঐক্য অবশ্যই প্রয়োজন জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে। এতে কারও কোনো দ্বিমত থাকতে পারে না। কিন্তু সতর্ক করে দিতে চাই, ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ইউনিটি ইন ডাইভারসিটি। আমরা ঐক্য করতে গিয়ে যদি আবার বাকশাল করে ফেলি, তাহলে কিন্তু সেই ঐক্যে কাজ হবে না। আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। ডেমোক্রেসি মুখে বলা সহজ, কিন্তু বাস্তবে রূপ দেওয়া এত সহজ না।’

জাতীয় সরকারের ধারণাটি প্রথম প্রকাশ্যে আনেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। গত ৪ সেপ্টেম্বর বিএনপির ঢাকা বিভাগের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে তিনি বলেন, জনগণের সমর্থন নিয়ে বিএনপি ভবিষ্যতে ‘জাতীয় সরকারের’ মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করতে চায়। পরে গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর এফডিসিতে এক অনুষ্ঠানে গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরও বলেন, দুই বছরের জন্য একটা জাতীয় ঐকমত্যের সরকার প্রয়োজন, যারা রাষ্ট্রের কাঠামোগত পরিবর্তন এনে একটি মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলবে। সর্বশেষ গত বুধবার বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের নুরুল হক নুর স্পষ্ট করে বলেন, ‘গণ অধিকার পরিষদ থেকে দুটি প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে দুই বছরের জন্য জাতীয় সরকার গঠন করা এবং দেশে স্থিতিশীল পরিস্থিতি রাখতে ছয় মাসের জন্য সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করা।’

তার বক্তব্যের পর নতুন করে জাতীয় সরকার গঠন প্রসঙ্গের আলোচনায় রসদ জোগায় বৈঠক শেষে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘অপপ্রচার মোকাবিলায় আমরা সরকারের সঙ্গে কাজ করব। আমরা কারও পাতা ফাঁদে পা দেব না। কারও কাছে মাথা নত করব না, আবার সীমালঙ্ঘনও করব না। দু-এক দিনের মধ্যে সুখবর পাবেন আশা করি।’

আরেকটি অসমর্থিত সূত্র দাবি করছে, বর্তমান সরকারের একজন উপদেষ্টার সঙ্গে নুরুল হক নুরের বৈঠক হয়েছে চলতি সপ্তাহের প্রথম দিকে। ওই বৈঠকে জাতীয় সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ওই সূত্রের মতে, সরকারের একটি অংশের পক্ষ থেকে জাতীয় সরকার গঠনের বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। আলোচনা সফল হলে, একটি রূপরেখা দাঁড় করানো হবে। পরে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো রাজি হলে সেটি চূড়ান্ত করা হবে।

তবে বিএনপি ও দলীয় দীর্ঘদিনের জোটসঙ্গীরা বলছেন, ‘সংকট মোকাবিলায়’ পরামর্শ নিতে গত বুধবার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের বৈঠকে দেশের স্বার্থে সবার ঐকমত্য হয়েছে। সেখানে কেউ কেউ প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয় সরকারে। কিন্তু ঐকমত্য ও জাতীয় সরকার গঠন এক বিষয় নয়। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা গণ-অভ্যুত্থানে দেশছাড়া হওয়ার পর ৮ আগস্ট ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তখনো একটি ইসলামি দলের পক্ষ থেকে জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছিল। সেটি কোনো দলই গ্রহণ করেনি।

রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় সরকার গঠন হলে নির্বাচন পিছিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে বিএনপি ও জোটসঙ্গীদের মধ্যে। কারণ এ সরকার গঠন হলে অন্তত দুই থেকে তিন বছর তাদের কাজ করার সুযোগ দিতে হবে। সে ক্ষেত্রে বিএনপি ন্যূনতম সংস্কার করে দ্রুত নির্বাচনের দাবি বাস্তবায়িত হওয়ার দাবিও পিছিয়ে যাবে। বিএনপি আগামী সংসদ নির্বাচন দাবিতে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেখবে বলে আগেই স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগামী মার্চ-এপ্রিল থেকে এই দাবিতে কর্মসূচি দেওয়ার আগাম ঘোষণাও দিয়ে রেখেছে দলটি। তবে বুধবারের বৈঠকের পর সরকারের আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে সবাই মিলে একটি সমাবেশ করা, সবাই মিলে একটি ‘পলিটিক্যাল’ কাউন্সিল করা, নিরাপত্তা কাউন্সিল করাসহ বিভিন্ন প্রস্তাব এসেছে। বিএনপি বলছে, জাতীয় স্বার্থে বুধবারের মতো বৈঠকের নাম যদি ‘পলিটিক্যাল’ কাউন্সিল করা, নিরাপত্তা কাউন্সিল দিয়ে আয়োজন করা হয়, এতে তাদের সায় রয়েছে। কিন্তু জাতীয় সরকারের চেয়ে এখন জাতীয় নির্বাচন বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তারা। নির্বাচনের পর জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের পক্ষে বিএনপি।

জানতে চাইলে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশের মানুষকে আশ্বস্ত করা যে, আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আদর্শ ও মতের ভিন্নতা থাকলেও স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে সবাই ঐক্যবদ্ধ। ভারতসহ বিশে^র অন্যান্য দেশের কাছে বার্তা দেওয়া, বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো এসব প্রশ্নে বিদেশি হস্তক্ষেপ মানবে না, প্রতিরোধ করবে। এই প্রতিরোধ করতে গিয়ে কোনো কাঠামো দাঁড় করানো হবে, বিষয়টি এমন নয়। কোনো কোনো দলের প্রস্তাব ছিল, রাজনৈতিক কাউন্সিলের মতো করা যায় কি না। সেটা কোনো জাতীয় সরকার গঠন না। মাঝে মাঝে জাতীয় সংকট মোকাবিলায় রাজনীতিক দলগুলোর সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের যাতে একটা জীবন্ত যোগাযোগ থাকে, তার জন্য কাউন্সিল করা যেতে পারে। এগুলো সবই প্রস্তাব। কিন্তু সিদ্ধান্ত হয়নি। অভ্যুত্থানের পর যে সংকট, তা সরকারের একার মোকাবিলা করার সুযোগ নেই। সেজন্য রাজনৈতিক দল, ছাত্র-তরুণসহ জনগণের নৈকট্য থাকলে অনেক সমস্যা সমাধান সম্ভব। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের নিয়মিত যোগাযোগের জন্য যে নামেই হোক না কেন, তা থাকলে অসুবিধা নেই।’

তিনি আরও বলেন, ‘জাতীয় সরকার গঠন নিয়ে যে কথা বলা হচ্ছে, তা জোটগতভাবে আমরা বিবেচনা করছি না।’ একই বক্তব্য লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরানের। তিনি বলেন, এ ধরনের আলোচনা জোট বা তার দলের মধ্যে হয়নি।

জামায়াতের আমিরের ‘দু-এক দিনের মধ্যে সুখবর পাবেন’ বক্তব্যের বিষয়ে জানতে চাইলে জোটের এক নেতা জানান, আগামী সপ্তাহেই রাজধানীতে ঐকমত্যে পৌঁছানোর জন্য সব দল মিলে একটি সমাবেশ করবে। সেখান থেকে বার্তা দেওয়া হবে আমাদের মধ্যে মত, পথ ও আদর্শের ভিন্নতা থাকতে পারে, অবস্থানে ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু দেশ, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সবাই এক। এটাকেই সুখবর বলেছেন জামায়াতের আমির।